করোনা ভাইরাস :ঈশানকোণে নূতন মেঘ

ইহাকেই সম্ভবত বলা হয়—মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। করোনা ভাইরাসের বর্তমান রূপ লইয়া এমনিতেই সমগ্র বিশ্ব তটস্থ ছিল, তাহার উপর ব্রিটেনে সম্প্রতি ছড়াইয়া পড়িয়াছে করোনা ভাইরাসের অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি নূতন সংস্করণ। মাত্র এক বত্সরেই ভাইরাসটি এই বিশ্বের অর্থনীতিকে কমপক্ষে ১০ বত্সর পিছাইয়া দিয়াছে। শীতে নূতন ধাক্কার পূর্বাভাস ইতিপূর্বে দেওয়া হইলেও এই উপমহাদেশে প্রায় সর্বত্রই করোনার সংক্রমণ অধিকতর তীব্র হইতে পারে নাই; কিন্তু ব্রিটেনের নূতন সংস্করণটি চীনের উহানের মতো যদি সমগ্র বিশ্বে ছড়াইয়া পড়ে, তাহা হইলে বিশ্বের খুব কম মানুষই করোনার কামড় হইতে রক্ষা পাইবে। কারণ, করোনার নূতন সংস্করণটি কমপক্ষে ৭০ শতাংশ বেশি ছোঁয়াচে বলিয়া মনে করিতেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। ইতিমধ্যে ব্রিটেনে চতুর্থ মাত্রার তীব্র সতর্কতা জারি করা হইয়াছে। ব্রিটেনের সহিত বিমানযোগাযোগ বন্ধ করিয়া দিয়াছে অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ইতালি, আয়ারল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, সৌদি আরব, তুরস্ক ও ইসরাইল। আমেরিকাও সমগ্র বিষয়টি বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখিয়াছে।

ইতিমধ্যে এই বিশ্ব সুখবর পাইয়াছিল যে, করোনার বিরুদ্ধে একাধিক কার্যকর টিকার গণপ্রয়োগ সমগ্র বিশ্বেই পর্যায়ক্রমে শুরু হইবে। ইতিপূর্বে ব্রিটেনসহ একাধিক দেশ ফাইজারের টিকার প্রয়োগও শুরু করিয়াছে। সমগ্র বিশ্বেই কোভিডের টিকা প্রয়োগের জন্য একরকম অতি জরুরি তত্পরতা চলিতেছে; কিন্তু ব্রিটেনে করোনার নূতন সংস্করণ চিকিত্সাবিজ্ঞানীদের কপালে নূতন ভাঁজ ফেলিয়া দিয়াছে। জানা গিয়াছে, এই নূতন সংস্করণের ভাইরাসটি আপাতত টিকার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়িয়া তুলিতে না পারিলেও খুব তাড়াতাড়িই ইহা সফল হইবে। তবে কি এত কষ্টের এত আকাঙ্ক্ষিত করোনার ভ্যাকসিনগুলি অঙ্কুরেই মাঠে মারা যাইবে? সেই উত্তর খুঁজিবার পূর্বে নূতন সংস্করণের ভাইরাসটির সূত্রপাত খুঁজিয়া দেখা যাউক। জানা গিয়াছে, সেপ্টেম্বরে ইহাকে প্রথম দেখা যায়; কিন্তু মাত্র কয়েক মাসেই এই নূতন ভ্যারিয়ান্ট করোনা ভাইরাসের অন্য সংস্করণগুলিকে প্রতিস্থাপিত করিয়া ফেলিতেছে। এবং নূতন ভাইরাসটি তাহার ধ্বংসাত্মক রথ তুমুল বেগে ছুটাইতেছে। ইহা ঠিক যে, ভাইরাসের ক্ষেত্রে নূতনতর বিভাজন খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস প্রতি বত্সরই তাহার রূপ বদলায়। এই জন্য ইনফ্লুয়েঞ্জার ভ্যাকসিনও প্রতি বত্সর নূতন করিয়া হালনাগাদ করিতে হয়। করোনার ক্ষেত্রে চীনের উহানে যে ভাইরাসটি প্রথমে শনাক্ত হইয়াছিল, তাহার সহিত বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ছড়াইয়া পড়া ভাইরাসটির প্রচুর অমিল রহিয়াছে। মূলত, করোনা ভাইরাসের অনেক স্ট্রেইন বা সংস্করণ সমগ্র বিশ্বে রহিয়াছে। ইহার মধ্যে ব্রিটেনের নূতন সংস্করণটি সবচাইতে বেশি মাথাব্যথার কারণ হইয়া উঠিয়াছে উহার তীব্র ছোঁয়াচে ক্ষমতার জন্য। জানা গিয়াছে, ভাইরাসটির নূতন বৈশিষ্ট্যে ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হইয়াছে। ভাইরাসটির স্পাইক প্রোটিনে বিশেষ পরিবর্তন আসিয়াছে বলিয়াই ইহা আরো সহজে মানুষের শরীরে প্রবেশ করিতে পারিতেছে। ভাইরাসটির নূতন বৈশিষ্ট্য ইহা বলিয়া দিতেছে যে, ইহা যতই মানুষকে আক্রান্ত করিতেছে, ততই খাপ খাইয়া লইতেছে। ইহাই সবচাইতে অধিক আশঙ্কার। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করিতেছেন—এই ভাইরাসটি আমাদের অনেকটা ইনফ্লুয়েঞ্জার বিরুদ্ধে যুদ্ধের জায়গাটিতে লইয়া যাইতে পারে। অর্থাত্ নিয়মিতভাবে কোভিডের ভ্যাকসিনের পরিবর্তন ঘটাইতে হইবে। আমাদের সৌভাগ্য যে, বর্তমানে যেই সকল ভ্যাকসিন প্রয়োগের তালিকায় রহিয়াছে, সেইগুলিতে সহজেই পরিবর্তন আনা সম্ভব।

তবে ঈশানকোণে যে নূতন মেঘ দেখা দিয়াছে, তাহাতে সন্দেহ নাই। ঝড় কতখানি উঠিবে, আমাদের দেশে উহার অভিঘাত কতটা মারাত্মক হইবে—তাহার কিছুই এখনো বলা সম্ভব হইতেছে না; কিন্তু প্রথম হইতেই আমাদের বিশেষ সতর্কতা গ্রহণ করা একান্তভাবে জরুরি। ইহার ব্যত্যয়ে অনেক বড় বিপদ ডাকিয়া আনিতে পারে।