‘এ মণিহার আমায় নাহি সাজে—’

আজি হইতে ৬৭ বত্সর পূর্বে দৈনিক ইত্তেফাক তাহার এক অভাবিত যাত্রা শুরু করিয়াছিল তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার হাত ধরিয়া। আজ ৬৮ বত্সরে পা রাখিল ইত্তেফাক। তবে ১৯৫৩ সালের এই দিনে ‘দৈনিক’ হিসাবে আত্মপ্রকাশের পূর্বে ‘সাপ্তাহিক’ হিসাবে ১৯৪৯ সাল হইতেই প্রকাশযাত্রা শুরু করিয়াছিল ইত্তেফাক। উহা ছিল এক অতি বিষম কাল। সাতচল্লিশে দেশভাগের মাধ্যমে নূতন দেশ গঠিত হইলেও মাত্র কয়েক বত্সরেই পূর্ববঙ্গের আশাভঙ্গের মর্মন্তুদ বেদনাকাল শুরু হয়। কিছুদিনের মধ্যেই মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার ছিনাইয়া লইবার ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি প্রত্যাশিত গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার পশ্চিম পাকিস্তানের শোষকদের নিকট একরকম জিম্মি হইয়া যায়। সুতরাং জন্মলগ্নেই ইত্তেফাকের অবস্থা কবি সুকান্তের কবিতার সহিত সম্পূর্ণত মিলিয়া যায়—‘অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি/ জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি।/ অবাক পৃথিবী! আমরা যে পরাধীন।/ অবাক, কী দ্রুত জমে ক্রোধ দিন দিন।’

নিরন্তর বঞ্চনার ক্রোধের স্তূপীকৃত বারুদের কথা বুঝিতে পারে নাই পাকিস্তানি শাসকেরা। তাহারা অনুধাবন করিতে পারে নাই পূর্ব বাংলায় এক অগ্নিপুরুষ রহিয়াছেন—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর তাহার নেপথ্যে রহিয়াছেন একটি অবিচল আদর্শের অকুতোভয় মানব—তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। সুতরাং একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য লইয়াই যাত্রা শুরু করিয়াছিল দৈনিক ইত্তেফাক। এই জন্য ইত্তেফাক হইয়া উঠিয়াছিল পরাধীন পূর্ববঙ্গের গণমানুষের মুখপত্র। বঙ্গবন্ধু ছাড়াও সেই সময় ইত্তেফাকের সহিত ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর অবদানও ছিল অনস্বীকার্য। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং রাজনীতির জন্য ইত্তেফাকের সহিত কর্মী-সহযোগী যাহারাই ছিলেন, তাহাদেরও ছিল একই রাজনৈতিক লক্ষ্য। বলা যায়, অত্যন্ত বৈরী ভাবাপন্ন অত্যাচারী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কোনো অগ্নিচক্ষুকেই ইত্তেফাক ভয় পায় নাই। সকল প্রকার দমন-পীড়ন এবং কারাগারে প্রেরণের মতো ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করিয়াই দৈনিক ইত্তেফাককে এবং ইত্তেফাকের ভাষ্যকে আপামর মানুষের দ্বারে পৌঁছাইয়া দিয়াছিল মানিক মিয়ার আদর্শ ও ক্ষুরধার কলাম। ইহা অত্যন্ত শ্লাঘার বিষয় যে, একটি নিষ্পেষিত দিশাহীন জাতিকে দিকনির্দেশনা দিতে দৈনিক ইত্তেফাক যেই ভূমিকা রাখিয়াছে তাহা শুধু এই দেশেরই নহে, বিশ্বের সংবাদপত্রের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। এই জন্য ইহা বলা অত্যুক্তি হইবে না যে, আকাশের ধ্রুবতারার মতো বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ইত্তেফাকের দ্ব্যর্থহীন ভূমিকা একমেবাদ্বিতীয়ম্। স্বাভাবিকভাবেই এই দেশের অধিকারবঞ্চিত মানুষের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হইবার জন্য চরম মূল্যও দিতে হইয়াছিল ইত্তেফাকের সহিত সংশ্লিষ্ট সকলকে। বিশেষ করিয়া, পত্রিকাটির কান্ডারি মানিক মিয়াকে অপরিসীম যাতনা ভোগ এবং বিপুল ত্যাগ স্বীকার করিতে হইয়াছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় মানিক মিয়া দেখিয়া যাইতে পারেন নাই। তবে দেশের মানুষের হূত্স্পন্দন মানিক মিয়া তাহার লেখনীর মাধ্যমে যেইভাবে ইত্তেফাকে বলিষ্ঠভাবে তুলিয়াছিলেন, তাহার মূল্য অমূল্য।

দেশ স্বাধীন হইয়া এখন সুবর্ণজয়ন্তীর দিকে ধাবিত হইয়াছে। দৈনিক ইত্তেফাকও তাহার প্রতিষ্ঠাতা মানিক মিয়ার অনুপস্থিতিতে নূতন বাস্তবতার জমিনে পা রাখিয়াছে। পরাধীন আমলের রাজনীতি আর স্বাধীনতা-উত্তরকালের রাজনীতি কখনোই এক হইতে পারে না। কথাগুলি ইত্তেফাকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যেই চ্যালেঞ্জকে সম্মুখে রাখিয়া ইত্তেফাক তাহার যাত্রা শুরু করিয়াছিল, সেই চ্যালেঞ্জে ইত্তেফাক জয়ী হইয়াছে। এখন ইত্তেফাক নূতন একটি চ্যালেঞ্জকে শিরোধার্য করিয়াছে। তবে ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার অনন্য নেতৃত্বের শূন্যতা কখনই পূরণ হইবে না। সেই কারণে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলিতেই হয়—মানিক মিয়ার দেওয়া ‘এ মণিহার আমায় নাহি সাজে—’। গত ৬৭ বত্সর ধরিয়া যাহারা ইত্তেফাককে অব্যাহতভাবে সহায়তা, সমর্থন ও প্রেরণা জোগাইয়া চলিয়াছেন, তাহাদের সকলের প্রতি আমরা গভীর কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা জানাই। দেশের মানুষের সহিত ইত্তেফাক তাহার প্রাতিষ্ঠানিক আদর্শের মশাল চিরকাল জাগরূক রাখিবে নিশ্চয়ই।