করোনার প্রভাবে মানুষ ঘরে বসে কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। সামাজিক দূরত্ব মানতে যেয়েই এমন অবস্থা হচ্ছে। করোনার সময়ে ইন্টারনেটভিত্তিক লেনদেন অনেক বেড়েছে। তবে এসব লেনদেনের পুরোটাই বেসরকারি ব্যাংকনির্ভর। সরকারি ব্যাংকের কোনোটিই আধুনিক এ সেবা দেওয়া শুরু করতে পারেনি।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে এখনো পর্যন্ত এ ব্যাংকিং শুরু করতে না পারার পেছনে বাস্তবভিত্তিক কারণ রয়েছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইন্টারনেটের ব্যাংকিং ব্যবহারের মতো গ্রাহকের অভাবে এ ব্যাংকিংয়ের চাহিদা কম থাকা এবং অন্যদিকে ব্যাংকের এ বিষয়ে পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল না থাকাকেই দায়ী করছেন তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে করোনাকালে ইন্টারনেটভিত্তিক লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে। গত জুলাই মাসে বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক ফান্ডস ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক (বিইএফটিএন)-এর মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে। এ মাসে এক কোটি বারের বেশি লেনদেন হয়েছে। প্রতিটি লেনদেন গড়ে চার লাখ ৩৬ হাজার টাকা। আর ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইস বাংলাদেশ (এনপিএসবি)-এর মাধ্যমে ইন্টারনেটে সেপ্টেম্বর মাসে ২ লাখ বার ফান্ড ট্রান্সফার হয়েছে। যা আগের মাসের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি। এভাবে করোনার সময়ে ইন্টারনেটভিত্তিক লেনদেন বেড়েছে।
ইন্টারনেট ব্যাংকিং বা ইন্টারনেটভিত্তিক লেনদেন হলো—ব্যাংকে না যেয়েই মোবাইল অ্যাপস বা ওয়েবে গ্রাহক নিজেই ব্যাংকের এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে ফান্ড ট্রান্সফার করা। এক্ষেত্রে অন্য ব্যাংকের অ্যাকাউন্টেও টাকা ট্রান্সফার করা যায়। এছাড়া একই পদ্ধতিতে বিভিন্ন বিল পরিশোধ, মোবাইল টপআপ, অ্যাকাউন্টের লেনদেনের সার্বিক বিবরণী, ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধ, ব্যালান্স দেখা, বকেয়া দেনার হিসাব ও পরিশোধ সীমা দেখার মতো কাজগুলো করতে পারেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইন্টারনেট ব্যাংকিং শুরু করতে পারলে ব্যাংকগুলোর ব্যাংকিং করা সহজ হবে। অনেক ব্যাংক এরই মধ্যে ইন্টারনেট ব্যাংকিং জনপ্রিয় করতে মোবাইল অ্যাপসও তৈরি করেছে।
অন্যদিকে অনলাইনভিত্তিক ব্যাংকিং হলো ব্যাংকের নিজস্ব আয়োজন। যেখানে লেনদেনের ক্ষেত্রে শাখায় যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে। এটা মূলত ব্যাংকের সিবিএস (কোর ব্যাংকিং সলিউশন) সফটওয়্যারের মাধ্যমে দেশের যে কোনো প্রান্তের শাখা থেকে এক জন গ্রাহক সম্পর্কে জানতে পারা যায় কিংবা টাকা জমা ও উত্তোলন করা যায়।
দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে শাখার দিক থেকে সবচেয়ে বড় হলো সোনালী ব্যাংক। এই ব্যাংকের ১ হাজার ২২৫টি শাখা এখন অনলাইনের আওতায় এসেছে। তবে ব্যাংকটি এখনো ইন্টারনেটভিত্তিক লেনদেন শুরু করতে পারেনি। ইন্টারনেট ব্যাংকিং শুরু করার বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আতাউর রহমান প্রধান ইত্তেফাককে বলেন, ‘চলতি মাসেই শুরু করতে চেয়েছিলাম। আমরা পাইলট বেসিসে ইনহাউজ শুরুও করেছি। তবে ঝুঁকি পরীক্ষার জন্য বুয়েটকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম। আগামী মার্চ মাস নাগাদ আমরা ইন্টারনেটভিত্তিক লেনদেন শুরু করতে পারব।’ তবে তিনি বলেন, ‘আমাদের শাখাগুলো অনলাইন-নির্ভর হওয়ার কারণে এখন যে কোনো শাখা থেকে মানুষ সঞ্চয়পত্র কিনতে পারছে। আরটিজিএস (রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট)-এর মাধ্যমে টাকা পাঠাতে পারছেন গ্রাহকেরা। আর ইতিমধ্যে আমরা চালু করেছি ঘরে বসে মাত্র ৫ মিনিটে অ্যাকাউন্ট খোলার পদ্ধতি। এতে আমরা বেশ সাড়া পেয়েছি। এখন গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী ইন্টারনেটভিত্তিক লেনদেনও চালু হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বিডিবিএল ও বেসিক ব্যাংকের প্রায় ৪ হাজার শাখা রয়েছে। এসব শাখায় সিবিএস (কোর ব্যাংকিং সলিউশন)-এর আওতায় শতভাগ অনলাইন সুবিধা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। গ্রাহকদের ইন্টারনেট লেনদেনের সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো এখনো আসতে না পারার কারণ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকসমূহে দক্ষ জনবলের অভাব ও শাখার সংখ্যা বেশি হওয়ায় দ্রুত অনলাইন প্রযুক্তি গ্রহণে সক্ষম হচ্ছে না। এছাড়া বেসরকারি ব্যাংকের শাখা শহরকেন্দ্রিক হলেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শাখা পল্লি এলাকায় বেশি। গ্রামে হওয়ায় গ্রাহকের পাশাপাশি ব্যাংকের কর্মকর্তারাও তুলনামূলক কম প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৬১টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ৪০টিতেই ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা চালু রয়েছে। দিনে দিনে অনলাইনে লেনদেনের এই ব্যাংকিং সেবা জনপ্রিয় হচ্ছে। ইন্টারনেট ব্যাংকিং সুবিধাজনক হওয়ায় দেশীয় গ্রাহকের চেয়ে বিদেশিরাই আগ্রহ দেখাচ্ছেন বেশি।
ইন্টারনেট ব্যাংকিং বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শামস-উল-ইসলাম বলেন, অগ্রণী ব্যাংকে হতদরিদ্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের গ্রাহক রয়েছেন। এসব গ্রাহক এখনো ইন্টারনেট ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হননি। তবে বড় গ্রাহকদের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে আমাদের ইন্টারনেট ব্যাংকিং শুরু করার চিন্তা-ভাবনা আছে। কবে নাগাদ সেটা শুরু হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয় বলে জানান তিনি।