শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করা হোক

উপার্জনের উদ্দেশ্যে যদি কোনো শিশু দিনমজুর কিংবা অন্য কোনো পেশায় জড়িয়ে পড়ে তাহলে তাকে আমরা শিশুশ্রম বলি। আজকাল শিশুশ্রম একটা ট্রেডিশনাল কাজ হয়ে উঠেছে। পরিবারের দোহাই দিয়ে অগণিত শিশু তাদের স্বপ্নকে বিলিয়ে দিচ্ছে কলকারখানা কিংবা চায়ের দোকানে। শিশুশ্রমের সঙ্গে জড়িত রয়েছে অনেক কারণ। অনেকের মতে, দারিদ্র্য আসল সমস্যা। তবে অশিক্ষা, অনিশ্চয়তা আর অসচেতনতা নজরকাড়ার মতো। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অন্যতম লক্ষ্য সব শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে দেশের বিদ্যমান অনেক সমস্যার সমাধান সহজ হয়ে উঠতে পারে। তবে শিক্ষিত জাতি গঠন করে শিশুশ্রম বন্ধ করা সহজ নয়। আগে শিশুশ্রম বন্ধ করতে পারলে শিক্ষিত জাতি গঠন সম্ভব হবে। আর এজন্য চাই সচেতনতা বৃদ্ধি।

বাংলাদেশ শ্রম আইন (সংশোধিত-২০১৮) অনুযায়ী ১৪ বছরের নিচে কোনো শিশুকে শ্রমে নিযুক্ত করা যাবে না, তবে ১৪ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ নয় এমন হালকা কাজ করতে পারবে; কিন্তু আজকাল দেখা যায় ১৪ বছরের অনেকেই কাজে লিপ্ত। গত কয়েক দিন আগে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় দেখলাম নেটজাল (কক্সবাজারে টানা জাল বলে) টানছে। জাল টানছিল প্রায় ৭০ জন। যেখানে শিশু ছিল প্রায় ৫০ জনের মতো। তাদের লিডারের হাতে শাসন করার জন্য লাঠিও ছিল। এমন দৃশ্য আপনি হাজারো দেখবেন। তার পেছনের কারণ খুঁজতে গেলে দেখবেন দরিদ্রতা আর অশিক্ষা। হাসিখুশি ও আনন্দ-উল্লাসে বেড়ে ওঠার কথা ওদের। থাকার কথা ছিল স্কুল-মাদ্রাসায়। হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা-কলম। কাঁধে স্কুলব্যাগ। বিকালে ফুটবল, ক্রিকেট কিংবা ব্যাডমিন্টন মাঠে খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকার কথা ওদের। শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার স্বপ্ন দেখার কথা ছিল; কিন্তু ওরা এখন কর্মব্যস্ত। কাঁধে সংসারের বোঝা। শিশুশ্রম নিরসনে সরকারের উদ্যোগকে সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। গণমাধ্যমকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। বিভিন্নভাবে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে শিশুশ্রমের কুফল সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।

শিশুশ্রমের ফলে শিশুরা যতগুলো সমস্যার সম্মুখীন হয় তার মধ্যে শিশুদের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে, স্বাভাবিক শৈশব ও পারিবারিক জীবন নষ্ট হয়, সামাজিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শিথিল হয়, শিশুর শিক্ষা বিঘ্নিত হয়।

দেশের উন্নয়ন মূলত নির্ভর করে শিক্ষা খাতের ওপর। তবে বর্তমানে শিক্ষায় যে অবস্থা তাতে মনে হয় না ভবিষ্যতে উন্নয়নটা সহজে ধরা দেবে। যদি শিশুশ্রমটা আটকাতে না পারে তাহলে স্বপ্নগুলো অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাবে। শিশুশ্রম আটকাতে হলে আমাদের কিছু পদক্ষেপ প্রয়োজন। যার মধ্যে প্রধান হলো পারিবারিক সচেতনতা। পারিবারিক কলহ কিংবা অসচেতনতার ফলে হাজারো শিশু অচিরেই হারিয়ে যায়। তারা পায় না শিক্ষার আলো। যদি পারিবারিক সচেতনতা বাড়ানো যায় তাহলে শিশুশ্রম বন্ধ হয়ে যাবে। শিশুশ্রম বন্ধ হওয়া মানে শিশুরা শিক্ষামুখী হওয়া।

অনেক শিশুকে মাদকসহ বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকারের সর্বোত্তম পদক্ষেপ যদি না থাকে তাহলে শিশুরা মাদকের মতো খারাপ ব্যবসা অথবা সেবনে জড়িয়ে পড়ে। প্রশাসনের অবশ্যই এর বিরুদ্ধে আরো দৃঢ় হতে হবে। তাহলে মাদকের মতো খারাপ কাজ ছেড়ে শিশু বিদ্যালয় মুখী হবে।

বাংলাদেশ শ্রম আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমেও শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হবে। শিশুশ্রম আইনের যদি ১০০ শতাংশ প্রয়োগ হয় তাহলে শিশুশ্রমের মতো জীবন ধ্বংসকারী কাজ বাংলাদেশ থেকে উঠে যাবে। শিশুকে পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে এসব শিশুশ্রমের মতো নিকৃষ্ট কাজকে নিষিদ্ধ করা হোক।

এছাড়া শিশুশ্রম নিরসনে বাস্তবিক কর্মকৌশল, উদ্দেশ্য, কার্যক্রম ইত্যাদি নির্ধারণসহ শিশুশ্রম ইউনিট ও জাতীয় শিশুশ্রম কল্যাণ কাউন্সিল গঠন এবং বেসরকারি সংস্থাসমূহের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে; কিন্তু শিশুর ওপর নির্যাতন কিংবা তাদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করা ইত্যাদি বিষয়ে শাস্তি প্রদানের বিধান করা জরুরি।

একটি দেশের উন্নয়নের মূল হাতিয়ার হলো সেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। যেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা যত ভালো সেই দেশ তত উন্নত; কিন্তু আজকাল বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের শিক্ষাব্যবস্থার যে খারাপ অবস্থা তাতে কোনো দিন উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষাব্যবস্থার পেছনে শিশুর যে অবদান তা আজকে হারিয়ে যাচ্ছে শিশুশ্রমের কাছে।

বন্ধ হোক শিশুশ্রম। নিষিদ্ধ হোক শিশুশ্রমের মতো অমানবিক কাজ।

n লেখক :শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়