দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তানে অনেক বাধাবিপত্তি চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বলতে গেলে রাজনৈতিকভাবে ক্রলিং করে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করেন। প্রবেশের পূর্বে দুই-দুই বার যুক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকায় আসতে বাধা প্রদান করা হয়। তৃতীয় বারে তিনি পাহাড়সম বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে ঢাকায় অবস্থান নিয়েই টের পান, জিন্নাহ সাহেব-কায়েদে আযমের উন্মত্ততায় দেশ দ্বিজাতি তত্ত্বের ধর্মান্ধতার উত্তাল তরঙ্গমালায় অবিশ্রান্ত ভাসছে।
সারা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে পূর্ব পাকিস্তানে এসে মুখ্যমন্ত্রীর পদ টিকিয়ে রাখার জন্য আস্থা ভোটের অতলান্তে পড়তে হলো। এখান থেকেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিরুদ্ধে জিন্নাহ সাহেবের ষড়যন্ত্রের শুরু। ষড়যন্ত্রের কাছে মাথা নত করার আপসকামিতা বা মেনে নেওয়ার পাত্র শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন না। এই উপমহাদেশে সবচাইতে অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করে লন্ডন থেকে ব্যারিস্টার এবং ব্যাচেলর অব ল ডিগ্রিধারী শহীদ সাহেব দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের হাত ধরে ডক শ্রমিক ও ধাঙড়দের সংগঠিত করার প্রত্যয় দৃঢ়চিত্তে রাজনৈতিক অভিযাত্রায় পদচারণা শুরু করেন। মাটি ও মানুষের অতি কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে রাজনীতি শুরু করাটা তাকে একান্তভাবেই সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়। পশ্চিম পাকিস্তানের অবিভক্ত পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী অনায়াসেই পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন হয়ে যান। তার ক্ষেত্রে কোনো আস্থা ভোটের প্রয়োজন হয়নি। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী জনগণকেই তার রাজনৈতিক লড়াইয়ের শক্তি ও মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন। তিনি আওয়ামী লীগ (আওয়ামী মুসলিম লীগ) প্রতিষ্ঠার উষালগ্ন হতেই জনগণ ও সংগঠন এই দুটির মধ্যে রাখিবন্ধন সৃষ্টিতে অনবদ্য ও অবিশ্রান্তভাবে কাজ করেছেন। সেই প্রচেষ্টায় মানিক ভাই, টাঙ্গাইলের শামসুল হক সাহেব, মুজিব ভাই, সর্বজনাব আতাউর রহমান খান, জহিরউদ্দিন সাহেব, আবুল মনসুর আহমদ, খাজা খয়রাত হোসেন, মাওলানা তর্কবাগীশ আব্দুল জব্বার খদ্দরসহ অনেকেই অসীম সাহসে বুক বেঁধে শহীদ সাহেবের নেতৃত্বে বন্ধুর পথে পরিক্রমণের জন্য নতুন করে রাজনৈতিক অভিযাত্রায় শরিক হন। সে অনেক কথা। সেটি দীর্ঘ ইতিহাস। তার অবতারণা ও বিশ্লেষণ এই নিবন্ধের স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয়।
জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী উদ্গত একগুচ্ছ প্রজ্বলিত তাজা প্রাণের সমাহারে মুসলিম লীগের একনায়কতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম গড়ে তোলার প্রয়োজন উপলব্ধি করেন। তত্কালীন পাকিস্তানে একনায়কতন্ত্র ধর্মান্ধতার মতোই শিকড় গাড়ে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সাহেবের বিরোধিতা করা বা তার বিরুদ্ধে কোনো সংগঠন গড়ে তোলা তখনকার প্রেক্ষাপটে ইসলামের বিরোধিতা করারই নামান্তর ছিল। আর ধর্মনিরপেক্ষতা, সেটা তো ছিল নাস্তিকতারই নামান্তর। অথচ গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা—এই দুটি চেতনাকে ভিত্তি করেই সোহরাওয়ার্দী সাহেবের রাজনৈতিক অভিযাত্রা শুরু। প্রথমেই তিনি আসাম থেকে মওলানা ভাসানীকে এনে তাকে সভাপতি ও টাঙ্গাইলের শামসুল হক সাহেবকে সাধারণ সম্পাদক, খন্দকার মোশতাক আহমদ ও শেখ মুজিবুর রহমানকে যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক এবং অলি আহাদ সাহেবকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে প্রথম গণতান্ত্রিক বিরোধী দল সৃষ্টি করেন। পাশাপাশি এই সংগঠনটির অভিযাত্রায় একটি শক্ত সাবলীল সংবাদপত্রের প্রয়োজনীয়তা প্রকটভাবে উপলব্ধি করে মওলানা ভাসানীকে সভাপতি এবং তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে সম্পাদক করে একটি পত্রিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ইয়ার মোহাম্মদ খানকে এর প্রকাশকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
প্রথমে সাপ্তাহিক এবং পরবর্তী সময়ে দৈনিক হিসেবে ইত্তেফাকের পাহাড় ঠেলে দুর্দমনীয় অগ্রযাত্রার অভিযান শুরু হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন হতে আমৃত্যু ইত্তেফাকের অর্থনৈতিক জোগান দেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। শহীদ সোহরাওয়ার্দী স্বয়ং তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে চাকরি থেকে পদত্যাগ করিয়ে ইত্তেফাকের দায়িত্ব অর্পণ করেন। ১৯৪৯ সালের ১৫ আগস্ট সাপ্তাহিক হিসেবে ইত্তেফাকের প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর পত্রিকাটি দৈনিক হিসেবে যাত্রা শুরু করে।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, ’৬৩ সালে শহীদ সাহেব যখন চিকিত্সার জন্য বৈরুতে গমন করেন, তখন তাকে তার ভক্ত নেতৃবৃন্দ প্রশ্ন করেন—স্যার, আমাদের জন্য কী রেখে যাচ্ছেন? আমরা কী নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাব? কী নিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অভিযাত্রায় সামনের দিকে অগ্রসর হব? সোহরাওয়ার্দী সাহেব তার দক্ষিণ হস্তের দুটি আঙুল উঁচিয়ে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলেছিলেন—একটি কলম আর একটি মাঠ। কলমের অর্থ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া আর মাঠ মানে শেখ মুজিবুর রহমান। তার হূদয়ের স্পন্দনের মতোই প্রিয় দুটি নাম মানিক ও মুজিব। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অর্থায়নে মানিক মিয়ার তত্ত্বাবধানে ইত্তেফাকের অভিযাত্রার শুরু।
তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সম্পাদনায় পরিচালিত ইত্তেফাক অবহেলিত ও উপেক্ষিত ঘুটেকুড়োনি হতে শুরু করে সমাজের অতি ছোটখাটো অথচ হূদয়স্পর্শী ঘটনাগুলোকে তুলে আনত। মানিক ভাই এর সম্পাদক ছিলেন বটে, কিন্তু ইত্তেফাকে একগুচ্ছ তাজা দীপ্তপ্রাণ সত্যনিষ্ঠ ও নির্মল সততার প্রতীক সিরাজুদ্দীন হোসেন, আসফ উদ্দৌলা রেজা, মাহমুদ উল্লাহ, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী প্রমুখ কাজ করতেন। কলামিস্ট হিসেবে স্থান-কাল-পাত্র উপ-সম্পাদকীয় লিখতেন আব্দুল হামিদ।
আইয়ুববিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন ইত্তেফাককে এদেশের সব রাজনৈতিক বক্তব্যের মুখপত্র না বলে কণ্ঠস্বর বলাই হবে সমীচীন। ঘুটেকুড়োনি হতে রাজধানী পর্যন্ত সব স্তরের সংবাদ স্থান পেত আইয়ুববিরোধী রাজনৈতিক মতামত তৈরির লক্ষ্য থেকে। ইত্তেফাকে তখন যারা কাজ করতেন, তারা ইত্তেফাককে কখনোই কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হিসেবে নেননি। বরং স্ব স্ব হূদয়ের গহ্বরে যে অগ্নস্ফুিলিঙ্গ, যে দাবানল, যে আলোকরশ্মি বিচ্ছুরিত হতো—তাকে প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে তারা ইত্তেফাককে গ্রহণ করেছিলেন। ইত্তেফাক ছিল তাদের চেতনার কেন্দ্রবিন্দু, হূদয়ের ধড়কানি ও বিশ্বাসের আঙ্গিক। আইয়ুব খান যখন দৈনিক পাকিস্তান নামে একটি বাংলা পত্রিকা প্রকাশের মনস্থির করেন, তখন ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদক জনাব সিরাজুদ্দীন হোসেনকে বিলাসী আসবাবপত্রে সুসজ্জিত বাড়ি, দুটো গাড়ি এবং লক্ষাধিক টাকা বেতনের প্যাকেজ উপস্থাপন করেছিলেন। আইয়ুব খানের প্রতিনিধি আলতাফ গহরকে প্রতিউত্তরে সিরাজ ভাই অত্যন্ত প্রত্যয়দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন—সিরাজুদ্দীন হোসেন সাংবাদিকতা করে মাটি ও মানুষের হূদয়ের স্পন্দনকে কলমের আঁচড়ে প্রস্ফুটিত করার লক্ষ্যে। সাংবাদিকতার নামাবলি গায়ে দিয়ে চাকরি করে না।
প্রসঙ্গক্রমে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা উল্লেখযোগ্য। ’৬৪-এর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর আইয়ুব খানের মুসলিম লীগ যখন পূর্ব পাকিস্তানে একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করে, তখন সিরাজ ভাই কাঠের হরফে আট কলামের শিরোনাম করেন—‘পূর্ব-বাংলা রুখিয়া দাঁড়াও’। ইত্তেফাকের সম্পাদক মানিক ভাই ইত্তেফাক ভবনের নিচতলায় বসতেন। তিনি বার্তা সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে তার কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে শিরোনামটি বদলে দেওয়ার অনুরোধ করলেন। স্বভাবসুলভ হাসি হেসে সিরাজ ভাই বললেন—মানিক ভাই, এই মুহূর্তে হেডিং অথবা সিরাজুদ্দীন হোসেন—দুটোর একটাকে আপনার বেছে নিতে হবে। শিরোনাম আমি বদলে দেব কিন্তু আমি আর ইত্তেফাকে বসব না। মানিক ভাই অকপটে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বললেন, শিরোনাম বদলানোর প্রয়োজন নাই, আমার সিরাজুদ্দীন হোসেনকেই প্রয়োজন। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, কোনো এক গরুর হাটে একটি গরু একজন মানুষকে শিংয়ের গুঁতো দিয়ে চিত্ করে ফেলে দেয়। লোকটি বিডি (বেসিক ডেমোক্রেসি) মেম্বার। সিরাজ ভাই শিরোনাম করলেন—‘চিনিল কেমনে?’ তখন শিরোনামটি সারা দেশের এমনকি মুসলিম লীগারদেরও মুখের বচন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ব্যতিক্রমধর্মী কিছু হলেই বলে উঠত— ‘চিনিল কেমনে?’ ’৭০-এর নির্বাচনের পূর্বে সব বিশ্ববিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ের প্রায় সব ছাত্র সংসদের নির্বাচনে বিজয়ের পর সিরাজ ভাই ৮ কলামের শিরোনাম করেন—‘এই যৌবন জলতরঙ্গ রোধিবি কী দিয়া? বালির বাঁধ? এই শিরোনামটি ছাত্রলীগের আবেগকে ছাত্রসমাজের চেতনায় রূপান্তরিত করে।
১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির পর মানিক মিয়া সামরিক শাসনের সমালোচনা করে কলাম লিখতে শুরু করেন। তারই জের ধরে ১৯৫৯ সালে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং এক বছর কারাবাস করতে হয়। ’৬৩ সালে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ’৬৪ সালে মানিক মিয়া মুক্তি পান। ৬ দফাকে সমর্থন করার অভিযোগে ’৬৬ সালের ১৫ জুন মানিক ভাইকে আবারও গ্রেফতার করা হয়। এর পরদিন সরকার ইত্তেফাকের প্রকাশনা বন্ধ করে দেয় এবং নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেসকে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। এরপর ১৯৬৯ সালে ১১ ফেব্রুয়ারি পত্রিকাটি প্রকাশের অনুমতি পায়। পরবর্তী সময়ে আইয়ুব সরকারের পক্ষ থেকে ইত্তেফাক বন্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে চাইলে মানিক ভাইয়ের কড়া জবাব—ইত্তেফাক কোনো ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়, ইত্তেফাক মানুষের কণ্ঠস্বর, অনুভূতির প্রতিধ্বনি ও হূদয়ের ধড়কানি। গণমানুষের কথা বলতে গিয়েই ইত্তেফাক প্রকাশনা বন্ধের হয়রানি সহ্য করতে হয়েছে, সেটিই তার রাজটীকা। এখানে ক্ষতিপূরণের প্রশ্নটি অবান্তর ও অনভিপ্রেত।
মানিক ভাই মোসাফির ছদ্মনামে ইত্তেফাকে কলাম লিখতেন। সেখান থেকে মানিক ভাই ডন-এর সম্পাদক স্যুলেরি সাহেবকে উদ্দেশ করে লেখেন—আপনি চাকরির জন্য সাংবাদিকতা করেন, আমি মাটি ও মানুষের জন্য নীতি ও আদর্শের টানে সাংবাদিকতা করি। লোভ-প্রলোভনে কোনো আপস করার শিক্ষা ও মানসিকতা ইত্তেফাকের সম্পাদক থেকে শুরু করে পিয়ন পর্যন্ত কারোর-ই নাই।
তখনকার দিনে আমরা যারা ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম, আমরা যারা বাঙালি জাতীয় চেতনার একটা বিমোহিত সত্তায় যারা বিশ্বাস করতাম, ‘এ মাটি আমার সোনা, আমি করি তার জন্মবৃত্তান্ত ঘোষণা’—যাদের চেতনার আঙ্গিক ছিল ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর’—তাদের সকলের ভাবনার প্রতিপাদ্য ছিল ইত্তেফাক। ইত্তেফাক না পড়লে আমাদের পেটের ভাত হজম হতো না। একটা অবর্ণনীয় দীপ্তিহীন আগুনের নির্দয় দহনে দগ্ধীভূত হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন আমি তো বটেই, আমরা অনেকেই রাস্তায় ফেরি করে ইত্তেফাক বিক্রি করেছি। বলা নিষ্প্রয়োজন, বিক্রয়লব্ধ টাকা ইত্তেফাকে যথাযথভাবে নিয়মিত জমা দিয়েছি। ইত্তেফাকের সঙ্গে ছাত্রলীগ কর্মীদের সখ্য অনেক গভীর ছিল। মানিক ভাইর সঙ্গে জেল খেটেছি। খুব সম্ভবত তিনি ধূমপান করতেন না কিন্তু আমার জন্য কার্টন কার্টন সিগারেট পাঠাতেন। ইত্তেফাক সমর্থন না দিলে বিদ্যুতের ঝলকানির মতো অতি স্বল্প সময়ে ৬ দফা এমন করে মানুষের হূদয় ছুঁতে পারত না। খুব নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে ইত্তেফাককে আন্দোলন তৈরির কারখানা বলা যায় নিঃসংকোচে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী ইত্তেফাক অফিস পুড়িয়ে দিয়েছিল। দুই দুই বার প্রকাশনা বন্ধ হবার পরও আজও ইত্তেফাক অমলিন ও অম্লানভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তবে পূর্বের মতো জনমত গঠনে সেরূপ প্রভাব রাখে না। সেটা অনেকখানি কমে এসেছে, এটিও সত্যের খাতিরে স্বীকার করতেই হবে। স্বাধীনতা-পূর্ব এদেশের সেই ক্ষুধার্ত পাঠকের সংখ্যা কমেছে। আর কমেছে বলেই গণতান্ত্রিক চেতনা ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। নির্বাচনের প্রশ্নে মানুষের আগ্রহ স্তিমিত হচ্ছে, ভোটকেন্দ্রে মানুষের উপস্থিতি বেদনাদায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণতন্ত্রের এই বেহাল চিত্র পৃথিবীর অন্য কোথাও তো নেই-ই, পার্শ্ববর্তী ভারতবর্ষেও পরিলক্ষিত হয় না। এই দৈন্যতা সৃষ্টির মূল যিনিই হন না কেন, এর দায়ভার রাজনৈতিক সব মহলকেই নিতে হবে। সরকার ও বিরোধী দলের নেতৃত্বের গণতান্ত্রিক মননশীলতার দুর্বলতা, ক্রমান্বয়ে সংবাদপত্র পাঠকের অপমৃত্যু ঘটাচ্ছে। সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনকে প্রত্যয়দৃঢ় সচেতনতায় এই পরিস্থিতির অবলুপ্তি ঘটাতে হবে। মনীষীরা বলেন, সংবাদপত্র রাতের ্লিগ্ধ নক্ষত্র নয়, মধ্যাহ্নের সূর্যরশ্মির মতো প্রোজ্জ্বল এবং উদ্ভাসিত। ইত্তেফাক যেহেতু গণমানুষের হূদয়ের ধড়কানি, বাংলার চিরায়ত মননশীলতাকে উজ্জীবিত করার দায়িত্ব তাদের স্কন্ধে অনেকখানি বর্তায়। শুধু ইত্তেফাকের পাঠক হিসেবে নয়, বাঙালি চেতনার দীর্ঘ পথপরিক্রমণের দৃপ্ত পদচারণা করেছি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মানুষের হূদয়ের গভীরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেওয়ার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছি। সেই সুবাদে পাঠকের মনন সৃষ্টির দাবি আমার ইত্তেফাকের কাছে অনেকখানি। আমি ইত্তেফাকের পাঠক সুহূদ শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নিঃসংশয়চিত্তে উচ্চারণ করব—জয়তু ইত্তেফাক, জয়তু বাংলার মানুষ।
ইত্তেফাকের ভাষা আগের মতো হূদয়কে আপ্লুত করে কি-না, উদ্বেলিত ও উচ্ছ্বসিত করে কি-না—সে বিচারের ভার পাঠকের। মালিকানা সূত্রে নয়, স্পন্দিত হূদয়ের অনুরণনে আমি ইত্তেফাক ঘরানার লোক। আমার যৌবনের ইত্তেফাক আর আজ জীবনসায়াহ্নের ইত্তেফাকের মধ্যে ভাষা ছন্দে-সাহসে ব্যতিক্রম থাকলেও আজও ইত্তেফাক না পড়লে স্বাচ্ছন্দ্যে আমার দিন কাটে না। ছায়াবিহীন ধূসর মরুভূমির মতো হূদয়টা খাঁখাঁ করে। সেই যৌবনের জলতরঙ্গের উচ্ছ্বসিত স্রোতধারা আজ অনেকটাই ম্রিয়মাণ হওয়া সত্ত্বেও শুচিশুদ্ধ মানসিকতায় ইত্তেফাককে হূদয়ে লালন করি। ইত্তেফাক আমার কাছে একটি সংবাদপত্র নয়, এটি আমার অনুভূতির অনুরণন। ইত্তেফাক না পড়লে হূদয়টা যেন ম্যাজ্-ম্যাজ্ করে। আজকে যারা ইত্তেফাকের মালিকানায় অধিষ্ঠিত আছেন, সেই ’৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবে আমার অনুরোধ, নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ হতে দেবেন না, সত্য প্রকাশে অকুতোভয় থাকবেন। সত্য কঠিন হলেও তাকে ভালোবাসবেন, হূদয়ের নিভৃত কন্দরে তাকে সযত্নে লালন করবেন। লোভ-লালসা ভয়-ভীতি ও প্রলোভনের আকর্ষণ থেকে নিজেদেরকে সযত্ন লালিত্যে দূরে সরিয়ে রাখবেন। ইত্তেফাকের ঐতিহ্যের আবিরমাখা জনপ্রিয়তার স্রোতধারাকে পূর্বের মতো বেগবান করতে না পারলেও নিঃশেষিত হতে দেবেন না।
ইত্তেফাক আর ১০ জনের কাছে নিছক সংবাদপত্র, আমার কাছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবাহের খরস্রোতা নদী। যদিও এর আঁকে-বাঁকে আজ অসংখ্য চর পড়েছে, তবুও আবহমান কাল ধরে নিজস্ব ঐতিহ্যে বয়ে যাওয়ার অব্যাহত প্রচেষ্টা রাখবে—সেটিই আমাদের কাম্য। ইত্তেফাককে আশীর্বাদ করার ধৃষ্টতা আমি রাখি না। তবে আশাবাদ ব্যক্ত করা ও প্রত্যাশা করার নিষ্কলুষ অধিকার অবশ্যই আমার আছে।
পরিবেশ অনেক বদলালেও ইত্তেফাককে তার ধারাবাহিকতা অম্লান ও অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। সেই ’৬৬-এর ৬ দফা আন্দোলন থেকে শুরু করে মনু মিয়ার রক্তাক্ত লাশ কাঁধে ছবিসহ বহু সচিত্র সংবাদ ইত্তেফাক প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমি তাই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, শহিদ সিরাজুদ্দীন হোসেন, আসফ উদ্দৌলা রেজাসহ অনেকেই আজ নেই। আমি তাদের সকলের বিদেহী আ্তাার মাগফেরাত কামনা করি। তাদের পরিবার-পরিজনদের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। ইত্তেফাক তার নিজস্ব ধারায় দেশ ও জাতির প্রয়োজনে আগ্নেয়গিরির গলিত লাভার মতো, প্রয়োজনে দাবানলের মতো জ্বলে ওঠার দৃষ্টান্ত প্রতিস্থাপন করতে পারবে—এই প্রত্যাশা করি।
লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা।