মত্স্য খাতে অর্জিত সাফল্য ও টেকসই উন্নয়ন

 

মাছ বাঙালি জাতির সংস্কৃতি ও কৃষ্টির অংশ। দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর পুষ্টি চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্যবিমোচন ও রপ্তানি আয়ে মত্স্য খাতের অবদান আজ সর্বজন স্বীকৃত। মোট দেশজ উত্পাদন বা জিডিপিতে মত্স্য খাতের অবদান ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে মাছ থেকে। দেশের প্রায় ১৪ লাখ নারীসহ মোট জনসংখ্যার ১২ শতাংশেরও বেশি অর্থাত্ প্রায় ২ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মত্স্য খাতের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করছে। দেশের মানুষ গড়ে জনপ্রতি প্রতিদিন ৬০ গ্রাম চাহিদার বিপরীতে ৬২ দশমিক ৫৮ গ্রাম মাছ বর্তমানে গ্রহণ করছে।

মত্স্য উত্পাদনে বাংলাদেশের সাফল্য আজ বিশ্ব পরিমণ্ডলে স্বীকৃত ও সমাদৃত। গত ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে দেশে উত্পাদিত মোট মাছের পরিমাণ ৪৩ দশমিক ৮৪ লাখ টন যা ২০০৮-০৯ সালের মোট উত্পাদনের চেয়ে ৬২ দশমিক ৩১ শতাংশের বেশি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যমতে (২০২০) মিঠাপানির মাছের উত্পাদন বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উত্পাদনে বিশ্বে তৃতীয় এবং বদ্ধ জলাশয়ে চাষকৃত মাছ উত্পাদনে পঞ্চম। ইলিশ উত্পাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে প্রথম ও তেলাপিয়া উত্পাদনে চতুর্থ। দেশ এখন মাছে শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণই নয়, উদ্বৃত্তও বটে। এ অর্জন জাতির জন্য গৌরব এবং অহংকারের।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে গণভবন লেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাছের পোনা অবমুক্ত করে মত্স্য চাষকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার শুভ সূচনা করেছিলেন। তত্কালীন সময়ে বঙ্গবন্ধু ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন—‘মাছ হবে এদেশের দ্বিতীয় প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী সম্পদ’। জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে মত্স্যবান্ধব বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণের ফলে বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন আজ সফল হয়েছে। দেশ মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ায় গ্রামের সাধারণ মানুষ স্বল্পমূল্যে মাছ ও পুষ্টি পাচ্ছে। গত এক দশকে মত্স্য খাতে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ। মত্স্য উত্পাদনের ক্ষেত্রে বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৪১ সালে দেশে মাছের উত্পাদন দাঁড়াবে ৯০ লাখ টন।

আমাদের জলাশয়ে প্রায় ৮০০ প্রজাতির মাছ ও চিংড়ি রয়েছে। এরমধ্যে ২৬০ প্রজাতির মিঠাপানির মাছ এবং ৪৭৫ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ। মিঠাপানির মাছের মধ্যে ১২টি বিদেশি প্রজাতি। আমাদের খাদ্য তালিকায় পুঁটি, মলা, শিং, মাগুর, কই, ট্যাংরা, পাবদা, গুলশাসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ প্রাণিজ পুষ্টির প্রধান উত্স; কিন্তু অতি আহরণ এবং জলজ পরিবেশ বিপর্যয়সহ নানাবিধ কারণে আমাদের অনেক প্রজাতির মাছ আজ বিলুপ্তপ্রায়। আইইউসিএন (২০১৫)-এর তথ্য মতে আমাদের দেশে ২৬০ প্রজাতির মিঠাপানির মাছের মধ্যে ৬৪ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তপ্রায়। আমাদের ঐতিহ্যের অংশ মিঠাপানির এসব সুস্বাদু মাছকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষার্থে বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট গবেষণা পরিচালনা করে এ যাবত্ ২৪টি বিপন্ন প্রজাতির মাছের পোনা উত্পাদন ও চাষাবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে। প্রজাতিসমূহ হচ্ছে : ট্যাংরা, পাবদা, গুলশা, মেনি, ফলুই, খলিশা, গুতুম, বালাচাটা, দেশি সরপুঁটি, জাতপুঁটি, কই, শিং, মাগুর, গজার, গুঁজি আইড়, বাটা, ভাগনা, বৈরালি, গনিয়া, আঙ্গুস, কালিবাউস, মহাশোল, চিতল ও কুচিয়া। এসব প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণের ফলে বিলুপ্তপ্রায় মাছের প্রাপ্যতা সাম্প্রতিকালে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ক্রয়মূল্যও সাধারণ ভোক্তার নাগালের মধ্যে আছে। বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট বর্তমানে কাকিলা, কাজলি, বাতাসি, রানী, ঢেলা, ইত্যাদি আরো ১০ প্রজাতির দেশীয় মাছের প্রজনন ও চাষাবাদ নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করছে। এসব মাছও অদূর ভবিষ্যতে চাষের আওতায় আনা সম্ভব হবে। অপরদিকে, দেশে প্রথমবারের মতো ময়মনসিংহে বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ‘দেশীয় মাছের লাইভ জীন ব্যাংক’। মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম গত ৫ সেপ্টেম্বর এই জীন ব্যাংক উদ্বোধন করেন। লাইভ জীন ব্যাংকে ইতিমধ্যে ৮৫ প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় মাছ সংরক্ষণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব দেশীয় মাছ এখানে সংরক্ষণ করা হবে। দেশীয় মাছ প্রকৃতিতে কোনো কারণে হারিয়ে গেলে বা বিলুপ্ত হলে এ জীন ব্যাংক থেকে তা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। দেশীয় মাছ সুরক্ষায় এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। দেশীয় মাছ সুরক্ষা এবং গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট কেআইবি কৃষি পদক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক সম্মাননা পদকসহ একুশে পদক ২০২০ অর্জন করেছে। নদনদী ও হাওর বিলে দেশীয় মাছের পোনা অবমুক্ত ও অভয়াশ্রম (৪২৬টি) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেও বিপন্ন প্রজাতির মাছ সুরক্ষায় মত্স্য অধিদপ্তর কাজ করছে।

আমাদের মাছের মোট উত্পাদনের ১৬ শতাংশ (৬ দশমিক ৫৯ লাখ টন) সামুদ্রিক মাছের অবদান। সমুদ্রের বিশাল জলরাশি থেকে এই উত্পাদন তুলনামূলকভাবে কম। সামুদ্রিক মত্স্যসম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব এর অন্যতম কারণ। বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী ও প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সমুদ্রে স্থায়ীত্বশীল মত্স্য আহরণের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। সামুদ্রিক মত্স্যসম্পদের মজুত ও বিস্তৃতি নির্ণয় এবং সর্বোচ্চ সহনশীল আহরণমাত্রা নির্ধারণের লক্ষ্যে ‘আরভি মীন সন্ধানী’ নামে একটি গবেষণা ও জরিপ জাহাজ কর্তৃক বঙ্গোপসাগরে এ যাবত্ ২৫টি সার্ভে ক্রুজ পরিচালনা করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে, ২০১৮ সালে এফএও-এর সহায়তায় ‘ড. ফ্রিজ অব ন্যানসেন’ নামে একটি অত্যাধুনিক জাহাজ কর্তৃক বাংলাদেশের সমুদ্রসীমানায় অ্যাকুস্টিক জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। এর ওপর ভিত্তি করে বর্তমানে আমাদের সমুদ্রসীমানায় মত্স্যসম্পদ উন্নয়নে ব্যবস্থাপনা কৌশল প্রণয়ন করা হচ্ছে। অপরদিকে, সামুদ্রিক মাছের অবাধ প্রজনন, সংরক্ষণ ও উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য ২০১৫ সাল থেকে সমুদ্রে বছরে ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে সমুদ্রে মাছের উত্পাদন বৃদ্ধি পেয়েছে ১২-১৫ শতাংশ। সমুদ্রের মত্স্যসম্পদের মজুত নিরূপণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে মত্স্য অধিদপ্তরের আওতায় ১৮৬৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ’ শীর্ষক একটি মেগা প্রকল্প বর্তমানে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সম্প্রতি গভীর সমুদ্রে টুনা ও সমজাতীয় পেলাজিক মাছ আহরণে একটি পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। অপরদিকে, ২০১৯ সালে হাতিয়া উপজেলাধীন নিঝুম দ্বীপসংলগ্ন ৩ হাজার ১৮৮ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা (Marine Protected Area/MPA) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে দেশে মাছের উত্পাদন বৃদ্ধিসহ সামুদ্রিক মাছের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষিত হবে।

ইলিশ উত্পাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে রোল মডেল। বিশ্বে ইলিশ উত্পাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশেই ইলিশ উত্পাদন বেড়েছে; অপর ১০টি দেশে ইলিশ উত্পাদন কমেছে। বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য মতে ১০ বছর আগে দেশের ২১টি উপজেলার নদনদীতে ইলিশ পাওয়া যেত; বর্তমানে ১২৫টি উপজেলার নদনদীতে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণালদ্ধ তথ্যের ভিত্তিতে ইলিশ ব্যবস্থাপনা কৌশল মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে মত্স্য অধিদপ্তর, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রতিরক্ষা বাহিনী কর্তৃক সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করায় সাম্প্রতিককালে দেশে ইলিশের বিস্তৃতি ও উত্পাদন বেড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০৮-২০০৯ সালে দেশে ইলিশের উত্পাদন ছিল ২ লাখ ৯২ হাজার টন যা বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৮-১৯ সালে ৫ লাখ ৩৩ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। অর্থাত্ গত ১২ বছরে ইলিশের উত্পাদন বেড়েছে প্রায় ৮৩ শতাংশ। চলতি বছর গত ১৪ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত ইলিশ মাছের সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুমে ২২ দিন মা-ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান সফলভাবে বাস্তবায়িত হওয়ায় গড়ে শতকরা ৫১ দশমিক ২ শতাংশ মা-ইলিশ সর্ম্পূণভাবে ডিম দিতে সক্ষম হয়েছে যা অতীতের সব রেকর্ডকে অতিক্রম করেছে। গত ২০১৬ সালে ইলিশ বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ইলিশের স্বত্ব এখন শুধুই বাংলাদেশের। এটা জাতির জন্য গৌরবের।

প্রচলিত মত্স্য প্রজাতির পাশাপাশি বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন অপ্রচলিত মত্স্যসম্পদ যেমন কুচিয়া, শামুক, ঝিনুক, কাঁকড়া, সি-উইড, ওয়েস্টার ইত্যাদি সংরক্ষণ ও চাষাবাদ কৌশল উন্নয়নে বর্তমান সরকার বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। আমাদের খাদ্য তালিকায় এসব অপ্রচলিত প্রজাতি না থাকলেও বিদেশে এদের প্রচুর চাহিদা ও বাজার মূল্য রয়েছে। এসব পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেছেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে কুচিয়া, কাঁকড়া, শামুক ও ঝিনুক সংরক্ষণ ও উন্নয়নে মত্স্য অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট কাজ করছে। ইনস্টিটিউট থেকে ইতিমধ্যে কুচিয়ার প্রজনন ও চাষাবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। উদ্ভাবিত প্রযুক্তি নিয়ে ইনস্টিটিউট হতে বগুড়া, পটুয়াখালী, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান এবং খাগড়াছড়ি জেলায় কুচিয়ার মাঠ গবেষণা পরিচালনা করা হচ্ছে। তাছাড়া, শীলা কাঁকড়ার পোনা উত্পাদনে ইনস্টিটিউটে সম্প্রতি সফলতা অর্জিত হয়েছে। ফলে কাঁকড়া চাষে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। গবেষণার মাধ্যমে ইনস্টিটিউটের কক্সবাজারে সামুদ্রিক মত্স্য ও প্রযুক্তিকেন্দ্র থেকে পুষ্টিমানসমৃদ্ধ ও বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন সি-উইডের প্রজাতি শনাক্তকরণসহ চাষপ্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। গবেষণায় কক্সবাজার উপকূলে এ পর্যন্ত ১৩৮ প্রজাতির সি-উইডের সন্ধান পাওয়া গেছে; এরমধ্যে ১৮ প্রজাতির সি-উইড বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন। অতঃপর, বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন তিন প্রজাতির (Sargassum oligocystum, Caularpa racemosa ও Hypnea spp.) সি-উইডের চাষপ্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। উদ্ভাবিত সি-উইড চাষপ্রযুক্তি সম্প্রসারণের জন্য ইতিমধ্যে মত্স্য অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সি-উইড অদূর ভবিষ্যতে একটি অন্যতম রপ্তানিপণ্য হিসেবে সুনীল অর্থনীতিতে অবদান রাখবে বলে আশা করা যায়। উল্লেখ্য, সি-উইডের বায়োঅ্যাকটিভ উপাদান দেশের খাদ্য ও ওষুধশিল্পে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যাবে। তাছাড়া, ইনস্টিটিউট থেকে উপকূলীয় অঞ্চলের নোনা ট্যাংরা ও পারশে মাছের প্রজনন ও চাষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়েছে। বর্তমানে ভেটকি, চিত্রা ও দাতিনা মাছ  এবং হরিণা ও চাকা চিংড়ির প্রজনন ও চাষাবাদের ওপর গবেষণা পরিচালনা করা হচ্ছে। বাগদা চিংড়ির উত্পাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশে এসপিএফ পোনা উত্পাদন জোরদার করা হয়েছে। চাষিদের উত্তম চাষ ব্যবস্থাপনার আওতায় চিংড়ির ক্লাস্টার ফার্মিংয়ের ওপর প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে।

দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর পুষ্টি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে মাছের উত্পাদন বৃদ্ধির বর্তমান ধারা আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে। শুধু পুকুরে চাষকৃত মাছ দিয়ে আগামী দিনের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর মাছের চাহিদা মেটানো ও উত্পাদন বৃদ্ধি করা দুরূহ হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ৩৯ লাখ হেক্টরের অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয় যেমন—নদনদী, প্লাবনভূমি, হাওর-বাঁওড় ও বিলকে বিজ্ঞানভিত্তিক চাষব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। অনুরূপভাবে ৬৮ হাজার ৮০০ হেক্টরবিশিষ্ট কাপ্তাই হ্রদে বর্তমানে মাছের উত্পাদন ১৫৪ কেজি/হেক্টর। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়কে বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে এসব জলাশয় থেকে মাছের উত্পাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করা সম্ভব। এ লক্ষ্যে বর্তমান সরকার হাওরের মত্স্যসম্পদ উন্নয়নে ইতিমধ্যে নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। মত্স্য অধিদপ্তরের আওতায় হাওরের মত্স্যসম্পদ উন্নয়নে সম্প্রতি একটি উন্নয়ন প্রকল্প একনেক কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে।

প্রকৃত মত্স্যজীবী/জেলেদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। এ লক্ষ্যে মত্স্য অধিদপ্তর কর্তৃক ইতিমধ্যে ১৬ লাখ ২০ হাজার মত্স্যজীবী/জেলের নিবন্ধন সম্পন্ন করা হয়েছে এবং ১৪ লাখ ২০ হাজার জেলের মধ্যে পরিচয়পত্র বিতরণ করা হয়েছে। জেলেদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের তরফ থেকে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় জাটকা আহরণ নিষিদ্ধকালীন সময়ের চার মাস (ফেব্রুয়ারি-মে) দেশের ২০টি জেলার ৯৬টি উপজেলার ৩ লাখ ১ হাজার পরিবারকে মত্স্য অধিদপ্তর কর্তৃক মাসিক ৪০ কেজি হারে চাল প্রদান করা হয়েছে। এ বছর ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধকালীন ভিজিএফ সহায়তার আওতায় দেশের মোট ৩৬টি জেলার ১৫২ উপজেলার ৫ লাখ ২৮ হাজার ৩৪২টি পরিবারকে ২০ কেজি হারে মোট ১০ হাজার ৫৬৬ দশমিক ৮৪ টন চাল প্রদান করা হয়েছে। তাছাড়া, করোনাকালীন সময়ে চাষিদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্রদান করা হচ্ছে।

মাছের উত্পাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার লক্ষ্যে নিরাপদ মত্স্য উত্পাদান অপরিহার্য। চিংড়ি এবং মত্স্য ও মত্স্যপণ্য বাংলাদেশের রপ্তানির অন্যতম প্রধান খাত। বাংলাদেশ বর্তমানে ৫০টি দেশে এসব পণ্য রপ্তানি করছে। বৈশ্বিক আর্থিক মন্দা থাকা সত্ত্বেও ২০১৯-২০ অর্থ বছরের প্রায় ৭১ হাজার টন মত্স্য ও মত্স্যজাত পণ্য রপ্তানি করে দেশে ৩ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে। মানসম্মত মত্স্য ও মত্স্যপণ্য রপ্তানির জন্য মত্স্য অধিদপ্তরের আওতায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় আন্তর্জাতিক মানের তিনটি মাননিয়ন্ত্রণ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ফলে মত্স্য ও মত্স্য জাতীয় পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে, মাছের আহরণোত্তর ক্ষতি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। গবেষণায় দেখা গেছে যে, সঠিক পরিচর্যা ও বাজারজাতকরণের অভাবে এখনো দেশে আহরণকৃত মাছের শতকরা ১২-১৯ শতাংশ পচা অবস্থায় ভোক্তার হাতে পৌঁছে। পচা মাছ রান্না করে খেলে ৩০-৪০ শতাংশ পুষ্টি কম পাওয়া যায়। তাছাড়া, দৈনন্দিন জীবনে মানুষের ব্যস্ততা বাড়ায় এবং নারী কর্মজীবীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় সরাসরি খাবার উপযোগী কিংবা স্বল্প পরিশ্রমে খাবার উপযোগী মানসম্মত মূল্যসংযোজিত মত্স্যপণ্য উত্পাদন এখন সময়ের দাবি। অপরদিকে, চাষিরা সাম্প্রতিককালে প্রায়শই বলেন, তারা মাছের ভালো মূল্য পাচ্ছেন না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে ও আমাদের মাছ থেকে মূল্যসংযোজিত পণ্য (Value added product) তৈরি করতে হবে। এতে চাষিরা আর্থিকভাবে অধিক লাভবান হবেন। স্বল্পমূল্যের পাঙাশ ও তেলাপিয়া এবং ইলিশ মাছকে মূল্য সংযোজিত করে দেশে ব্যবহারের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি করা যেতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এলক্ষ্যে কাজ করছে। মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম এমপি মত্স্য খাতে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরির নির্দেশনা প্রদান করছেন।

মাছের উত্পাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আমাদের যেমন আত্মতৃপ্তির সুযোগ আছে, ঠিক তেমনি আমাদের সামনে রয়েছে বড় কয়েকটি চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন ও মাছের আবাসস্থলের অবক্ষয়। তাছাড়া, দেশে মাছের চাষাবাদ বৃদ্ধি পাওয়ায় আমাদের আরেকটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে চাষাবাদে মানসম্পন্ন উন্নত জাতের মাছের পোনা এবং স্বল্পমূল্যের মত্স্য খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করা। এজন্য দেশের নয় শতাধিক হ্যাচারিতে ভালো মানের পোনা উত্পাদনের জন্য উন্নত জাতের ব্রুড মাছের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বাঁচাতে হবে আমাদের হালদা নদীকে—যেখানে রুই জাতীয় মাছ প্রাকৃতিকভাবে ডিম ছাড়ে। আনন্দের বিষয় যে, বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে জাতীয় উদ্যাপন কমিটি কর্তৃক হালদা নদীকে ‘বঙ্গবন্ধু মত্স্য হেরিটেজ’ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে হালদা নদী জাতীয়ভাবে বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা পাবে; সুরক্ষিত হবে হালদা নদীর পরিবেশ ও নিষিক্ত ডিম।

 

লেখক :বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক।