ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি বলেছেন, সাংবাদিকতা পেশায় টিকে থাকতে হলে সাহস, মেধা ও চর্চার বিকল্প নেই। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দৈনিক ইত্তেফাক এই তিন চরিত্রের সম্মিলন ঘটায়ে ৬৮ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। দেশে শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকলে সংবাদপত্রও শক্তিশালী হয় না।
তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ভাণ্ডারিয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের ইত্তেফাক কর্মীদের উদ্যোগে আয়োজিত ইত্তেফাকের ৬৮ বছরে পদার্পণ উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আরো বলেন, এই পথপরিক্রমায় ইত্তেফাক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে চলছে। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ইত্তেফাককে একটি রাজনৈতিক দলের মুখপত্র হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। স্বাধীনতার প্রাক্কালে স্বাধিকার, গণতন্ত্র, সামরিক শাসনের বিরোধিতাসহ বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামকে এগিয়ে নিতে গিয়ে অনেকটা রাজনৈতিক অবয়বে আওয়ামী লীগের মুখপত্ররূপেই ইত্তেফাককে পরিচালনা করেছেন। স্বাধীনতা-উত্তরকালে দেশ গঠনে গত চার যুগে এই চরিত্র থেকে ইত্তেফাক বেরিয়ে আসার প্রয়াসে একটি স্বাধীন সংবাদপত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা তথা রূপ পায়। এ সময় স্বাধীন দেশের মানসিকতায় একটি নির্দিষ্ট আদর্শ ও দর্শনকে ভিত্তি করে ইত্তেফাককে পথ চলতে হচ্ছে, যা দেশ-বিদেশে অবস্থানরত বাঙালিদের কাছে সুনাম পেয়েছে। স্বাধীন দেশেও পাকিস্তানি ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের মতো আচরণ ইত্তেফাককে মোকাবিলা করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আজকে ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় দেশের প্রধানমন্ত্রীর ছবি নিয়মিত ছাপা হয় বলে যারা বাঁকা কথা বলতেন, তারাও একই পথ অনুসরণ করেন। প্রধানমন্ত্রীর ছবি ছাপানো মানে দালালি নয়। আমরা ইত্তেফাককে পরিচালনা করতে গিয়ে নানা কৌশল ও শৈলী পত্রিকার পাতায় প্রচলন করেছি। আমরাই দেশে প্রথম রঙিন সংবাদপত্রের পথিকৃত্, ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন করেছি। সাংবাদিক ও কর্মচারীদের বছরে ছয়টি বোনাস দিয়েছি, যার দৃষ্টান্ত বিরল। আয় করে ব্যয় করার ধারা সংবাদপত্রে আমরাই চালু করেছি। অনেকে এখন শূন্য হাতে সংবাদপত্র প্রকাশ করে রাতারাতি বিত্ত-বৈভবের মালিক হন। পশ্চিমা বিশ্বের নামকরা সংবাদপত্রগুলো টিকে রয়েছে ইত্তেফাকের মতো বৈশিষ্ট্যের গুণে।’
দক্ষিণাঞ্চলের ইত্তেফাক কর্মীদের উদ্দেশে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, ‘জীবনে আপদ-বিপদ আসবে এবং তা সততা ও সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। সাংবাদিকতা একটি কঠিন পেশা, যা অনুসরণ করতে গিয়ে বা এলাকার উন্নয়নকাজে দুর্নীতির খবর, মানুষের জীবনের আশা-নিরাশা, সুখ-দুঃখের কথা পত্রিকায় তুলে ধরতে যে সাহসিকতা দেখাতে হয় সেখানে ঝুঁকি থাকবেই। সত্য ও সঠিক সংবাদ লিখলে হুমকিধমকি আসাই স্বাভাবিক। জীবনটাই যুদ্ধ, যুদ্ধই জীবন। আমরা পরাজয় মানিনি, এটাই ইত্তেফাকের চরিত্র। তবে সংবাদপত্র প্রকাশে সত্য ও নিষ্ঠার ক্ষেত্রে আপসহীন ও বিবেকাশ্রয়ী হতে হয়।’
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আরো বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু দেশের স্বাধীনতা এনেছেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মানিক মিয়ার পরিবারের শুধু রাজনৈতিক সম্পর্কই ছিল না; এ পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তি ও বৈশিষ্ট ছিল পারস্পরিক সহযোগিতামূলক, তথা সহমর্মিতার। স্বাধীন বাংলাদেশে ব্যক্তি পর্যায়ের অর্জনের ক্ষেত্রে কারো কারো বিরুদ্ধে বিতর্ক তথা প্রশ্নবিদ্ধতার অভিযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে আমি কিছুটা ভিন্ন মতাশ্রয়ী। পাকিস্তান আমলে আমরা ছিলাম একটি প্রদেশের অধিবাসী। পাটশিল্পজাত অর্থ পাকিস্তানে পাচার হয়ে যেত। এদেশের মানুষ শোষণ-বঞ্চনার শিকার হতো, আজ মানুষ স্বাধীন দেশের নাগরিক। কেউ লুটপাট করুন অথবা বৈধ আয় করুন না কেন, সবই সম্ভব হয়েছে দেশ স্বাধীন বলে। সিঙ্গাপুরে বড় বড় ব্যবসার মালিক বাংলাদেশের অনেকে। কানাডায় বেগমপাড়ার মুখরোচক আলোচনা যা-ই হোক না কেন, এসবই স্বাধীনতার ফল।’
তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান আমলে কেউ জেলে গেলে তাদের রাজবন্দি বলা হতো এবং মুক্তির জন্য রাজপথে আন্দোলন হতো। এখন রাজবন্দি বলতে শোনা যায় না। বলা হয় দুর্নীতি, ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে। স্বাধীনতার আগে ষাটের দশকের রাজনীতির ইতিহাস ছিল গৌরবময়। আমরা দক্ষিণাঞ্চলে গত কয়েক দশকে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় সৃষ্টির প্রয়াস পেয়েছি। এ অঞ্চলে শত শত কিলোমিটার সড়ক নেটওয়ার্ক, বরিশাল-পটুয়াখালী বিদ্যুত্ সঞ্চালন লাইন, বরিশালের ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ স্টেশনসহ মেগা মেগা অবকাঠামো নির্মাণে সক্ষম হয়েছি। এসবই স্বাধীন দেশের অর্জন। এ অর্জনের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।’
ভাণ্ডারিয়ায় আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর বাসভবন ‘তাসমিমা ভিলা’য় আয়োজিত ইত্তেফাকের এ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নাতি রায়ান হোসেন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। ইত্তেফাকের পিরোজপুর অফিস প্রধান মুনিরুজ্জামান নাসিম আলীর সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন বরিশাল অফিস প্রধান শাহীন হাফিজ, বাগেরহাটের মোংলা সংবাদদাতা এইচ এম দুলাল, ঝালকাঠির কাঠালিয়া সংবাদদাতা মো. আব্দুল হালিম, বরগুনার বেতাগীর সংবাদদাতা মো. মিজানুর রহমান মজনু ও পিরোজপুরের ইন্দুরকানী সংবাদদাতা আহাদুল ইসলাম শিমুল। দক্ষিণাঞ্চলের ইত্তেফাক কর্মীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে অংশ নেন জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের মধ্যে মো. শফিউল ইসলাম সৈকত (ঝালকাঠি), আক্তারুজ্জামান বাচ্চু (নলছিটি), মো. জামাল উদ্দিন (গৌরনদী), মো. আলমগীর হোসেন সুমন (মুলাদি), রফিকুল ইসলাম (উজিরপুর), এস মিজানুল ইসলাম (বানারীপাড়া), ফারুক লিটু (বরিশাল অফিস), মোহাম্মদ আলহাজ্ব (হিজলা), গোলাম মোস্তফা (বাকেরগঞ্জ), পিরোজপুরের হালিমুর রহমান শাহীন (স্বরূপকাঠি), রবিউল হাসান রবিন (কাউখালী), রফিকুজ্জামান আবীর (মঠবাড়িয়া), শংকর জীত্ সমাদ্দার (ভাণ্ডারিয়া), অনুপ কুমার সিকদার (নাজিরপুর), হাবিবুর রহমান (বামনা), মেহেদী হাসান লিপন (মোরেলগঞ্জ), শেখ মোহাম্মদ আলী (শরণখোলা) এবং কামরুল ইসলাম সোহাগ (দশমিনা)।
এ সময় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য রাখেন ভাণ্ডারিয়া উপজেলা জেপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাহিবুল হোসেন মাহিম, পিরোজপুর জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন মহারাজ এবং ভাণ্ডারিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাজমুল আলম। প্রধান অতিথি আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে অনুষ্ঠানের শুরুতে ইত্তেফাক কর্মীদের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়। অনুষ্ঠানের শেষভাগে অতিথি ও ইত্তেফাক কর্মীদের নিয়ে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কাটেন। স্থানীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ভাণ্ডারিয়ার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেপির উপজেলা সদস্যসচিব আতিকুল ইসলাম তালুকদার উজ্জল, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মৃধা, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আসমা আক্তার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস এম মাকসুদুর রহমান, ধাওয়া ইউপি চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান টুলু, গৌরীপুর ইউপি চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান চৌধুরী প্রমুখ।
কাউখালী সংবাদদাতা রবিউল হাসান রবিন জানান, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি গতকাল বিকালে কাউখালী উপজেলা স্বাস্থ্যসেবা কমিটির সভায় সভাপতির বক্তব্যে বলেন, স্থানীয়দের আগ্রহ না থাকলে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো কিছু পাওয়া যায় না। নিজেদের ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে হলে এলাকাবাসীকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হয়। কাউখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনের নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। স্থানীয় সংসদ সদস্যকে না জানিয়ে চিকিত্সকদের বদলি হয়ে যাওয়া কাম্য নয়। এ ব্যাপারে পর্যায়ক্রমে শূন্যপদ পূরণ করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
এ সময় স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান, সহকারী কমিশনার (ভূমি) জান্নাত আরা তিথি, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম, ইউপি চেয়ারম্যান (কাউখালী) আমিনুর রশীদ মিল্টন, ইউপি চেয়ারম্যান (চিড়াপাড়া) মাহামুদ খান খোকন, ইউপি চেয়ারম্যান (সয়না-রঘুনাথপুর) এলিজা সাঈদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া আরো উপস্থিত ছিলেন কাউখালী উপজেলা চেয়ারম্যান আবু সাঈদ মিয়া মনু, ভাইস চেয়ারম্যান মৃদুল আহমেদ সুমন, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নার্গিস আক্তার হাদিয়া, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট এ কে এম শহীদ, সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান পল্টন, উপজেলা জেপির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম নসু, সাংগঠনিক সম্পাদক মঞ্জুরুল মাহফুজ পায়েল প্রমুখ।
গতকাল বৃহস্পতিবার পিরোজপুর জেলার কাউখালী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সুবিধাবঞ্চিত অসচ্ছল পরিবারের মধ্যে দুস্থ কল্যাণ সংস্থার উদ্যোগে শীতবস্ত্র (কম্বল) বিতরণ করা হয়। বিকালে শিয়ালকাঠি ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে দুস্থ কল্যাণ সংস্থার উদ্যোগে উক্ত ইউনিয়নের অসচ্ছল পরিবারের মধ্যে কম্বল বিতরণকালে সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা এবং জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি উপস্থিত ছিলেন। এ বিতরণ কাজে অংশ নেন ইউপি চেয়ারম্যান সিকদার মো. দেলোয়ার, ইউনিয়ন জেপির সভাপতি হেমায়েত উদ্দিন তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান মোল্লা প্রমুখ। এরপর চিড়াপাড়া-পারসাতুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে দুস্থ কল্যাণ সংস্থার উদ্যোগে উক্ত ইউনিয়নের অসচ্ছল পরিবারের মধ্যে কম্বল বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া সকালে পূর্ব আমড়াজুড়ি ইউনিয়নের শীতার্ত মানুষের মধ্যে কম্বল বিতরণ করা হয়। এরপর সয়না-রঘুনাথপুর ইউনিয়নের অসচ্ছল পরিবারের মধ্যে কম্বল বিতরণ করা হয়।
ভাণ্ডারিয়া সংবাদদাতা জানান, গতকাল সকালে উপজেলার ভিটাবাড়িয়া ইউনিয়নের শীতার্ত মানুষের মধ্যে দুস্থ কল্যাণ সংস্থার উদ্যোগে কম্বল বিতরণ করা হয়। স্থানীয় সেনেরহাট বাজারে বিতরণকাজে অংশ নেন উপজেলা জেপির সদস্যসচিব ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম তালুকদার উজ্জল, ইউপি চেয়ারম্যান খান এনামুল করিম পান্না, জেপি নেতা রেজা আহমেদ দুলাল প্রমুখ। এসব ত্রাণকাজে সমন্বয় করেন আতিকুজ্জামান খোকন, কাজী আতহার আলীসহ সংস্থার কর্মকর্তাবৃন্দ।
ইত্তেফাক/টিআর