পদ্মার ওপর ১২ ও ১৩ নম্বর পিলারে শেষ স্প্যানটি বসার মাধ্যমে স্বপ্ন স্পর্শ করে বাংলাদেশ। মাওয়া ও জাজিরা প্রান্ত এক সুতোয় গেঁথে দৃষ্টিসীমায় পূর্ণরূপে ভেসে ওঠে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার পদ্মা সেতুর মূল অবকাঠামো। চ্যালেঞ্জ জয়ের অদম্য স্পৃহাই যে হাতের মুঠোয় সাফল্য এনে দিয়েছে, তারই প্রমাণ মিলল। তবে এজন্য বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আসতে হয়েছে। বিশ্ব দেখল নিজস্ব অর্থায়নে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাদের সক্ষমতা।
পদ্মা সেতু যাতে না-হয় তার জন্য কত-না ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। টাকা ছাড় না দিয়েও দুর্নীতির অনুযোগ নিয়ে আসে বিশ্বব্যাংক। ফলে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ ঋণ দিতে অপারগতা প্রকাশ করে এবং এতে করে দেশের সত্ ও নিষ্ঠাবান সরকারি কর্মচারী নীতিনির্ধারকদের বেজ্জতি ও জেলজুলুম পোহাতে হয়। বিশ্বব্যাংকের ‘ইনট্রিগিটি’ প্রতিষ্ঠানকে তাই তত্কালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত যথাযথই ‘রাবিস ও বোগাস’ বলে চিহ্নিত করেন এবং এই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দিয়ে বিশ্বব্যাংকের মর্যাদা রক্ষার সুপারিশ করেন। যখন বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে ঋণ দেবে না ঘোষণা দিল, তখন হাজার হাজার প্রবাসী অঙ্গীকার করে যে, তারাই এই ২ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান দেবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিলেন যে, নিজেদের পয়সায় পদ্মা সেতু করবেন, তখন মানুষের উত্সাহ ও দেশপ্রেম এক কণ্ঠে আওয়াজ তুলল—‘আমরা বিজয়ের জাতি, আমরা নিজের পয়সায় তা করব, আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না।’
নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশ মিশনের গাড়িচালক নজরুল ইসলাম তার জীবনের সব সঞ্চয় পদ্মা সেতুর জন্য দান করার অঙ্গীকার করেন। আমরা বিশ্বাস করি, মহান আল্লাহ পাক যা করেন তা মঙ্গলের জন্যই। বিশ্বব্যাংক যখন ঋণ দিতে অস্বীকার করল, তখন বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে আমি জাপানকে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিতে অনুরোধ করলে তারা রাজি হয়, তবে পদ্মা সেতুতে নয়। তারা বলে, জাপান ৪ বিলিয়ন ডলার সহজশর্তে ঋণ দিবে। তবে তা হবে অন্য যে কোনো প্রজেক্টের জন্য। আমরা তাই একাধিক প্রজেক্ট তাদের কাছে তুলে ধরলে জাপান আমাদের প্রস্তাব পছন্দ করে। তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় এলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জাপান সফরের আমন্ত্রণ জানান। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান সফর করেন এবং জাপানে গিয়ে দেন দরবার করে জাপান থেকে ৬ বিলিয়ন ডলার ঋণ সংগ্রহ করতে সফল হন। পরে বাংলাদেশের আমন্ত্রণে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ঢাকা সফর করেন এবং তখন বাংলাদেশ জাপানকে জাতিসংঘের সিকিউরিটি কাউন্সিলে অস্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচনে সাপোর্ট দেবে বলে অঙ্গীকার করেন। আজকে বাংলাদেশের জন্য একক দেশ হিসেবে জাপান সবচেয়ে বড় ঋণদাতা। যদি বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে ঋণ দেওয়া বন্ধ না করত তাহলে হয়তো এই সুযোগ সৃষ্টি হতো না।
বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বাড়ছে দেশের অর্থনীতির সক্ষমতা। এক সময়ের বৈদেশিক সহায়তা নির্ভর অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ আজ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বড় বড় সব উন্নয়ন প্রজেক্ট দেশে বাস্তবায়ন হচ্ছে নিজস্ব অর্থায়নে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ কর্তৃক সর্বশেষ হালনাগাদকৃত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, দেশের বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কমে আসছে ধীরে ধীরে। সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার কর্তৃক গৃহীত কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য বৈদেশিক উত্স হতে সহায়তা সংগ্রহ, ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের কাজ করে। বৈদেশিক উত্স হতে প্রাপ্ত সহায়তা বাজেট ঘাটতি মোকাবিলার পাশাপাশি ব্যালেন্স অব পেমেন্ট ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে। এর মাধ্যমে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা ও সমন্বয়ে কাজ করে এই প্রতিষ্ঠান।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সর্বশেষ হালনাগাদকৃত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সময়ের পরিক্রমায় প্রয়োজনীয়তার নিরিখে বৈদেশিক সহায়তার ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। দেশ বর্তমানে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করায় আর বৈদেশিক খাদ্য সহায়তার প্রয়োজন হয় না। দেশের প্রয়োজনীয় খাদ্য আজ দেশেই উত্পাদিত হয়। দুর্যোগকালীন ব্যবস্থাপনার জন্যও পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ দেশে রয়েছে। দেশের মোট জাতীয় আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে বৈদেশিক অনুদানের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী দেশ/সংস্থা থেকে মূলত খাদ্য সহায়তা, পণ্য সহায়তা এবং প্রকল্প সহায়তা পেয়েছে। অর্থবছর ১৯৭৩-এ প্রাপ্ত বৈদেশিক সহায়তার ৮৫ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল খাদ্য ও পণ্য সহায়তা এবং ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল প্রকল্প সহায়তা। মোট সহায়তার ৮৮ দশমিক ২ শতাংশই ছিল অনুদান এবং ১১ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল ঋণ সহায়তা। বর্তমানে সেই অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। দেশের অর্থনীতির সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনুদান সহায়তার পরিবর্তে বেড়েছে ঋণ সহায়তার পরিমাণ। ২০২০ অর্থবছরে প্রাপ্ত মোট বৈদেশিক সহায়তার মধ্যে প্রকল্প সহায়তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এ সময়ে প্রাপ্ত মোট সহায়তার ৯৬ দশমিক ১৩ শতাংশই পাওয়া গেছে ঋণ সহায়তা হিসেবে। ১৯৭২ সাল থেকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ধারাবাহিকভাবে এদেশের বৈদেশিক অনুদান গ্রহণের মাত্রা কমছে এবং বাড়ছে ঋণগ্রহণের পরিমাণ। অনুদান নির্ভরতা কমিয়ে ঋণ নির্ভরতা বাংলাদেশের অর্থনীতির সক্ষমতারই পরিচায়ক।
প্রেক্ষিত পরিকল্পনা, পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মাধ্যমে ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে অধিক সংখ্যক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড গ্রহণের ফলে এডিপির (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) আকার যেমন বাড়ছে, তেমনি এডিপিভুক্ত প্রকল্পে বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলের নিকট থেকে উন্নয়ন সহায়তা হিসেবে ঋণগ্রহণ করছে বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র, মেট্রোরেল, মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রমের মতো মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এ সব প্রকল্পের জন্য বৈদেশিক সহায়তার প্রয়োজন পড়ছে। ২০১০ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের নিকট থেকে কমিটমেন্টের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৯৮৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যার পরিমাণ ২০২০ অর্থবছরে ৩ গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৭২৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
এক সময়ের ছোট্ট অর্থনীতির দেশটি আজ আর ছোট নেই। আকারে প্রসারে বিশ্বের অনেক দেশকেই টেক্কা দিয়ে পেছনে ফেলে দিয়েছে বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পরাজিত করেছে যে পাকিস্তানকে, অর্থনৈতিক শক্তিতে বাংলাদেশ তাদের অনেক আগেই পেছনে ফেলে দিয়েছে। এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আবির্ভূত হয়েছে বর্তমানে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে পূর্বের যে কোনো সময়ের তুলনায়। বৃদ্ধি পেয়েছে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা। জিডিপি, মাথাপিছু আয়, রাজস্ব আহরণের পরিমাণ এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও বৃদ্ধি পেয়েছে বহুলাংশে। ২০১০ অর্থবছরে বিভিন্ন উত্স থেকে মোট ১ হাজার ৫৮৮ দশমিক ৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ ছাড় হয়েছে এবং এর বিপরীতে ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে ৮৭৫ দশমিক ৫৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২০ অর্থবছরে চার গুণের বেশি অর্থ ছাড় হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার ১২১ দশমিক ১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর বিপরীতে ঋণ পরিশোধ হয়েছে পূর্বের তুলনায় দুই গুণের বেশি, যার পরিমাণ ১ হাজার ৭৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমানে ঋণ পরিশোধে সক্ষমতা থাকায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের জন্য ঋণগ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছে। তবে দেশের জিডিপির আকার বৃদ্ধি পাওয়ায় ঋণের স্থিতি জিডিপির শতাংশে ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। যা নিঃসন্দেহে অর্থনীতির জন্য একটি সুখকর দিক।
জাতির পিতার কন্যা এদেশের সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে তড়তড় করে এগিয়ে চলছে। এক সময়ে প্রবল খাদ্যসংকটে ভুগতে থাকা দেশ আজ নিজেই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এখন আর দেশের মানুষের মুখে আহার তুলে দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বৈদেশিক উত্স থেকে খাদ্য সহায়তা ও পণ্য সহায়তা ছিল মোট সহায়তার যথাক্রমে ৩৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং ৫২ দশমিক ৪ শতাংশ। বর্তমানে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ফলে এখন আর এ সহায়তার প্রয়োজন হচ্ছে না। বর্তমানে বিভিন্ন উত্স হতে প্রাপ্ত বৈদেশিক সহায়তার পুরোটাই প্রকল্প সহায়তা বাবদ প্রাপ্ত। এটিও দেশের অর্থনীতির সক্ষমতার পরিচায়ক।
দেশের অর্থনীতির এ অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার বেড়েই চলেছে প্রতিনিয়ত। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতাও হ্রাস পাচ্ছে ক্রমান্বয়ে। অন্যদিকে এডিপির আকার ও গৃহীত প্রকল্পের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এডিপির এ বর্ধিত আকার ও প্রকল্পের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈদেশিক ঋণের প্রয়োজনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও এডিপির শতাংশে ঋণের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। তার মানে হলো এডিপিতে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে গৃহীত প্রকল্পের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৮৯-৯০ সালে এডিপিতে বৈদেশিক সহায়তার শতকরা হার ছিল ৬৩ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১৮-১৯ সালে এডিপিতে বৈদেশিক সহায়তার হার কমে নেমে এসেছে ২৯ দশমিক ২৫ শতাংশে। চলতি বছরের ৩০ জুন তারিখে বৈদেশিক ঋণের স্থিতির পরিমাণ ছিল ৪৪ হাজার ২৩ দশমিক ৯৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যার ৯৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ ঋণ প্রাপ্ত হয়েছে ছয়টি প্রধান উন্নয়ন সহযোগী থেকে। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক থেকে প্রাপ্ত ঋণ স্থিতির পরিমাণ ১৬ হাজার ৫৯৮ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা মোট ঋণ স্থিতির ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ, এডিবি থেকে প্রাপ্ত ঋণ স্থিতির পরিমাণ ১০ হাজার ৭৬৯ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ঋণ স্থিতির ২৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। জাপান থেকে প্রাপ্ত ঋণ স্থিতির পরিমাণ ৭ হাজার ৫২২ দশমিক ১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ঋণ স্থিতির ১৭ দশমিক ০৯ শতাংশ। চীন থেকে প্রাপ্ত ঋণ স্থিতির পরিমাণ ২ হাজার ৯৯৮ দশমিক ৬৯ (৬ দশমিক ৮ শতাংশ) মিলিয়ন মার্কিন ডলার, রাশিয়া থেকে প্রাপ্ত ২ হাজার ৭০২ দশমিক ৮ (৬ দশমিক ১৩ শতাংশ) মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ভারত থেকে প্রাপ্ত ৫৯৮.২৭ (১ দশমিক ৩ শতাংশ) মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং অন্যান্য উত্স থেকে প্রাপ্ত ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ৮৩৪ দশমিক ৪১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। মোট ঋণের স্থিতির শতাংশ হতে দেখা যায় যে, কোনো দেশ বা সংস্থার নিকট বাংলাদেশ ঋণের ঝুঁকিতে নেই। সাধারণত বৈদেশিক ঋণের স্থিতির পরিমাণ জিডিপির ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ঝুঁকিমুক্ত। ২০২০ অর্থবছর শেষে এই সূচকের অবস্থান জিডিপির মাত্র ১৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ, অর্থাত্ জিডিপির আকার অনুসারে আরো ২৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ বৈদেশিক ঋণগ্রহণ করলেও কোনো ঝুঁকি থাকবে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে বর্তমান সরকার সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ সংগ্রহের বিচক্ষণ নীতি অনুসরণ করায় তা সম্ভব হয়েছে।
বৈদেশিক বিভিন্ন উত্স হতে প্রাপ্ত ঋণগ্রহণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিচক্ষণ নীতি অনুসরণ করে সামনের দিকে এগোচ্ছে বর্তমান সরকার। শেখ হাসিনা সরকারের সময় বাংলাদেশের সংবিধানে ঋণ পরিশোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করে একে দায়যুক্ত ব্যয় হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। বৈদেশিক উত্স হতে সরকারের গৃহীত ঋণসমূহ প্রধানত দীর্ঘমেয়াদী এবং অতি নমনীয় প্রকৃতির। অর্থবছর ২০২০ পর্যন্ত সংগৃহীত বৈদেশিক ঋণের গড় সুদের হার ১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গড় পরিশোধ সময় ২২ বছর। বাংলাদেশ ২০১৫ সালে মধ্যম আয়ের কাতারে উন্নীত হওয়ায় বৈদেশিক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি এবং পরিশোধের সময় হ্রাস পাওয়ায় পূর্বের তুলনায় ঋণগ্রহণের খরচ (কস্ট অব বরোয়িং) বাড়ছে। তবে গৃহীত ঋণের টাকা প্রাধিকারভুক্ত উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করার বিচক্ষণ নীতি মেনে চলার কারণে ঋণের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দায়িত্বশীল ঋণ গ্রহীতা হিসেবে বাংলাদেশের সুনাম রয়েছে। বাংলাদেশ কখনোই বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়নি। বৈদেশিক সহায়তা সংগ্রহের ক্ষেত্রে অনুদান এবং নমনীয় ঋণগ্রহণের নীতি অবলম্বনের পাশাপাশি রাজস্ব আয়ে সক্ষম গুরুত্বপূর্ণ বৃহত্ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী অনমনীয় ঋণও সংগ্রহ করা হচ্ছে। ঋণ প্রস্তাব পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য মাননীয় অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত ‘স্ট্যান্ডিং কমিটি অন নন-কনসেশনাল লোন’ কাজ করছে। এ কমিটি প্রায় ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সর্বমোট ৫৪টি অনমনীয় ঋণ চুক্তি অনুমোদন করেছে। বিমান ক্রয়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন বিদ্যুত্ কেন্দ্র ও বিদ্যুত্ সরবরাহ ব্যবস্থা নির্মাণ, স্যাটেলাইট উেক্ষপণ, সার কারখানা স্থাপন, রেললাইন নির্মাণ, প্রভৃতি বৃহত্ অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য এ সব ঋণ সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, যাতে টাকা অযথা খরচ না হয়, যেমন রূপপুর প্রকল্পে বালিশ কাহিনী, লাখ টাকায় সুপারির গাছ ক্রয়, পুকুর খনন, ঘাস রোপণ বা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খাবার কীভাবে দেওয়া হয়; তার জন্য বিভিন্ন দেশে প্রশিক্ষণের নামে বিদেশভ্রমণ ইত্যাদি অহেতুক খরচ অবশ্যই বাদ দিতে হবে। রাস্তাঘাটের উন্নয়নে সরকার যে টাকা দিচ্ছে তা যথাযথভাবে ব্যবহূত হচ্ছে কি না জনগণকে সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে বৈকি।
বর্তমান বিশ্ব করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) এর প্রাদুর্ভাবের কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন উন্নত দেশের অর্থনীতিও করোনা মোকাবিলায় রীতিমত হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায়ও বাংলাদেশে বেশ সক্ষমতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উত্স হতে প্রাপ্ত সহায়তায় করোনা মহামারি মোকাবিলায় বেশ বড়সড় ফান্ড গঠন করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ও জাপান সরকার ২ দশমিক ০৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার তাত্ক্ষণিকভাবে বাজেট সহায়তা হিসেবে প্রদান করেছে, যা এরই মধ্যে ছাড় করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে তিনটি প্রকল্পে ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রকল্প সহায়তা পাওয়া গেছে। এছাড়াও চলতি ও আগামী অর্থবছরে কোভিড-১৯-এর প্রভাব মোকাবিলায় গৃহীত ‘ইকোনমিক রিকভারি ফাইনান্সিং প্ল্যান’ অনুযায়ী বাজেট সাপোর্ট এবং কোভিড সংশ্লিষ্ট প্রকল্প সহায়তা হিসেবে আরো ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কোভিড ভ্যাকসিনের জন্য ঋণ সহায়তা সংগ্রহের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে হলে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনতি অভিঘাতগুলো মোকাবিলার সক্ষমতা অর্জন করা জরুরি। বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত মোকাবিলায় জলবায়ু অর্থায়ন সংগ্রহ করে আসছে। এখন পর্যন্ত গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) থেকে পাঁচটি প্রকল্পের অনুকূলে ৩৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা পাওয়া গেছে। ‘গ্লোবাল ইনভাইরনমেন্ট ফ্যাসিলিটি’ (জিইএফ) থেকে ছয়টি প্রকল্পের অনুকূলে বৈদেশিক সহায়তা পাওয়া গেছে ১১৪ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ সব সহায়তা ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উত্স হতে প্রাপ্ত বৈদেশিক ঋণ বাংলাদেশকে একটি শক্ত অর্থনৈতিক অবস্থান তৈরিতে জোরাল ভূমিকা রাখছে। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে নাম লেখানোর যে স্বপ্ন নিয়ে দেশ পরিচালনা করছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা, সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে চলছে দেশ।
শেখ হাসিনা সরকারের আমলেই ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ হতে উত্তরণের জন্য সুপারিশ করেছে। আগামী ফেব্রুয়ারি ২০২১ সালে জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ লাভ করলে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হতে বের হয়ে আসবে। যা হবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পক্ষে একটি বিরাট অর্জন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিশন ২০২১-এর সফল বাস্তবায়ন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত যে সোনার বাংলা বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখতেন, তারই কন্যা শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় সেই স্বপ্ন পূরণের দ্বারপ্রান্তে আজ বাংলাদেশ।
লেখক : পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।