বিজেপির টার্গেট এবার পশ্চিমবঙ্গ!

তালেব রানা

নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি কংগ্রেসমুক্ত ভারত গড়ার ডাক দিয়েছিল। তাতে তারা অনেকটা সফল। টানা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসেছে দলটি। এবার তারা চাইছে আঞ্চলিক দলগুলোকে নির্মূল করতে। এক্ষেত্রে তাদের প্রথম টার্গেট পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন হবে আগামী বছরের এপ্রিল-মে মাসে। এই নির্বাচনে বিজেপি বড় ধাক্কা দিতে চাইছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে। প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরকার গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে তারা।

অন্যান্য রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গেও একই কৌশল নিয়েছে বিজেপি। ক্ষমতাসীন দলসহ বিভিন্ন দলের নেতাদের টেনে দলকে শক্তিশালী করতে চাইছে তারা। তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার ঘটনা ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনেও ঘটেছিল। প্রায় প্রতিটি নির্বাচনের আগেই তৃণমূল ও অন্যান্য দলের নেতারা বিজেপিতে যোগ দিচ্ছে। সর্বশেষ গত শনিবার পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীসহ ৭ বিধায়ক (এমএলএ)। এছাড়াও সিপিএম, সিপিআই এবং জাতীয় কংগ্রেস থেকে এক জন করে এমএলএ বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। পূর্ব বর্ধমানের তৃণমূল কংগ্রেস এমপি সুনীল মণ্ডল, আলিপুদুয়ারের সাবেক এমপি দশরথ তিরকে, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিও বিজেপিতে গেছেন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এমন আরো অনেকে দলে যোগ দেবেন বলে দাবি করছে বিজেপি।

এদিন বিজেপির অন্যতম শীর্ষ নেতা অমিত শাহ বলেন, ভোটের আগে তৃণমূলে একাই থাকবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। তৃণমূল কর্মীরা এক সময় মা-মাটি-মানুষ স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি সেই স্লোগানকে তোলাবাজির স্লোগানে পরিণত করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের জনগণ জাতীয় কংগ্রেসকে তিন দশক ক্ষমতায় থাকতে দিয়েছে। বামেদের ৩৪ আর তৃণমূলকে ১০ বছর দিয়েছেন। বিজেপিকে পাঁচ বছর সুযোগ দিন। আমরা পশ্চিমবঙ্গকে সোনার বাংলা করে দেখাব।

হিন্দুস্তান টাইমসের এক খবরে বলা হয়েছে, বিজেপির টার্গেটে যে দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গ রয়েছে সেটা বোঝা যায় তাদের প্রস্তুতি দেখে। চলতি মাসের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার জন্য ১১৭ সদস্যের নির্বাচন ব্যবস্থাপনা টিম গঠন করেছে তারা। এই টিমকে আবার ৩১টি ইউনিটে ভাগ করা হয়েছে। এসব ইউনিটে এমপি এবং এমএলএ-এর পাশাপাশি দলে বর্ষীয়ান নেতারা রয়েছেন। রাজ্য নেতারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং বিজেপির সভাপতি জেপি নাড্ডার তত্ত্বাবধানে কাজ করবেন। নির্বাচনের প্রায় পাঁচ মাস বাকি থাকতেই তারা পশ্চিমবঙ্গে আসতে শুরু করেছেন।

নিউজ১৮-এর এক খবরে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ২৯৪ আসনের মধ্যে ২০০টি আসন পাওয়ার টার্গেট নির্ধারণ করেছে বিজেপি। যদিও ২০১৬ সালের নির্বাচনে তারা মাত্র ৩টি আসনে জয়ী হয়েছিল। তবে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি সবাইকে তাক লাগিয়ে ৪২টির মধ্যে ১৮টি আসনে জয়ী হয়েছে। এই অর্জনই তাদের ‘মিশন ২০০’-এর প্রেরণা হিসেবে কাজ করছে। তারা দলের কর্মীদের ‘ফর্মুলা ২৩’ কঠোরভাবে অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছে। নির্বাচনে কীভাবে জয়ী হতে হবে এটি সেই গোপন কৌশল তাদের। পশ্চিমবঙ্গের পাঁচটি অঞ্চলের জন্য পাঁচ জন কেন্দ্রীয় পরিদর্শক নিযুক্ত করেছে। তারা রাজ্যের পরিস্থিতি বিজেপির সভাপতিকে জানাবেন।

শনিবার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনি কৌশল নিয়ে বৈঠকে বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বকে অমিত শাহ বলেছেন, হাওয়ায় ভোট জেতা যাবে না, সংগঠনই মূল শক্তি। তিনি আরো বেশি করে জনসংযোগ কর্মসূচি চালাতে বলেছেন, একইসঙ্গে কর্মীদের বাড়ি বাড়ি যেতে বলেছেন। বিজেপি সূত্রের বরাত দিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকার খবরে আরো বলা হয়েছে, রাজ্যে যে বিজেপির পক্ষে একটা হাওয়া তৈরি হয়েছে তা মেনে নিয়েছেন অমিত শাহ। কিন্তু সেই সঙ্গে সতর্ক করেছেন, মজবুত সংগঠন না থাকলে হাওয়া যতই থাক তা কাজে লাগানো যাবে না। মজবুত সংগঠনের পাশাপাশি, সংগঠন পরিচালনার জন্য সঠিক কৌশল মেনে চলার ওপরও অমিত শাহ গুরুত্ব দিতে বলেছেন নেতাদের।

রাজনীতির হাওয়া সব সময় ঠিক কথা বলে না। ঝানু রাজনীতিক অমিত শাহ সেটা ভালোভাবেই জানেন। আর সেটাই অমিত স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়েছেন তিনি। বুথ স্তরের সংগঠনের ওপরে জোর দেওয়ার কথা এই প্রথম নয়, আগেও বলেছেন। তার নির্দেশে ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি বুথে কমিটি গড়া হচ্ছে। চার-পাঁচটি বুথ নিয়ে গঠন করা হচ্ছে একটি করে ‘শক্তিকেন্দ্র’ও। এ ছাড়া বিধানসভা কেন্দ্র ধরে ধরে প্রচার কৌশল ঠিক করা হচ্ছে। অমিত নিজেও এখন থেকে ঘনঘন পশ্চিমবঙ্গে আসবেন পরিস্থিতি দেখতে।

বিজেপির এই তত্পরতা ইতিমধ্যে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূলকে। শেষ পর্যন্ত বিজেপির কৌশলকে ব্যর্থ করে আবারও তৃণমূল ক্ষমতায় থাকবে নাকি ব্যর্থ হবে সেটিই দেখার অপেক্ষা।