প্রতিবন্ধীদের প্রতি যিশুর প্রেম

আজ বিশ্বের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষ পরম ভক্তি ও ভালোবাসায় যিশু খ্রিষ্টের জন্মদিন, বড়দিন পালন করছে। অনেক বিষয়ের মধ্যে আজ একটি বিশেষ বিষয়কে কেন্দ্র করে আমার এ ক্ষুদ্র লেখা। বড়দিনের একটি বাণী :প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি যিশুর প্রেমের কাজ ও সেবা। সমাজের মধ্যে সব মানুষের সম্পৃক্ততা ও যথাসাধ্য ও যথাবিহিত অংশগ্রহণকে যিশু অনেক গুরুত্ব দিয়েছেন। বলা বাহুল্য যে, নর-নারী, যিহুদি কি অযিহুদি, ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত কি শিক্ষিত নয়, স্বাভাবিক অবস্থার মানুষ কি প্রতিবন্ধী, জাতি, ধর্ম, গোত্র, বর্ণ, পদমর্যাদাভেদে সব মানুষের জীবনই ছিল তার দৃষ্টিতে মহামূল্যবান। গড়ে পৃথিবীর সব মানুষের দশমাংশ মানুষ নানাবিধ প্রতিবন্ধিতার শিকার। এর কারণ দ্বিবিধ :মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক। ঐতিহাসিক এডোয়ার্ড গিবনের হিসেবে যিশুর সময়ে, অর্থাত্ আজ থেকে ২ হাজার বছর আগে পৃথিবীর লোকসংখ্যা ছিল ২৫ কোটির মতো। আজকের পৃথিবীতে ৭০-৮০ কোটি মানুষ বিভিন্ন প্রকার ও বিভিন্ন মাত্রায় প্রতিবন্ধিতা নিয়ে বাস করছে।

শারীরিক কি মানসিক সব প্রকার প্রতিবন্ধিতার শিকার মানুষের প্রতি সমাজের গতানুগতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণের বিরুদ্ধে যিশু ছিলেন সোচ্চার। যিশুর আশ্চর্য কাজের অনেকগুলোই ছিল বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষকে তাদের প্রতিবন্ধিতা থেকে মুক্ত করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা। সব মানুষের প্রতি ছিল তার অতি দরদি মন, অতুল প্রেম ও সহমর্মিতা। নতুন নিয়মের অন্তর্ভুক্ত চারটি সুসমাচার পুস্তক থেকে আমরা জানতে পারি যে, যিশু যে অনেকগুলো সেবামূলক অলৌকিক কাজ করেছিলেন তার মধ্যে কমপক্ষে সাতটি ছিল ‘বিশ্রাম বার’ (শাব্বাথ) এ করা কাজ। মোশির মাধ্যমে দেওয়া দশ আজ্ঞা অনুসারে যিহুদিদের কাছে ঐদিনটি (সপ্তাহের শেষ দিন, শনিবার) ছিল পবিত্ররূপে পালনীয় বিশেষ দিন। এ ধরনের কাজ ছাড়াও তার করা সব আশ্চর্য কাজই তিনি করেছিলেন তিনটি উদ্দেশে : সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সমাজের উপকারের জন্য, তার মধ্যে যে ঐশ্বরিক শক্তি আছে তা প্রকাশ করা এবং তিনিই যে পুরাতন নিয়মের প্রতিজ্ঞাত মোশিহ বা পরিত্রাতা তার প্রমাণ দেখানো। তদানীন্তন অনেক ধর্মীয় নেতাদের শিক্ষানুসারে ঐদিনে কাজ করা ছিল ধর্মের লঙ্ঘন। তাই ঐদিন যিশুর আরোগ্যদায়ী কাজকেও সেই ধর্মীয় নেতারা ভালো চোখে দেখেনি। কেবল তা-ই নয়; তার কারণে ঐ ধর্মীয় নেতারা যিশুকে হত্যা করার জন্য চক্রান্ত করতেও কুণ্ঠিত হয়নি। তিনি শিক্ষা দিয়েছেন, বিশ্রাম বার তথা ধর্ম মানুষের মঙ্গলের জন্য, মানুষ বিশ্রাম বারের জন্য নয়!

মানুষে মানুষে, ধনী-নির্ধন, সবল-দুর্বল, ক্ষমতাহীন ও ক্ষমতাপন্ন মানুষে ভেদাভেদ দিনে দিনে আকারে-প্রকারে বেড়ে চলছে। আজকে আমাদের সমাজে নারী এবং শিশুদের বিভিন্নভাবে অবহেলা এবং অপমানের শিকার হতে হয়। সে সুসমাচার হচ্ছে প্রত্যেক মানুষের পরিপূর্ণ মর্যাদার অধিকার। ঈশ্বর প্রত্যেক মানুষকে তার প্রতিমূর্তি ও সাদৃশ্যে নির্মাণ করেছেন। যেখানেই মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে মানুষ তার মানবীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে, সেখানেই যিশু খ্রিষ্ট সোচ্চার ছিলেন। খ্রিষ্ট যখন বলেন, ‘তুমি তোমার প্রতিবেশীকে আত্মতুল্য প্রেম করো।’ তার অর্থ—আমরা আমাদের দেশের, সমাজের তথা সব মানুষকেই ভালোবাসব ও সম্মান করব। মানবহিতৈষী এই চিন্তা প্রথমে আমাদের নিজেদের দেশ ও সমাজে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। দুস্থ, নিপীড়িত ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের পক্ষে কথা বলা, কাজ করা সব ধর্মেরই শিক্ষা।

n লেখক :(খ্রিষ্টীয় ঈশতত্ত্বের শিক্ষক, চার্চ পুরোহিত এবং ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’-এর সদস্য)