দৈনিক ইত্তেফাকের জন্মদিনের সংখ্যা থেকে—

গভর্ণর-জেনারেলের খেদমতে

 

পাকিস্তানের গভর্ণর-জেনারেল পূর্ব পাকিস্তানে সফররত আছেন। এই প্রদেশের সাধারণ নির্বাচন আগামী ফেব্রুয়ারী মাসে অনুষ্ঠিত হইবে বলিয়া ঘোষণা করা হইয়াছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হইবার পর পূর্ব পাকিস্তানে এই প্রথম নির্বাচন হইতে চলিল। এই নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে সকল মহলই একমত। ইতিপূর্বে ১৯৪৬ সালে যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, উহার উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তান। পাকিস্তান কায়েম হইবার পর রাষ্ট্রব্যবস্থার নীতি নির্ধারণ করিতে নূতন নির্বাচন অনুষ্ঠান করতঃ জনসাধারণের মতামত গ্রহণ করা অপরিহার্য ছিল। কিন্তু আপসোসের বিষয়, বৃটিশের হাত হইতে যে দলটি রাষ্ট্র-ক্ষমতার উত্তরাধিকারী হইলেন, তারা দেশবাসীর মতামতের তোয়াক্কা করিলেন না। সুতরাং এ কথা বলা চলে যে, গত ছয় বছর যাবত শাসক-গোষ্ঠী যা কিছু করিয়াছে ভালই হউক আর মন্দই হউক সব কিছুই জন সম্মতি ব্যতিরেকেই করা হইয়াছে। ইহা গণতন্ত্র সম্মত হয় নাই।

যা হোক, বিলম্বে হইলেও পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনকে আমরা সরকারী নীতি ও বিরোধীদলসমূহের নীতির উপর জনমত গ্রহণের সুযোগ হিসাবেই যাচাই করিতে চাই। অতীতের কাহিনী ঘাঁটা এস্থলে আমাদের উদ্দেশ্য নয়। সঠিকভাবে জনমত যাচাই করিতে হইলে নির্বাচন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হওয়া একান্ত প্রয়োজন। সরকারী চাপ, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা প্রলোভন দ্বারা ভোটারদের উপর প্রভাব বিস্তার করার সর্বপ্রকার আশঙ্কাকে দূরীভূত করিতে হইবে। ‘নির্বাচন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হইবে’ মুখে এই কথা বলিলে চলিবে না—ভোটারদের মধ্যে অনুভূতি সৃষ্টি করিতে হইবে যাতে তারা সন্দেহাতীতভাবে অনুভব করে যে, সত্যিকার ভাবেই তারা তাদের ইচ্ছামত প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে।

গণতন্ত্রের এই মূলনীতির পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা পর্যালোচনা করা যাউক। এখানে মন্ত্রীরা সরকারী খরচায় নির্বাচনী সফর চালাইতেছেন। সরকারী কর্মচারীদের দ্বারা নির্বাচনী সভার আয়োজন করা হইতেছে, সরকারী মাইক, সরকারী গাড়ী হরদম ব্যবহার করা হইতেছে।

এ অভিযোগও শুনা যাইতেছে যে, সরকারী কাগজে সরকারী ছাপাখানায় মুসলিম লীগের প্রচারপত্র, হ্যান্ডবিল ইত্যাদি ছাপা হইতেছে। এমনকি সরকারী রিলিফের মাধ্যমেও ভোটের দর কষাকষি চলিতেছে।

এই অবস্থা চলিতে দিলে আসন্ন নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা হইবে না—সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যেই প্রতিযোগিতা চলিবে। এবং ব্যালট বাক্সও নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করিবে না। গভর্ণর-জেনারেল নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে আমাদের সহিত একমত হইবেন যে, নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথ এটা নয়। পাকিস্তানের জনসাধারণ নিতান্তভাবে গণতন্ত্র প্রিয়। কিন্তু মুসলিম লীগ সরকার যদি তাদের গদী আঁকড়াইয়া থাকিতে ন্যায়নীতি ও গণতন্ত্রের প্রতি এইরূপ অমর্যাদা প্রদর্শন করেন, তবে তার ফল যে শুভ হইবে না একথাও আমরা গভর্ণর-জেনারেলের নিকট নিবেদন করিতে চাই।

আমরা বিশ্বাস করিতেছিলাম যে, পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি দূরীকরণের মহান উদ্দেশ্য নিয়া গভর্ণর-জেনারেল নাজিম-মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করিয়াছিলেন। নাজিম-মন্ত্রিসভাকে অনিয়মতান্ত্রিক উপায়ে অপসারণ করা হইয়াছে, তাহা জানিয়াও ভবিষ্যত্ সুফলের আশা করিয়া আমরা গভর্ণর-জেনারেলের কার্য্যকে সমর্থন দিয়াছিলাম। কিন্তু দেখা যাইতেছে যে, মোহাম্মদ আলী-সরকার নাজিম-সরকার অপেক্ষাও অগণতান্ত্রিক, ন্যায়নীতি বর্জিত বাঁকা পথে চলিয়াছেন। প্রধানমন্ত্রীর পবিত্র আসন হইতে তিনি দলীয় প্রচারণা শুরু করিয়াছেন—তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা সরকারী খরচায় সুদূর করাচী হইতে ঝাঁকে ঝাঁকে পঙ্গপালের মত পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে অংশ গ্রহণ করিতেছে। কিছু না দেখিয়াই বা প্রধানমন্ত্রী হইবার পর পূর্ববঙ্গে একটা জনসভায় হাজির না হইয়াই, জনাব মোহাম্মদ আলী করাচী বসিয়া ঘোষণা করিতেছেন—‘মোমেনশাহীতে মুসলিম লীগ কাউন্সিল অধিবেশন নির্বাচনে জয়ের পূর্বাভাস।’ প্রতিটা মন্ত্রী যেন ‘গণকঠাকুর’।

লীগ সরকারের এই সব কাণ্ডকারখানা দেখিয়া স্বাভাবিকভাবেই জনগণের মধ্যে চরম বিক্ষোভ ফাটিয়া পড়িতেছে। এই লীগ মন্ত্রীরা (এবং তাঁদের ডানা সম্বল করিয়া তথাকথিত লীগ নেতারা) যেখানেই যান, সেখানেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে গণবিক্ষোভ লক্ষিত হইতেছে। ইহার ফলে এক দারুণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে। শান্তি ও শৃঙ্খলার নামে মন্ত্রীদল পুলিশদেরে জনতার বিরুদ্ধে লেলাইয়া দিতেছে—পরিণামে জনতা ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ হইতেছে। ইহা নিঃসন্দেহে এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি। সরকারী কর্মচারী, পুলিশ বা আনসার কোন রাজনৈতিক দলীয় প্রতিষ্ঠান নয়—তারা রাষ্ট্রের খাদেম। এমতাবস্থায় তা’দিগকে দল বিশেষের ‘নিরাপত্তার’ জন্য ব্যবহার করা ঘোরতর আপত্তিজনক। গভর্ণর-জেনারেলকে সাহসের সহিত এই পরিস্থিতির অবসান করিতে হইবে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, মুসলিম লীগ রাজনৈতিক দল হিসাবে নির্বাচনী প্রচারণায় বাহির হইলে বিরোধীদল কখনও তাদের কালো পতাকা, বা পচা ডিম দ্বারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করিবে না—কারণ প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ভোটারদের নিকট ক্যানভাস করার অধিকার রহিয়াছে। তাদের মৌলিক আপত্তি—সরকারী বর্মে সাজিয়া লীগ দলের নির্বাচনী প্রচারণা চালাইবার বিরুদ্ধে।

নুরুল আমিন-দল গদীর গরজে অনেক কিছু করিতে পারেন—কিন্তু তার সরকার বিভিন্ন স্থানে কর্মীদের উপর যেভাবে বেপরোয়া পুলিশী জুলুম চালাইতেছেন, তার পরিণতিতে দেশে কি ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হইবে, সেদিকেও আমরা গভর্ণর-জেনারেলের বিচার-দৃষ্টি আকর্ষণ করিতেছি এবং সঙ্গে সঙ্গে এ সতর্কবাণীও উচ্চারণ করিতে বাধ্য হইতেছি যে, অত্যাচার ও জুলুম কোনদিনই গণদাবীকে দমাইয়া রাখিতে পারে নাই, পারিবেও না। বাংলার  রাজনৈতিক ইতিহাস—জালেমের বিরুদ্ধে জেহাদের ইতিহাস— গভর্ণর-জেনারেলের নিশ্চয়ই জানা আছে।

তাই গভর্ণর-জেনারেলের নিকট আমাদের সংক্ষিপ্ত আরজ এই যে, অবিলম্বে নুরুল আমিন-মন্ত্রিসভা ভাঙ্গিয়া দিয়া অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রথম ক্ষেত্র প্রস্তুত করুন। সরকারী কর্মচারী বা সরকারী সম্পত্তি কোন দলীয় কার্য্যে ব্যবহার নিষিদ্ধ করুন। রেডিও এবং অন্যান্য সরকারী প্রচারপত্রে দলীয় প্রোপাগান্ডা বন্ধ করুন। নির্বাচনী প্রচারণা চালাইতে সকল দলকে সমান সুযোগ ও অধিকার প্রদান করুন।

বানান অপরিবর্তিত