গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় একটি নীতি ২০১৫ সালের ২১ ডিসেম্বর হলেও তা গত পাঁচ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে পদে পদে গৃহকর্মীদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। ক্রমেই বেড়ে চলেছে তাদের ওপর নৃশংস সব হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনা। সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনেরা বলছেন, নীতিমালাটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় দেশ জুড়ে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে চলছে।
গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা-২০১৫তে অনেক ভালো কিছু দিক নির্দেশনা থাকলেও তা বাস্তবে গৃহকর্মীরা জানেন না। ঐ গৃহকর্মীরা এখনো সবচেয়ে কম মজুরি পান, শ্রমিক হিসেবে তারা কোনো মর্যাদা পান না। তাদের কাজের কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই, নেই কোনো সাপ্তাহিক ছুটি, বেতনেরও নেই কাঠামো। যে যেভাবে খুশি চুক্তি ভিত্তিতে গৃহশ্রমিক নিয়োগ দিচ্ছেন। ফলে সমাজের সস্তা মজুরির এই গৃহকর্মীদের ওপর সহজেই নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছেন নিয়োগকারীরা।
দেশে রয়েছে প্রায় ২০ লাখ গৃহকর্মী। এদের ৮০ ভাগই মেয়ে শিশু। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও ইউনিসেফের এক জরিপে এ তথ্য জানা যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর-২০১৪ সালের জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ অনুযায়ী গৃহকর্মে নিয়োজিত ১ লাখ ২৫ হাজার শিশুকর্মীর বয়স ৫ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ মেয়ে শিশু।
এই বিপুলসংখ্যক গৃহকর্মীর সার্বিক কল্যাণ ও গৃহকর্মকে ‘শ্রম’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ২০১৫ সালের ২১ ডিসেম্বর ‘গৃহশ্রমিক সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা-২০১৫’এর খসড়া অনুমোদন করা হয়। এই নীতিমালায় গৃহপরিচারিকাদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, ১২ থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত কিশোর-কিশোরীদের গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ দিতে হলে নিয়োগের চুক্তি, মজুরি নির্ধারণ, মজুরি পরিশোধ, কর্মঘণ্টা, ছুটি, বিশ্রাম, সুষ্ঠু ও মর্যাদাসম্পন্ন কাজের পরিবেশ, বিনোদন, প্রশিক্ষণ, চিকিত্সা, ধর্ম পালনের সুযোগ ও দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে ফৌজদারি দণ্ডবিধি এবং নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইনসহ বিদ্যমান আইনে শাস্তির সুনির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী, কোনো শ্রমিক ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে পারেন না। কিন্তু গৃহশ্রমিকেরা ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা, কখনো তার বেশিও কাজ করেন। গৃহকর্মী নির্যাতন প্রতিরোধে যে নীতিমালা করা হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে—১৪ বছরের কম বয়সি কোনো শিশু গৃহকর্মী হতে পারবে না। তবে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সিরা হালকা ধরনের কাজ করতে পারবে। এই ‘হালকা ধরনের কাজের’ কোনো সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়নি।
গৃহকর্মীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনের নেতারা বলছেন, প্রতিদিন কত গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হন, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান জানা নেই। তবে নির্যাতনের প্রায় ৯০ শতাংশ ঘটনা নানাভাবে চাপা পড়ে যায়। আর বছরে গড়ে মারা যায় ৩০ জন। শুধু হত্যাকাণ্ড বা মুমূর্ষু অবস্থায় কোনো গৃহকর্মী হাসপাতালে ভর্তি হলেই কেবল সেই ঘটনা প্রকাশ পায়। নির্যাতনকারীদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রেফতার করা হলেও আইনের ফাঁক গলে কিংবা অর্থের কাছে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ থেকে চলতি বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫৭৪ জন গৃহকর্মী নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির সভানেত্রী ও মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সালমা আলী ইত্তেফাককে বলেন, অত্যন্ত ভালো একটা দিকনির্দেশনা এই নীতিমালাটি। করোনার সময় আমরা মাত্র একটা মিটিং করতে পেরেছি। গৃহকর্মীদের সচেতন করতে হবে। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, গৃহকর্মী নির্যাতন বা হত্যা মামলা টাকার মাধ্যমে আপস হয়ে যায়। ১২ বছরের নিচের মেয়েরা যেন কাজে না আসতে পারে, এসব বিষয়ে সচেতন করতে হবে।
জাতীয় গার্হস্থ্য নারী শ্রমিক নেটওয়ার্কের উপদেষ্টা শ্রমিক নেতা আবুল হোসাইন ইত্তেফাককে বলেন, চলতি বছর ২১ ডিসেম্বর গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালাটির পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে কিন্তু তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। তবে করোনা মহামারির কারণে এ বছর কাজ এগোয়নি বলে জানান তিনি।
গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের সদস্যসচিব নাজমা ইয়াসমীন ইত্তেফাককে বলেন, গত ১০ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে আমরা দেখেছি, নির্যাতনের মাত্রা কমছে না। গত বছরের চিত্রটা কিছুটা ভালো থাকলেও চলতি বছর করোনা মহামারিতে গৃহকর্মী হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে।