দুর্নীতি এমন একটি মাধ্যম যেখানে অনৈতিক অর্থ প্রদানের কারণে তৃতীয় কোনো পক্ষ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধার অধিকারী হয় এবং এর প্রভাবে তারা বিশেষ ক্ষেত্রগুলোতে প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়। আর এখানে প্রথম পক্ষ এবং তৃতীয় পক্ষ উভয়ই আর্থিকভাবে লাভবান হয় এবং প্রথম পক্ষ হিসেবে কাজ করে কর্তৃপক্ষ।
জার্মানির বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচক বা করাপশন পারসেপশন্স ইনডেক্সে (সিপিআই)-২০১৯ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের মোট ১৮০টি দেশের মধ্যে ১০০ পয়েন্টের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ২৬ পয়েন্ট পেয়ে ১৪৬তম স্থান অধিকার করেছে। ২০১৮ সালেও একই পয়েন্ট পেয়ে বাংলাদেশ ১৪৯তম অবস্থানে ছিল। সেই তুলনায় তিন ধাপ উন্নতি হলেও পয়েন্টের কোনো পরিবর্তন হয়নি।বর্তমানে দুর্নীতির ব্যাপারটা আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে, এখন বোঝার কোনো উপায় নেই, কোনটা দুর্নীতি আর কোনটা দুর্নীতি নয়। এটা দেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের জীবনের অংশ হিসেবে মনে করা হচ্ছে।
দুর্নীতি দূর করার প্রধান বাধা আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা। প্রধান কর্মকর্তা থেকে শুরু করে অফিসের পিয়ন পর্যন্ত কারো কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই। কোন কাজে কত বরাদ্দ; বর্ধিত ব্যয় কী কারণে দরকারসহ সব তথ্য জানিয়ে সিটিজেন চার্ট টাঙিয়ে কাজ শুরু করার আইন থাকলেও কখনো তার প্রয়োগ হয় না।
বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১২ বছর ধরে নিরলসভাবে পরিশ্রম করছেন দেশকে উন্নত করার জন্য। গুটি কয়েক দুর্নীতিবাজদের জন্য যেমন প্রধানমন্ত্রীর সাফল্য ভূলুণ্ঠিত হতে পারে না তেমনি প্রধানমন্ত্রীকে আজ দেশের উন্নয়নের পাশাপাশি সাহসিকতার সঙ্গে দুর্নীতিবিরোধী কর্মকাণ্ডগুলোও জোরেশোরে চালাতে হবে; যাতে করে দেশের প্রত্যেকটি ক্ষেত্র দুর্নীতিমুক্ত হয়। দুর্নীতিবিরোধী প্রচেষ্টাগুলোকে আরো জোরালো করতে হবে। প্রয়োজনে দুদককে আরো শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশ থেকে চিরতরে দুর্নীতি দূর করতে হলে সর্বপ্রথম রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন দূর করতে হবে। দুর্নীতি রোধে সরকারের কঠোর আইনের পাশাপাশি সমাজের মাঝে মানুষের মধ্যে মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন আনতে হবে। আমরা ক্রমেই মানবিকতা, নৈতিকতাবোধ ও মনুষ্যত্ব থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এ থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় সামাজিক প্রতিরোধ। দুর্নীতি দমন কমিশন কর্মকর্তাদের সত্ভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। দুর্নীতিবাজদের কঠিন শাস্তি দিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও মন্ত্রী-এমপিদের সততার সঙ্গে কাজ করতে হবে। দুর্নীতি সহায়ক আমাদের যেসব আইন ও অবকাঠামো রয়েছে তা চিহ্নিত করে সংস্কার করা একান্ত প্রয়োজন। দুর্নীতি রোধে দেশে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে প্রশাসনকে সংসদের জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হবে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছাও একান্তই কাম্য। দুর্নীতির প্রতিকারের পাশাপাশি দুর্নীতির প্রতিরোধও সমান গুরুত্ব বহন করে। দেশের নৈতিক অধঃপতন থেকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পারিবারিকভাবে এবং সামাজিকভাবেও দুর্নীতিকে বয়কট করতে হবে। তবেই দুর্নীতিকে চির বিদায় জানানো যাবে।
n লেখক :সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর।