করোনাকালে অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি

ব্যাংকারদের বার্ষিক হিসাব শেষ হতে যাচ্ছে আর কয়েক দিনের মধ্যে। জানুয়ারি-ডিসেম্বর তাদের হিসাবের বছর। এদিকে সরকারের হিসাবের বছরের অর্ধেক শেষ হবে ডিসেম্বরে। সরকারের বছর শুরু জুলাই মাসে এবং তা শেষ জুনে। এবার অবশ্য যোগ হয়েছে আয়করের রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ মাস হিসেবে ডিসেম্বর মাস। কোভিড-১৯-এর দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে রিটার্ন জমা দেওয়ার তারিখ পেছানো হয়েছে। প্রশ্ন কেমন হবে রাজস্ব আদায়? চারদিকের মন্দাভাব এখনো কাটেনি। রাজস্ব আদায় ঠিকমতো হবে কি? অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি কী? ইত্যাকার প্রশ্নের মধ্যেই দৈনিক ইত্তেফাকের (১৯.১২.২০) খবরের শিরোনাম ‘শীতের সবজিতে বাজার সয়লাব’। খুবই ভালো খবর। এমন ভালো খবর আরো আছে। রেমিট্যান্সের অবস্থা খুবই ভালো। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ রেকর্ড করেছে। মূল্যস্ফীতি হ্রাস পেয়েছে। রপ্তানিকে উল্লম্ফন না ঘটলেও কিছুটা বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হচ্ছে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান স্থিতিশীল ৮৫-৮৬ টাকায়, সেখানে পাকিস্তানিরা এখন এক ডলার কেনে ১৫০-১৬০ টাকায়। রাজস্ব আদায় পরিস্থিতিও স্থিতিশীল। এতগুলো স্বস্তির খবর একসঙ্গে। অর্থমন্ত্রীর স্বস্তিতে থাকার কথা। অথচ একটি বড় ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং অর্থনীতিবিদ ছয় মাস আগে (২১.৬.২০) বলেছিলেন আর ছয় মাস পরে সরকারকে নোট ছাপিয়ে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন দিতে হবে। এই ভবিষ্যদ্বাণীতে আমি কিছুটা নড়েচড়ে বসেছিলাম। ভাবছিলাম, সত্যি কি এমন অবস্থা হতে পারে। না, তা বাস্তবেই প্রমাণ পেলাম। সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ কত বড় ভুল করেছিলেন। দেখা যাচ্ছে, সরকারের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রামাফিক না হোক, জুলাই থেকে নভেম্বরের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে ১ শতাংশের ওপর। তার অর্থ রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি স্থিতিশীল। অতএব, নোট ছাপিয়ে বেতন দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বরং দেখা যাচ্ছে, অনেকগুলো স্বস্তির খবর আছে। সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে ভালো ও স্বস্তির খবর হচ্ছে মূল্যস্ফীতির খবর। গত নভেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। অক্টোবরে ছিল ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি হ্রাসের লক্ষণ বাজারেও দেখা যায়। ইত্তেফাকের খবরে দেখা যায়, দু-একটি সবজি বাদে সব ধরনের সবজি পানির দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিবেদক বলছেন, কাঁচাবাজারে বেশির ভাগ সবজির দর ছিল ২০-৩০ টাকা কেজি। অথচ এক-দেড় মাস আগেও সবজির দর ছিল কেজিপ্রতি ৭০-৮০ টাকা। বিরাট স্বস্তির খবর সাধারণ ভোক্তা ক্রেতাদের জন্য। এই রকমই ঘটে। কৃষক যখন ভালো করে ফসল ফলায় তখন তার দাম সে পায় না। স্বস্তি পাই আমরা ক্রেতারা। দুই পক্ষের স্বার্থের এই স্ববিরোধিতা আমাদের কৃষির একটি বড় সমস্যা। যদিও স্বস্তি কিন্তু কোনো ভোক্তাই কী চেয়েছিল সবজির দাম অর্ধেকের চেয়ে কমে নামুক? নিশ্চই না। অথচ এটাই চাহিদা-সরবরাহের সমস্যা। এই সমস্যা অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রেও আছে এবং হচ্ছে। সব দেশেই। যেমন, রেমিট্যান্স। আমাদের গরিব কৃষকের ছেলেরা বিদেশে অর্জিত ডলার পাইপাই করে দেশে পাঠাচ্ছে। ‘শিক্ষিত’ লোকদের মতো ডলার বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে বা রেখে দিচ্ছে না। ফলে দেখা যায়, জুলাই থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে রেমিট্যান্সের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ৪১ শতাংশেরও ওপর। ভাবা যায়! আমাদের আশঙ্কা ছিল রেমিট্যান্সে ধস নামবে কোভিড-১৯-এর কারণে। কিন্তু ঘটনা ঘটছে উলটো। রেমিট্যান্সের ডলার আসছে বিপুল পরিমাণে। এতে আনন্দের খবর রেমিট্যান্স প্রাপকদের। তাদের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য নেমে আসছে। তারা বাজারে যেতে পারছে। তাদের ভোগে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আবার এটি সরকারের জন্যও ভালো খবর। রিজার্ভের পরিমাণ রেকর্ড করছে। ৪২ বিলিয়ন ডলার। ৮-৯ মাসের আমদানির জন্য যে ডলার দরকার রিজার্ভের পরিমাণ তার চেয়েও বেশি। এত ডলার দরকারও নেই। হাতে বেশি টাকা থাকলে তা ভালো খবর নয়। এর অর্থ তারল্য বা লিকুইডিটি বেশি। বস্তুত, অর্থনীতি এখন লিকুইডিটিতে। তারল্যে ভাসছে।

এক খবরে দেখলাম, অর্থনীতিতে এখন অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ফলে সরকারের ট্রেজারি বন্ড ও বিলের ওপর সুদের হার নেমেছে সর্বনিম্নে। এসব কেনার কোনো লোক নেই। অতিরিক্ত তারল্য বয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাংকগুলো, যা তাদের লোকসানের বোঝা ভবিষ্যতে বাড়াবে বইকি। এত রিজার্ভ বাড়ছে কীভাবে। এই প্রশ্ন স্বাভাবিক। রেমিট্যান্সের টাকা স্বাভাবিক অবস্থায় বসা থাকে না। যতটুকু রাখার দরকার ততটুকু রেখে বাকিটা আমদানির জন্য ব্যয় করা হয়। ব্যয় হয় বিদেশি ঋণের টাকা, তার সুদ ইত্যাদিতে। বিদেশি কোম্পানি এবং বিদেশিরা তাদের রোজগারের টাকা/লাভের টাকা তাদের দেশে পাঠিয়ে দেয়। এতে ‘ব্যালেন্স’ রক্ষিত হয়। এখন দেখা যাচ্ছে, রপ্তানি মোটামুটি স্থিতিশীল, আমদানি কম। অতএব, রিজার্ভ বাড়ছে। আমদানি কম কেন? তেলের খরচ কম। অথচ এই খাতে প্রচুর টাকা ব্যয় হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম কম। খাদ্যশস্য আমদানিতেও খরচ কম। শিল্পপণ্য মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কম। ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারা নতুন শিল্প অথবা শিল্পের সম্প্রসারণে যাচ্ছেন না। তাই শিল্পের কাঁচামাল আমদানি মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়ছে না। আবার ভোগ্যপণ্য আমদানিতেও টান পড়েছে। কারণ ভোগ্যপণ্যের চাহিদাতে ছেদ পড়েছে। আমরা চাল, গম, চিনি সয়াবিন, পেঁয়াজ, রসুন, আদা থেকে শুরু করে মসলাপাতি সবকিছুই আমদানি করি। এগুলোর মূল ক্রেতা নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্তরা। তাদের আয়-ইনকামে  টান পড়েছে। প্রথম কারণ সঞ্চয়ের সুদের পরিমাণ কম। ব্যাংকে আমানতে সুদের হার প্রায় অর্ধেক হয়েছে। সরকারের নীতি হচ্ছে ৯-৬ সুদনীতি। আমানতের ওপর ৬ শতাংশ সুদ এবং ঋণের ওপর সুদ ৯ শতাংশ। অবশ্য সরকারের প্রণোদনা প্রকল্পে সুদের হার ঋণগ্রহীতাদের জন্য হবে সাড়ে ৪ শতাংশ। সরকার সুদে ভর্তুকি দেবে। তার মানে কী দাঁড়াল? আমদানি কম, রপ্তানি স্থিতিশীল এবং বিপরীতে রেমিটেন্সের পরিমাণ শনৈ শনৈ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থাত্ সব ভালো খবরের সঙ্গে সঙ্গেই রয়েছে দুশ্চিন্তার খবর, ভাবনার বিষয়। সমন্বয় না থাকলে, সামঞ্জস্য না থাকলে অর্থনীতিতে প্যাঁচ লেগে যায়। এখন ডিসেম্বর মাস। জানুয়ারিতে ‘কোভিড-১৯’-এর প্রতিষেধক আসছে বলে খবর। এই খবরে মানুষ আশা বুক বেঁধেছে। মানুষ এক বছর যাবত্ গৃহবন্দি। স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বঞ্চিত। টিকার খবরে তারা বুকে বল পেয়েছে। মনে হচ্ছে, স্বাভাবিক জীবন ফিরে আসছে। ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যান্ড ইত্যাদি দেশে টিকা দেওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এতে আশা করা যায়, ২০২১ সালটা শুরু হবে ভিন্নভাবে। হতাশা কাটবে। দুশ্চিন্তা, অনিশ্চয়তা অনেকাংশে কেটে যাবে। অবশ্যম্ভাভাবী ভাবে এর প্রভাব অর্থনীতি, ব্যবসায়-বাণিজ্যে পড়বে।  এদিকে সরকারি প্রণোদনার কাজও তখন শেষের দিকে থকবে বলে ধারণা করা যায়। ধান, চালের খবর ভালো। খাদ্যশস্যের অভাব হওয়ার কোনো কারণ নেই। এই মুহূর্তের আমন তোলার সময়ে যে সংকট তৈরি করার চেষ্টা হচ্ছে তা কোনোভাবেই সফল হবে না। আমনের ফলন ভালো হয়েছেম। কিছু খাদ্যশস্য আমদানি করে সরকারি স্টক বৃদ্ধি করা হচ্ছে। তার মানে, অর্থনীতিতে সংকট হতে পারে এমন কোনো বড় ঘটনা দেখা যাচ্ছে না। তবে সতর্কতা দরকার হবে। অর্থনীতিকে ‘পুনর্জীবন’ নয়, নয় পুনরুদ্ধার, করতে হবে পুরোপুরি পুনর্গঠন। এই সুযোগ হেলায়ফেলায় নষ্ট করা যাবে না। সারা বিশ্ব এখন বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখোমুখি। যে আমেরিকা বাজার অর্থনীতির দেশ তারা এখন এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। নিয়েছেন প্রাক্তন প্রেডিডেন্ট ট্রাম্প। আসছেন জো বাইডেন। তারা ‘ডেমোক্র্যাট’। এদিকে চীন-ভারত সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। চীনের সঙ্গে অনেক দেশেরই সমস্যা তৈরি হয়েছে। বড় বড় ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ে ক্ষতির সম্মুখীন। ভারত আত্মনির্ভরতার পথ বেছে নিয়েছে। বিশ্ব মনে হচ্ছে নতুন করে দুই ভাগে ভাগ হচ্ছে। গণতান্ত্রিক শিবির এবং সমাজতান্ত্রিক একনায়কত্বের শিবির। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রশ্নের সম্মুখীন। কোভিড-১৯ এক সম্পূর্ণ নতুন পরিস্থিরি জন্ম দিয়েছে। এই ভয়াবহ সংক্রামক রোগ থেকে মুক্ত পৃথিবী আগের মতো আর থাকবে না। এটা মাথায় রেখে আমাদেরও সবকিছু নতুন করে ঢেলে সাজানোর দরকার আছে বলে মনে হয়। আগামী দু-তিন বছরের মধ্যে আমরা নিম্নমধ্য আয়ের দেশের স্বীকৃতি পাব। এর ভালোমন্দ দিক আছে। বহু দেশে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আমরা এখন শুল্কসুবিধা পাব না। টিকতে হবে প্রতিযোগিতা করে। প্রতিযোগিতা করতে হলে অদক্ষতা দূর করতে হবে। আমাদের শিল্পগুলো অদক্ষতার আখড়া। তারা সরকারি সুবিধা, ভর্তুকি এবং নানা ধরনের নীতিসুবিধা পেয়ে বড় হয়েছে। এর থেকে এদের ধীরে ধীরে মুক্ত করতে হবে। ২০২১ সালেই সেই কাজ করা শুরু করতে হবে।

n লেখক :অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়