সড়কের মৃত্যুফাঁদ ভাঙাচোরা রাস্তা ও অপরিকল্পিত স্পিডব্রেকার, আর রেলপথের মৃত্যুফাঁদ অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং। রেলওয়ে ও সড়ক নির্মাণকারী সংস্থাগুলি নানা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ ব্যয় করিতেছে; কিন্তু রেলক্রসিংগুলির আধুনিকায়ন, উন্নয়ন ও নিরাপদ করিবার তেমন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হইতেছে না। লেভেল ক্রসিংগুলিতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাইতে হইলে উন্নত মানের ব্যারিয়ার বা প্রতিবন্ধক স্থাপন দরকার। দরকার পর্যাপ্তসংখ্যক দক্ষ গেটম্যানের নিয়োগ প্রদান। ইহার পাশাপাশি তাহারা যাহাতে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে, সেই জন্য স্টেশন মাস্টারসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষেরও দায়দায়িত্ব রহিয়াছে। সম্প্রতি গেটম্যানের দায়িত্বে অবহেলার কারণে লেভেল ক্রসিংয়ে কয়েকটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে। গত ৭ নভেম্বর গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ও ১১ অক্টোবর ফেনীতে দুইটি রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনায় অনেকে হতাহত হন। দু্ইটি স্থানেই যাত্রীবাহী বাস উঠিয়া পড়ে রেললাইনের উপর এবং ঘটনার সময় গেটম্যান বা পাহারাদার ছিলেন বটে, তবে তাহারা ঘুমাইতে ছিলেন। একই রকম দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিল গত শনিবার। এইবারের দুর্ঘটনাস্থল জয়পুরহাট সদর উপজেলার পুরানাপৈল রেলক্রসিং। এখানে ট্রেন-বাস সংঘর্ষে দ্রুতগামী ট্রেনটি বাসটিকে ঠেলিয়া লইয়া যায় প্রায় আধাকিলোমিটার। ততক্ষণে বাসটি দুমড়াইয়া মুচড়াইয়া গেলে ১২ বাসযাত্রী নিহত ও পাঁচ জন আহত হন। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা সত্যি দুঃখজনক।
সাম্প্রতিককালে রেলক্রসিং দুর্ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়াছে। রেলওয়ের হিসাব অনুযায়ী দেশে ২০০৮ হইতে ২০১৯ সাল পর্যন্ত রেলক্রসিংয়ে ৩১০টি দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে। ইহাতে মৃত্যু হইয়াছে ২৮১ জনের। ইহার কারণ—দেশের ৮২ শতাংশ রেলক্রসিংই অরক্ষিত। আবার রেলপথের পরিমাণ অনুযায়ী এত লেভেল ক্রসিংয়ের প্রয়োজনীয়তা আছে কি না—তাহাও একটি বড় প্রশ্ন। সমগ্র দেশে ২ হাজার ৯৫৯ কিলোমিটার রেলপথে লেভেল ক্রসিং রহিয়াছে ২ হাজার ৮৫৬টি। অর্থাত্ প্রায় প্রতি কিলোমিটারে একটি করিয়া লেভেল ক্রসিং রহিয়াছে। ইহার মধ্যে আবার অবৈধ ১ হাজার ৩৬১টি। ইহার ৯৬১টিতেই নাই কোনো গেটম্যান। অবৈধ রেলক্রসিংয়ের অধিকাংশই তৈরি করিয়াছে এলজিইডি, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, সিটি করপোরেশন এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগ তাহাদের রাস্তার কারণে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের চাপের কারণেও অনেক অবৈধ ক্রসিং তৈরি হইয়াছে; কিন্তু তাহারা জননিরাপত্তার কথা ভাবিয়া দেখেন নাই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই সকল ক্রসিংয়ের দুই পার্শ্বে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড দেওয়া হইয়াছে। বলা হইয়াছে, ‘লেভেল ক্রসিংটি অবৈধ, যান কিংবা পথচারী নিজ দায়িত্বে পারাপার হোন’; কিন্তু কে শোনে কাহার কথা! পথচারীরা যেমন অসচেতন, তেমনি চালকরাও বেপরোয়া। এখানে আরেকটি প্রশ্ন হইল, গেটম্যান থাকিবার পরও কেন দুর্ঘটনা ঘটিতেছে? কারণ অধিকাংশ গেটম্যানের চাকুরিই অস্থায়ী। অধিকাংশের নাই প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা। অতিরিক্ত সময় কাজ করিবার জন্যও তাহারা দায়িত্বে অবহেলা করিতে পারে বা ঘুমাইয়া থাকিতে পারে। সবচাইতে দুঃখের ব্যাপার হইল, সম্প্রতি রেলওয়েতে অনেক উন্নয়নমূলক কাজ হইয়াছে এবং এখনো চলিতেছে। গত এক যুগে প্রায় ১৫ হাজার জনবল নিয়োগ দেওয়া হইয়াছে, অথচ গেটকিপার নিয়োগ দেওয়া হয় নাই।
দেশে রেলক্রসিং দুর্ঘটনা বন্ধ করিতে হইলে অবৈধ ক্রসিং যথাসম্ভব বন্ধ করিতে হইবে। ঝুঁকিপূর্ণ লেভেল ক্রসিংয়ের উন্নয়ন ও সার্বক্ষণিক পাহারার ব্যবস্থা করিতে হইবে। গেটকিপারদের মর্যাদাপূর্ণ বেতন-ভাতা নিশ্চিত করিতে হইবে। তাহাদের যাহারা নিয়ন্ত্রণকারী, তাহাদেরও হইতে হইবে দায়িত্বশীল। অর্থের সংস্থান করা সম্ভব হইলে লেভেল ক্রসিংগুলি ডিজিটালাইজড করা যায়। গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংয়ে নির্মাণ করা যায় আন্ডারপাস বা ওভারব্রিজ। সর্বোপরি রেলওয়ে অধ্যাদেশ ১৮৯০ অনুসারে আমাদের দেখিয়া শুনিয়াই রেলপথ পার হইতে হইবে।