অণুগল্প

যুদ্ধ শেষে

ডিসেম্বরের শেষ। ভোরবেলা ফসল শূন্য বিস্তৃত মাঠের মাঝখান দিয়ে কুয়াশা ঠেলে হেঁটে যাচ্ছে তিনজন মানুষ। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত প্রায় বিধ্বস্ত তিন তরুণকে এখন আর প্রাণোচ্ছল টগবগে যৌবনের প্রতীক বলার কোনো উপায় নেই। যুদ্ধে যাবার শ্রেষ্ঠ সময়ে তারা যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল, এখন যুদ্ধ শেষে ফিরে যাচ্ছে।

অন্যান্য বছর শীত পুরোপুরি জাঁকিয়ে বসার আগেই ফসল কাটা হয়ে যায়। পায়ের তলায় মুচমুচ করে ভেঙে পড়ে নাড়া, ধানের অপ্রয়োজনীয় গোড়ালি। ফসলের পরিবর্তে এবারে জমিতে জন্মেছে আগাছা, লতাগুল্ম কাঁটাগাছ। এখানে সেখানে ধইঞ্চা-ধুন্দুল, আকন্দের ঝোপঝাড়। রাতভর শিশিরে ভিজে সবুজ গাছপালা এখন পায়ে পায়ে জড়িয়ে যেতে চায়। 

সবচেয়ে কম বয়সের ছেলেটি সবার পেছনে হাঁটছে। তার কাঁধে একটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল, হাতে একটি কাপড়ের পুটুলি। কী ভাবছে সে মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই। সে ভাবছিল, বৈশাখ মাসে বাড়ি থেকে বেরিয়ে শরণার্থী শিবিরে ট্রেনিংক্যাম্পে সীমান্তে আর যুদ্ধের মাঠে সাড়ে সাত মাস সময় কেমন চোখের পলকে উড়ে গেল! নিত্য নতুন উত্তেজনার সঙ্গে মাঝেমধ্যেই হতাশা, ভীতি ও আতঙ্কের পাশাপাশি ছিল সাহসের সঙ্গে লড়াই আর যুদ্ধ জয়ের আনন্দ। দিনগুলো ভালোই ছিল। এখন বাড়ি ফিরে কী যে দেখতে হবে কে জানে। তারপরেও মায়ের হাতের পুঁটি মাছের ঝোল, পোড়া বেগুনের ভর্তা আর ঘন ডাল দিয়ে এক থালা ভাত খাবার স্বপ্ন নিয়ে সে হাঁটতে থাকে।

মাঝের মধ্য বয়েসি লোকটির মুখ জুড়ে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। পরনের লুঙ্গিটাকে সে দুভাগ করে হাঁটু পর্যন্ত তুলে কোমরের কাছে গিঁট দিয়ে রেখেছে। রাইফেলটাকে দু কাঁধের উপরে আড়াআড়ি করে ফেলে তার উপর দিয়ে দুই হাত ঝুলিয়ে দিয়েছে সে। তার কাঁধ থেকে ঝুলছে একটি ঝোলাব্যাগ। সে ভাবছিল তার স্ত্রী ও দুই পুত্রকন্যার কথা। যুদ্ধে যাবার সময় ছোট মেয়েটা কেবল ‘বাবা—বাবা’ ডাকতে শিখেছিল। এখন সে কত বড় হতে পারে সে ভাবতে পারে না। এত বড় একটা যুদ্ধ শেষে কারো জন্যে কিছু না নিয়ে একেবারে খালি হাতে ফিরছে সে। পরক্ষণেই ভাবে, এখন আর কোনো কিছুরই অভাব থাকবে না। ভাত কাপড়, ছেলেমেয়ের লেখাপড়া, বউয়ের সাধ-আহ্লাদ সবকিছু এখন হাতের মুঠায়। ঠান্ডা বাতাসে বুক ভরে নিশ্বাস নেয় সে।

সামনে যে হাঁটছিল তার কাঁধে স্টেনগান, কোমরের বেল্টের সঙ্গে ঝুলছে দুটি গ্রেনেড। যুদ্ধে যাবার আগে সে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র। পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছিল জোরেশোরে। মেয়েটির পক্ষে আর অপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। মা-বাবা রাজি না থাকলেও বিয়ে হয়ে যেত পরীক্ষার পরেই। সে কি এখনো অপেক্ষা করে আছে! থাকলে তাকে চমকে দেয়া যাবে। মেয়েটি গর্ব করে বলতে পারবে, ‘সে ফিরে এসেছে। যুদ্ধ শুধু শেষ করে আসেনি, একটা যুদ্ধ জয় করে ফিরে এসেছে।’

প্রান্তরের মাটিতে আধখানা পুঁতে থাকা একটা পরিত্যক্ত হেলমেট তার পায়ে বাঁধে। চলার গতি হঠাত্ শ্লথ হয়ে যায়। মেয়েটির প্রেমে পড়ে একসময় সে কবিতা লিখতে শুরু করেছিল। আকস্মিকভাবে পৌষের কুয়াশা ঢাকা সকালে কবিতার কয়েকটি লাইন তার মাথার ভেতরে অণুরণন ছড়িয়ে ঘুরতে থাকে।  

‘সাহসের লাঙ্গলে চষা এই খেত। এ মাঠে ছড়ানো হয়েছে বুলেটের বীজ, রক্ত ঢেলে জমিতে দিয়েছি সেচ। নিহত মানুষের শরীর এই মাটিতে মিশে উর্বর করে তুলেছে ভূমি। বিস্তৃত এ প্রান্তরে নিশ্চয়ই ফলে যাবে স্বপ্নের ফসল।’