ডিসেম্বর মাস বাঙালির বিজয়ের মাস। অত্যাচারি দখলদারকে বিতাড়িত করার মাস। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনায়। তিনি এই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা পিতা। তাঁর শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এ বছর মুজিববর্ষ হিসেবে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধায় পালিত হচ্ছে। এই ডিসেম্বর মুজিববর্ষে পড়েছে। আগামী ডিসেম্বর অর্থাত্ ডিসেম্বর ২০২১-এ বিজয়ের ৫০ বছর পূর্ণ হবে। এখন মুজিববর্ষ চলছে এবং আসছে বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী। সময়টা খুবই উদ্দীপক।
তবে এই সময়টা বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করারও সময়। জাতীয় চার নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সময়। আর অন্য যারা রক্ত দিয়ে বা ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা ও বিজয় অর্জনে অবদান রেখেছেন তাদের সকলকে কৃতজ্ঞতা জানানোর সময়। বঙ্গবন্ধুসহ সকল শহিদের মাগফিরাত কামনা করার সময়। একই সঙ্গে রাজাকার-আলবদরসহ স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদেরকে এবং একই মানসিকতায় আবদ্ধ তাদের সকল উত্তরসূরির প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করার সময়। এদের সম্পূর্ণভাবে উত্খাত করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানোর অঙ্গীকার করার এবং সেই অনুসারে পদক্ষেপ গ্রহণ করার সময়।
বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য যারা ভাঙল তারা তো ওদেরই উত্তরসূরি। এরা বিভিন্ন সময়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। এই রক্তলাল সূর্যের দেশে এদের স্থান নেই এবং সেটা নিশ্চিত করতে হবে। তবেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। সকলকে ন্যায্যভাবে অন্তর্ভুক্ত করেই সেই পথ রচনা করতে হবে। একাত্তরের এই মাসেই বিজয়ের প্রাক্কালে অনেক বুদ্ধিজীবীকে রাজাকার-আলবদররা নির্মমভাবে হত্যা করে। সকল শহিদ বুদ্ধিজীবীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।
কুচক্রী স্বাধীনতা বিরোধীরা আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশীদার হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট। কিন্তু তাঁর আদর্শকে হত্যা করতে পারেনি। আজ তা স্বমহিমায় ভাস্বর। মুজিববর্ষে বিজয়ের এই মাসে আরো একটি ‘বিজয়’ অর্জিত হয়েছে। নিজ ব্যয়ে নির্মিত পদ্মা সেতু পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়েছে। পদ্মা সেতু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের নিদর্শন হয়ে থাকবে। উল্লেখ্য, যারা বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি আখ্যায়িত করেছিল তাদের বক্তব্যকে সর্বৈব মিথ্যা প্রমাণ করে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত। পদ্মা সেতুর মতো ব্যয়বহুল ও কারিগরি চ্যালেঞ্জ সম্বলিত প্রকল্প বাংলাদেশ নিজেই বাস্তবায়ন করল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ করোনার প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায়ও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করছে।
এই মাসেই জাতিসংঘ শিক্ষা সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানবিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) বঙ্গবন্ধুর নামে একটি পুরস্কার চালুর ঘোষণা দিয়েছে। পুরস্কারটি দুই বছর পর পর ক্রিয়েটিভ ইকোনমি বিষয়ে দেওয়া হবে। এই সংস্থা বঙ্গবন্ধুর ১৯৭১-এর ৭ মার্চের ভাষণকে একটি বিশ্ব দলিল ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা পিতার এরকম দুর্লভ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রত্যেক বাঙালির জন্য অতি গৌরবের। বাঙালির ভাষা আন্দোলন দিবস বা ভাষা শহিদ দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি। ভাষার মর্যাদা রক্ষার লক্ষ্যে বাঙালির রক্ত ঝরানোকে উপলক্ষ্য করে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ইউনেস্কো ঘোষণা দেয় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর, যা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০০২ সালে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় ইউএন রিজোলিউশন ৫৬/২৬২-এর মাধ্যমে। সব মাতৃভাষার সংরক্ষণ ও সমুন্নত রাখা এই দিবসের মূল তাগিদ। বাঙালির নিজের ভাষা সংরক্ষণে রক্তদানের ইতিহাস ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’-এর ধারণায় রক্তাক্ষরে খোদিত। বাঙালির জাতির চেতনায় অন্যতম গৌরব-স্তম্ভ এটি।
অপরদিকে এই ডিসেম্বর মাসে কোভিড-১৯ মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ চলমান। তবে প্রথম ঢেউয়ের সময় থেকে বর্তমানে এই বিরূপ অবস্থা মোকাবিলায় সরকারি সক্ষমতা বেড়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগও বেড়েছে। যেহেতু এই মহামারির প্রাদুর্ভাব হঠাত্ করে হয় তাই বিশ্বের কোনো দেশেরই প্রস্তুতি ছিল না। লক্ষণীয় বাংলাদেশে দ্বিতীয় ঢেউ এখন পর্যন্ত প্রথম ঢেউয়ের চূড়া ছাড়িয়ে যায়নি বরং গড়ে কমই আছে। আশা করা যায় আর বাড়বে না এবং পুনরায় সংক্রমণ ও মৃত্যু কমতে শুরু করবে। তবে ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা ও দক্ষতা জরুরি। আর খুবই জরুরি জনসাধারণকে স্বাস্থ্যবিধি (মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, হাত ধোয়া ইত্যাদি) পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সচেতনতা ও অনুসরণে ব্যাপক ঘাটতি পরিলক্ষীত হচ্ছে। প্রয়োজনে আরো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
মারণ ভাইরাস করোনার বিশ্বব্যাপী দৌরাত্ম্য আর কতদিন চলবে তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও টিকা আবিষ্কৃত ও ব্যবহূত হতে শুরু করছে। ফলে এই ভাইরাসের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার কার্যক্রম শুরু হলো। অবশ্য উন্নত বিশ্বের কয়েকটি দেশে। অন্যান্য উন্নত দেশ শিগগিরই সেইপথ অনুসরণ করবে। উন্নয়নশীল দেশসমূহে এই টিকা আসতে আরো সময় লাগবে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও আস্ট্রাজেনিকের আবিষ্কৃত এবং ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে প্রস্তুতকৃত করোনার টিকা বেক্সিমকো বাংলাদেশে আমদানি ও সরবরাহ করবে। ইতিমধ্যে চুক্তি হয়েছে। তবে এখনো এই টিকা চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। শিগগিরই পেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দ্বারা অনুমোদিত হলে বাংলাদেশে এই টিকা সরবরাহ করা শুরু হবে। কখন সেই দিন আসবে এখনো নিশ্চিত নয়। আশা করা যায় আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চ নাগাদ সম্ভব হতে পারে। আবার আরো কয়েক মাস দেরিও হতে পারে। এছাড়াও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টিকা পাওয়ার আশা করছে বাংলাদেশ। কিন্তু কখন তা ঘটবে তাও নিশ্চিত নয়। তবে সরকার গুরুত্বসহকারে এ বিষয়ে সচেষ্ট, তাই আশা করা যায় সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে দেশে টিকা প্রাপ্তি শুরু হবে।
পর্যাপ্ত টিকা প্রাপ্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষজ্ঞদের মতে কোনো দেশের করোনামুক্তির জন্য সেই দেশের অধিকাংশ মানুষ এই সংক্রামক রোগ প্রতিরোধক্ষম (দেশে হার্ড ইমিউনিটি) অর্জিত হতে হবে এবং তার জন্য কমপক্ষে ৭০ শতাংশ জনগণের টিকা নেওয়া প্রয়োজন। সে অবস্থা বাংলাদেশের মতো দেশসমূহে কখন বাস্তবে রূপ লাভ করবে তা একেবারেই অনিশ্চিত এখনো। বিশ্বব্যবস্থাকে সচেষ্ট হতে হবে যাতে বিশ্বের সকল মানুষ এই টিকা সহজে সংগ্রহ করতে পারেন।
স্বল্পোন্নত এবং স্বল্প-আয়ের দেশসমূহকে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে পর্যাপ্ত করোনা-টিকা সরবরাহ করা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে বলে আমি মনে করি। বিশ্বকে করোনা এবং করোনার অভিঘাত মুক্ত করার জন্য এ কাজ জরুরি কেননা এ সকল দেশে করোনা বিদ্যমান থাকলে বিশ্ব অর্থনীতির পুনর্জাগরণ বাধাগ্রস্ত হবে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অপরিমেয় ঘাটতি থাকবে। তাছাড়া ধরন ও বৈশিষ্ট্য পালটিয়ে আবিষ্কৃত টিকাসমূহকে অকার্যকর করে করোনা আবারো ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ করোনা মোকাবিলা এবং এর অভিঘাত থেকে অর্থনৈতিক পুনর্বাসন ও পুনর্জাগরণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সার্বিক বিবেচনায় অনেক দেশ থেকে ভালো সফলতা অর্জন করেছে।
বোরো আউশ ও আমন মিলে দেশে চালের প্রাপ্যতা বর্তমানে সন্তোষজনক। বিদ্যমান করোনা মহামারি, ঘূর্ণিঝড় ও উপর্যুপরি বন্যা সত্ত্বেও এই সফলতা। সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়ায় এই অর্জনে সরকারের কৃতিত্ব রয়েছে এবং একই সঙ্গে এতে কৃষক ও কৃষি শ্রমিকদের বিশেষ কৃতিত্ব রয়েছে। প্রয়োজন হলে চাল আমদানির ব্যবস্থা আছে বলে সরকারিভাবে বলা হয়েছে। চলমান বোরো মৌসুমে যাতে ফসল সঠিকভাবে উঠানো যায় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে যথাসময়ে বাঁধ মেরামত করা। এতে যেন কোনো গাফিলতি না হয় সেদিকে নজরদারি রাখা খুবই জরুরি।
খাদ্য উত্পাদন সম্ভাব্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সরকারি নীতি সাধারণভাবে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে উপযোগী। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ থাকা একান্তভাবে প্রয়োজন। করোনায় বিধ্বস্ত এবং অস্থিতিশীল বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতিতে খাদ্যের জন্য আমদানি নির্ভরতা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি নিরাপদ ও পুষ্টিনিরাপত্তার দিকেও সঙ্গত কারণে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। এক্ষেত্রে ইতিমধ্যে নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
করোনাকালে অসংখ্য অতিদরিদ্র ও দরিদ্র এবং বেকারত্বের শিকার স্বল্প আয়ের মানুষের আয় আরো কমে যায়, ফলে তাদের খাদ্য ক্রয় করার সক্ষমতায় ধস নামে। দেশে দারিদ্র্য বেড়েছে। বৈষম্যও বেড়েছে। আর্থিক সংকটে পড়া কোটি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত করা হয়। প্রথম দিকে অর্থনৈতিকভাবে বিধ্বস্ত অনেক মানুষ সহায়তার আওতায় না আসলেও এখন অবস্থার উন্নতি হয়েছে। শুরুতে ধান্দাবাজরা তত্পর থেকে ত্রাণ আত্মসাত্ করে অথবা যাদেরকে তা দেওয়ার কথা তাদের অনেকের কাছে না পৌঁছিয়ে অন্যত্র দিয়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে এ ব্যাপারে সরকারের শক্ত অবস্থান ও ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে পরিস্থিতির ভালো হওয়ায় ত্রাণ ও সহায়তা বিতরণে উন্নতি হয়েছে। তবে ত্রাণ বিতরণ সাময়িক পদক্ষেপ, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। উপার্জনের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ও পুনর্জাগরণে এখন সরকার কাজ করছে। এই লক্ষ্যে এ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১ লাখ ২১ হাজার কোটির অধিক (জাতীয় উত্পাদের ৪ দশমিক ৩ শতাংশ) সহায়তা ও প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। এর অধিকাংশ ঘোষণা করা হয় প্রথম দিকেই (১৩ এপ্রিল ২০২০ তারিখে। অর্থনীতি আবার জেগে উঠতে শুরু করেছে। উত্পাদন বাড়ছে। কৃষিখাতে সফলতার কথা আগেই বলা হয়েছে, রপ্তানিখাত আবার এগিয়ে যাচ্ছে, অন্যান্য খাতও পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা আগের চেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন।
এই লেখা শেষ করার আগে দুটো বিষয়ে কিছু কথা বলতে চাই। প্রথমত, ১৩ এপ্রিল ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজে অতি ক্ষুদ্র উদ্যোগসমূহকে চলতি মূলধন হিসেবে সহজ শর্তে প্রদেয় ঋণের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ রয়েছে। এখন পর্যন্ত এক্ষেত্রে কোনো অর্থ বিতরণ করা হয়নি। বর্তমানে কৌশল পরিবর্তনের লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে বলে জানা যায়। এসকল উদ্যোগের সংখ্যা দেশে প্রায় এক কোটি এবং সংশ্লিষ্ট জনসংখ্যা আড়াই থেকে তিন কোটি। এগুলো মূলত গ্রামে অবস্থিত কিন্তু শহরের অনানুষ্ঠানিক খাতসমূহেও অনেক আছে। এগুলো করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে আরো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে। জাতির সফল ও দৃঢ়ভাবে ঘুরে দাঁড়ানো এবং টেকসই অগ্রগতি এসকল মানুষকে বাদ দিয়ে সম্ভব নয়। কাজেই আর সময়ক্ষেপণ না করে প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন-বিধিব্যবস্থা নিরূপণ করে এ সকল প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।
দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে বৈষম্য। অবশ্য এটি শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বেই এক অমানবিক গুরুতর সমস্যা। এর ফলে বিশ্বের সর্বত্র অস্থিতিশীলতা বিরাজমান। বিশ্ব পরিমণ্ডলের একটি অতি সাম্প্রতিক উদাহরণ দেওয়া যায়। বিশ্বের সর্বোচ্চ ধনী বা বিলিওনারদের সম্পদ করোনাকালে এ বছরের এপ্রিল থেকে জুলাই সময়ে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ১০ দশমিক ২ ট্রিলিয়নে উন্নীত হয়েছে। কেমন করে তা ঘটল? সরকারগুলো, বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের সরকারগুলো অর্থনীতিকে চাঙা করার লক্ষ্যে যে সমস্ত প্রণোদনা দেয় তার বেশির ভাগ করপোরেট খাতগুলোতে চলে যায় আর সেগুলো বিলিয়নারদের মালিকানায় বলে তারা আরো ধনী হোন। অপরদিকে পিছিয়ে থাকা ও পিছিয়ে পড়া অসংখ্য মানুষ অর্থনৈতিকভাবে আরো দুর্বল হয়ে পড়েন। বিদ্যমান প্রকট বৈষম্য প্রকটতর হয় এবং এই ধারা আর্থ-সামাজিক পুনর্জাগরণ প্রক্রিয়ায় সর্বত্র চলমান রয়েছে।
বাংলাদেশেও এমন বাস্তবতা বিরাজমান। করোনাপূর্বকালেও বাংলাদেশে বৈষম্য বাড়ছিল (জিনি সূচক ২০১০-এ ছিল শূন্য দশমিক ৪৫ কিন্তু ২০১৮ সালে বেড়ে হয় শূন্য দশমিক ৪৮। উপর্যুক্ত যে কোটি মানুষের পারিবারিক অর্থনীতি লন্ডভন্ড হয়েছে করোনার আঘাতে, তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়াসহ নানা প্রতিবন্ধকতা থাকায় অধিক সক্ষম অন্যান্য খাত থেকে তারা আরো পিছিয়ে পড়ছে। অন্যান্য অসুবিধা ছাড়াও অনলাইনে যুক্ত হতে না পেরে তাদের সন্তানরা শিক্ষায় আরো পিছিয়ে যাচ্ছে। ফলে বর্তমানে দেশে আর্থসামাজিক বৈষম্য ক্রমবর্ধমান। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে হলে এর রাশ টেনে ধরতেই হবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও সমাজচিন্তক।