সহমরণের চিতায় নারীকে এখন আর উঠতে হয় না ঠিকই, তবে জীবদ্দশায় তার জ্বলে-পুড়ে মরার হাজার বন্দোবস্ত বহাল। প্রতিদিন সে নানাভাবে পোড়ে; শারীরিক ও মানসিকভাবে দগ্ধ হওয়ার যন্ত্রণায় কাঁদে। নারীর কান্নার আদপেই বিরাম নেই। প্রকাশ্যে বা ঘরের কোণে, বুক উজাড়ি কান্না কিংবা নিভৃতে বুকবিনাশী কান্নাবঞ্চনা, অপমান, অবহেলায় কত কিসিমের কান্নাই যে নারীকে কাঁদতে হয় জীবনভর। যৌন নিপীড়ন, শারীরিক নির্যাতন, মানসিক পীড়ন নারীর প্রতি হাজারও সহিংসতার জাজ্বল্য আগুনে সমাজটাই যেন আস্ত চিতা; বর্ষা-বসন্তের ভেদ নেই, যে চিতা ষড়ঋতুতেই সমান জ্বলে! অতএব হররোজ পুড়ে যাওয়ার ভয়, হরবখত দগ্ধ হওয়ার যন্ত্রণায় কান্নার শুরু।
এই যে শরীরতপুরের মেয়েটি গত ২২ নভেম্বর আদালতের বারান্দায় লুটিয়ে পড়ে কাঁদলেন, কেন? গত বছরের ২৯ জুন পৌর এলাকার বাসিন্দা মাসুদ ব্যাপারীর দ্বারা তিনি ধর্ষণের শিকার হন বলে অভিযোগ। ঘটনার পর তাকে উদ্ধার করেছিলেন মানছুরা বেগম ও আলেকজান বেগম নামের দুই নারী। তারা গণমাধ্যমের কাছে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছিলেন। পরে আদালতকেও একই জবানবন্দি দেন তারা। কিন্তু সেদিন আদালতে এসে বলেন, তারা ঘটনার কিছুই জানেন না।
দুই সাক্ষীর ‘মিথ্যাচারে’ কাঁদতে শুরু করেন মেয়েটি। কাঁদতে কাঁদতে আদালতের বারান্দায় লুটিয়ে পড়েন। অসহায় মেয়ের কান্না দেখে কাঁদতে শুরু করেন অসহায়ের অধিক অহসহায় তার মা-বাবাও। মেয়েটির জবানিতে না শুনলেও আমরা নিশ্চিত বুঝতে পারি, এই মামলার কারণে তার জীবন কতটা ‘নরক’ হয়ে উঠেছে। সমাজের লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, এর ওর আকথা-কুকথা, নিদেনপক্ষে বক্র চাহনি, আসামিদের হুমকি-ধামকি...পড়াশোনা বন্ধ, স্বাভাবিক চলাফেরা বন্ধ... তবু বিচার চাইছেন তিনি।
‘গরিব বলে কি বিচার পাব না? সঠিক বিচার না পেলে এই জীবন রাখব না। গঞ্জনার জীবন রেখে কী হবে!’ মেয়েটির এই কথায় রাষ্ট্রের ‘লেফট-রাইট’-এ এতটুকু ছন্দপতন কি হয়? ভুক্তভোগী গরিব বলে অন্যায়ের প্রতিকার পাবে না, রাষ্ট্রের কোন আচরণে এই বার্তা স্পষ্ট হয়েছে মেয়েটির কাছে? একজন বিচারপ্রার্থীর এই আস্থাহীনতা কি রাষ্ট্রকে এতটুকু পীড়া দেয় না, বিচলিত করে না?
ধর্ষণে কেবল শারীরিক শক্তিতে পরাভূত হয় না নারী, এটা যে মনুষ্যত্বের কত বড় অপমান, মানবিকতার দলন, সেই অতল অপমান সয়েছেন, এরপর সয়ে চলেছেন সমাজের লাগাতার গঞ্জনা। নিশ্চিতভাবেই সমাজের বহু কান্ডারি বলে থাকবেন, ‘সমস্যা’ মেয়ের! নইলে আর কারো সঙ্গে হলো না, ওর সঙ্গে কেন! সমাজপতির এমন কথায় সায় দেওয়ার লোকের অভাব কোনোকালে ছিল না। মেয়েটিই যে ‘খারাপ’ আড়েঠাড়ে তা বুঝিয়ে দেওয়ার মানুষও কম নেই। এর পরও বিচার চাওয়া তো রীতিমতো ধৃষ্টতা!
মেয়েটির বাবা বলেছেন মোক্ষম কথাটি ‘গরিব মানুষ আমরা, কেউ আমাদের পাশে নেই।’ পাশে থাকার অঙ্গীকার করে রাষ্ট্রও নেই। একে নারী, দুইয়ে গরিব—এই দুই কারণে মেয়েটির জীবন এমনিতেই ‘বাদের খাতায়’, ‘কলঙ্কিত’ হওয়ায় তার অকাল মৃত্যুই যেন নিয়তি। ধর্ষণের পর হত্যা করা অর্থাত্ পুরুষের একদফা ‘খায়েশ’ মেটানোর সমান নারীর জীবনের মূল্য নির্ধারিত হওয়াও যেখানে স্বীকৃত কখনো কখনো, সেখানে ন্যায্যতার লড়াইয়ে নারীকে কেন জিততে দেবে সমাজ?
হুমকিধমকিতে ভুক্তভোগী মেয়েটি না টললেও, ধারণা করা চলে, সাক্ষী দুজনকে বাধ্য করা হয়েছে। তারাও তো নারী। ঘরে-বাইরে নারীর বিপদের কি শেষ আছে? এরপর বাড়তি বিপদ ডেকে আনার সাহস কত জন দেখাতে পারেন?
এই মেয়েটির কান্নার কারণ না হয় বোঝা গেল, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের মেয়েশিশুটি (১১) কাঁদবে কি কাঁদবে না, তা কি সে নিজেই বুঝতে পারছে? কিন্তু এ কথা স্পষ্ট যে তার আজীবন কান্নার ইন্তেজাম পাকা করে ফেলেছে সমাজ! বোঝার বয়স না হওয়ায় হাত-পা বেঁধে তাকে জলে ফেলে দেওয়ার বিষয়টি ঠিকঠাক সে ধরতে পারছে না, কিন্তু এরই মধ্যে সে হয়তো এটুকু বুঝে ফেলেছে, তাকে নিয়ে যা খুশি করার হকদার সমাজ! তাইতো ধর্ষণে অভিযুক্ত যুবকের ৮৫ বছর বয়সি দাদার সঙ্গে তাকে বিয়ে দেওয়া সঠিক মনে করেছেন সমাজের মাথা ময়মুরুব্বি, গুরুজনেরা।
পুতুল খেলার বয়সে একজন লোলুপ যুবকের ধর্ষণের শিকার হয়েছে শিশুটি; গর্ভপাতের মতো শারীরিক ধকল সইতে হয়েছে (এর মনস্তাত্ত্বিক বেদনা অনুভবের বয়স হয়নি), অথচ এতে যুবকটির কোনো ‘দোষ’ দেখেনি সমাজ। তাই তার একটু-আধটু ‘বয়সের দোষ’ দূর করতে ১০টি দোদরা মেরে তাকে ‘শুদ্ধ’ করা হয়েছে। ‘প্রকৃত দোষী’ অপরিণত বয়সের মেয়েটি; সেই ফুসলিয়ে যুবককে বিপথে নিয়েছে! ‘ডাইনি’র আবার বয়স কী! অতএব তাকে শাস্তি দাও। ফলে সমাজ এই ‘শিশু ডাইনি’র হাত থেকে খেলনা হাঁড়িকুড়ি কেড়ে নিয়ে জ্বলন্ত উনুনের ওপর বসানো গরম হাঁড়ির ভেতর ছুড়ে দিয়েছে!
দিনে দিনে এই মেয়েশিশুটি এই সত্য যত বুঝতে শিখবে, তত কান্নার ধারা অবিরল হবে তার! এই কান্না মেয়ে হয়ে জন্মানোর কান্না! জীবন যতক্ষণ, নারী তুমি কাঁদো।
n লেখক :সাংবাদিক
hello.hasanimam@gmail.com