হাছন রাজার গান

হাছন রাজার (১৮৫৪-১৯২২) গানের দার্শনিকতা নিয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর Indian Philosophical Congress-এর একটি অধিবেশনে সভাপতির অভিভাষণে তিনি এ প্রশংসা করেছিলেন। পরের বছরের জানুয়ারি মাসে ভাষণটি Modern Review পত্রিকায় ‘The Philosophy of Our People’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। এরপর কবিগুরু ১৯৩০ সালে অক্সফোর্ডের ম্যানচেস্টার কলেজে ‘হিবার্ট লেকচারে’ ‘The Religion of Man’ শিরোনামে একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেই বক্তৃতায় তিনি হাছন রাজার গানের দর্শন বিশ্লেষণ করে তাঁকে সুপরিচিত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের হাছন-প্রীতি প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ অমিতাভ চৌধুরী বলেন, ‘[...] রবীন্দ্রনাথ হাসন রাজার গান সম্পর্কে অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। বিশের দশকের গোড়ায় তিনি হাসন রাজা সম্পর্কে পরিচিত হন এবং তাঁর বহু রচনা তিনি পাঠ করেন। [...] একটি কবিতা বা গান সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথকে আলোড়িত করে। সেটি হলো—‘মম আঁখি হইতে পয়দা আসমান জমিন’ [...] এই কবিতাটির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ পরে লেখেন শ্যামলী কাব্যগ্রন্থের ‘আমি’ নামক বিখ্যাত সেই কবিতা—‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ, চুনি উঠল রাঙা হয়ে’। আরও বেশ কিছু কবিতায় হাসন রাজার ভাবের প্রকাশ আছে।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হাছন রাজার যে গানটি পাঠ করে মুগ্ধ হয়ে সেটার অনুসরণে কবিতা পর্যন্ত লিখে ফেলেছিলেন, সেই গানটি প্রসঙ্গে কবিগুরু বলেছিলেন, ‘শাশ্বত পুরুষ তাঁহারই (হাসন রাজা) ভিতর হইতে বাহির হইয়া তাঁহার নয়নপথে আবির্ভূত হইলেন।’

হাছন রাজার এ গান ছাড়াও কয়েকটি গানে অনুপ্রাণিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ বেশ কয়েকটি কবিতা রচনা করেছিলেন। লেখক পান্নালাল রায় গোমতি পত্রিকায় প্রকাশিত ১৪১১ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ-আশ্বিন সংখ্যার মুকুলকুমার ঘোষের প্রবন্ধের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন—

 

হাসন রাজা গেয়েছেন—

আপন চিনিলে দেখ খোদা চিনা যায়,

হাসন রাজা আপন চিনিয়ে এই গান গায়।

আবার রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন—

আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না,

এই জানারই সঙ্গে সঙ্গে তোমায় চেনা।

অনুরূপভাবে রাজার গান রয়েছে—

রূপ দেখিলাম রে নয়নে

আপনার রূপ দেখিলাম রে,

আমার মাঝত বাহির হইয়া দেখা দিল আমারে।

রবীন্দ্রনাথের কবিতাতেও ঘটেছে এই ভাবের প্রকাশ—

আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া

বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।

এইভাবে রবীন্দ্রনাথের কিছু কবিতার সঙ্গে হাসন রাজার দর্শনতত্ত্বের গানের ভাবগত এক সাদৃশ্য লক্ষ করেছেন গবেষকগণ।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই হাছন-প্রীতির কারণেই সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রী গ্রামের হাছন রাজা অতি সহজে বাংলা ভাষাভাষী বোদ্ধা ও গবেষকদের নজরে আসেন—এটা অন্তত একবাক্যে বলা যায়। তবে সিলেট অঞ্চলের মানুষের কাছে তাঁর গানের মাধুর্য ছড়িয়ে পড়েছিল এরও অনেক আগে থেকে। সৈয়দ মুর্তাজা আলী বলেছিলেন, ‘হাসন রাজার গান শুধু সরল পল্লিবাসীদের মোহিত করেনি, রবীন্দ্রনাথ এই অজ্ঞাত পল্লি কবির একটি গান বারানসীতে অনুষ্ঠিত ভারতীয় দর্শন কংগ্রেসের সভাপতির ভাষণে প্রশংসার সহিত উদ্ধৃত করেন। পরে বিলাতে হিবার্ট লেকচারেও এই গানটির উল্লেখ করেন।’

মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন এক লেখায় লিখেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ হাসন রাজাকে জগদ্বিখ্যাত করিয়াছেন। [...] তিনি যেমন লালন শাহকে আবিষ্কার করিয়াছেন এবং প্রচার করিয়াছেন, তেমনি হাসন রাজাকেও করিয়াছেন।’ তবে মনসুরউদ্দীন এও জানিয়েছিলেন, ‘তাঁহার (হাসন রাজা) গান সিলেটী গ্রাম্যগান পর্যায়ভূক্ত হইয়া গিয়াছে; লোকমুখে এবং একতারার সুরে হাটে-মাঠে-ঘাটে সর্বত্র গীত হয়।’

হাছন রাজার গান সম্পর্কে একেক জন একেক কথা বলেছেন। সবারই মন্তব্য, হাছন রাজার গান বাঙালির দর্শনচেতনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাঁর গান আমাদের হূদয়ের গভীরে চিন্তার খোরাক জোগায়, অন্যরকম ভাবনার দ্যোতনা সৃষ্টি করে। হাছনের প্রায় গান পাঠে আমাদের মরমি-ভাবনা উসকে ওঠে। তাঁর গান মনের গভীরে দ্যোতনা তোলে, নিমিষেই মৃত্যুচিন্তা প্রকট হয়ে ওঠে।

 

দুই

গানের তাত্ত্বিকতার মতন হাছন রাজার ব্যক্তি চরিত্রও ছিল আকষর্ণীয়, বহুবর্ণিল। তাঁর কিছু চিত্র আমরা পাই প্রভাতকুমার শর্মার ‘মরমি কবি হাসন রাজা’ শিরোনামের লেখায়। তিনি লিখেছেন, ‘উদারতা হাসন রাজা সাহেবের একটি বিশিষ্ট গুণ ছিল। মল্লিকপুরের জমিদার গোবিন্দবাবুর সঙ্গে জমিদারী লইয়া তাঁহার বিবাদের অন্ত ছিল না। কিন্তু উভয়ের মধ্যে সৌহার্দ্যের অভাব ছিল না। আদালতে মোকদ্দমা হইতেছে, এদিকে দুইজনে বসিয়া খোশগল্প করিতেছেন—এই প্রকার কথা আমরা শুনিয়াছি। উত্তরকালে গোবিন্দবাবুর অবস্থা খারাপ হইয়া পড়িলে তিনি তাঁহাকে সাহায্যও করিয়াছিলেন। মহাভারতে পড়িয়াছি দিনে যুদ্ধ হইত রাত্রে একদল গিয়া অপর দলের নিকট মন্ত্রণা চাহিতেন। এখানেও আমরা সেই জাতীয় একটি জিনিস দেখিতে পাই।’

হাছন রাজার কোড়া পাখি শিকার কিংবা নারীদের প্রতি ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। কিন্তু তাঁর গান নিয়ে কোনো মতবিরোধ কিংবা সমালোচনা নেই বললেই চলে। তাঁর গান আমাদের সত্তাকে নাড়া দেয়, অনুপ্রাণিত করে। জমিদার বংশের চাকচিক্যময় জীবনযাপনের মোহ ত্যাগ করে যেভাবে হাছন রাজা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে জীবনকে উপলব্ধি করেছেন—সেটা নিয়ে স্তুতিবাক্যও তো কম লেখা হয়নি!

হাছন রাজা

[২১ ডিসেম্বর ১৮৫৪—৬ ডিসেম্বর ১৯২২]