জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি বলেছেন, স্বাধীনতাযুদ্ধে চরম ত্যাগ-তিতিক্ষা, কষ্ট-ক্লেশ তথা দেশমাতৃকার প্রতি অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করেই নিজেদের অর্জিত স্বদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের অহংকারের সঙ্গে বাস করতে হবে। সম্মান প্রাপ্তি বা সালাম পাওয়ার অপেক্ষা না করে তাদের আত্মমর্যাদার ওপর বিশ্বাস রেখেই দেশের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব পালন করা বাঞ্ছনীয়। পাশাপাশি ’৭১-এর পরবর্তী প্রজন্মকে জানাতে হবে স্বাধীনতা অর্জনে মুক্তিযোদ্ধাদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথা।
তিনি গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় পিরোজপুর জেলার ইন্দুরকানী উপজেলা জাতীয় পার্টি-জেপির উদ্যোগে বিজয়ের মাসে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে এক আলোচনাসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের দেশের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান বলে অবহিত করা হয়। জাতির দেওয়া এই সম্মানকে স্মরণে রেখে সরকার তাদের নানাভাবে সহায়তা করছে। বর্তমান সরকার প্রশ্নাতীতভাবে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলের হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, মৃত্যুর পরে মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন, ১৫-১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ঘরবাড়ি তৈরি করে দেওয়াসহ নানা মর্যাদাপূর্ণ সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। তার পরও এখনো মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সঠিক তালিকা প্রণয়নে আমরা সক্ষম হইনি। এক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাজের সমন্বয়হীনতা কাম্য নয়। অচিরেই এই পরিস্থিতির অবসান হওয়া দরকার। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনসহ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক নানা অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে কোনো ধরনের অসামঞ্জস্য থাকলে তাও দূর করা উচিত। এক্ষেত্রে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কোনো জটিলতা থাকলে আমরা তা নিরসন করতে উদ্যোগী হব। মুক্তিযোদ্ধাদের এ বিষয়ে শুধু অভিযোগ বা আপত্তি উত্থাপন করে বসে থাকলে চলবে না। তা পূরণের জন্য খোঁজখবর নিতে হয়। সক্রিয় হয়ে এসব দাবিদাওয়া নিষ্পত্তিকরণে এলাকার জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্বশীল ভূমিকা গ্রহণে আমরা কাজ করতে চাই। অতীতের মতো স্বাধীনতার বিপক্ষের নয়, এখন ইন্দুরকানীর জনপ্রতিনিধি স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি বলে মুক্তিযোদ্ধাদের সব কাজই আন্তরিকতার সঙ্গে করা হবে।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, এলাকার মানুষ যদি এক থাকে সব কর্মপরিকল্পনাই বাস্তবায়ন দ্রুততর হয়। বিচ্ছিন্নভাবে নয়, পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে হবে। স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে গৃহীত কর্মসূচি সফল করা সহজতর। এলাকাবাসী ঐক্যবদ্ধ থাকলে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীগণ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের প্রতি উন্নয়ন বরাদ্দে আগ্রহী থাকেন। কাজ সফল করতে নিয়োজিত ঠিকাদারদের যথাযথ ভূমিকা পালন করা আবশ্যক। তারা কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে যেভাবে সক্রিয় থাকেন, বাস্তবায়ন পর্যায়ের তা দেখা যায় না। কেনাবেচা, সাবকন্ট্রাক্ট, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ইত্যাদি পর্যায়ে কাজের কাঙ্ক্ষিত বাস্তবায়ন হয় না। সংসদ সদস্য হিসেবে গত ৩৬ বছর ও ১৮ বছরের মন্ত্রিত্বকালে সচিবালয়ে অবস্থান করা সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও আমাদের মধ্যে নানাবিধ অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। এসব প্রতিকূলতা মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে সোচ্চার ও সক্রিয় থাকতে হয়। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি থাকে। এলাকার জন্য তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হয়।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি বলেন, বাংলাদেশে আগামী দিনে দেশবিরোধী কোনো শক্তি ক্ষমতায় আসবে, সে আশা অবান্তর। বাংলাদেশ সম্পর্কে আমরা হতাশ হব না। আমাদের জীবনমানের উন্নয়ন দরকার, জীবনমানের উন্নয়ন করতে হলে সম্পদ বৃদ্ধি করতে হবে। আমরা দুর্বল নই, দৃঢ়ভাবে কথা বলতে হবে। সাহস থাকতে হবে, জনগণের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। ইন্দুরকানীতে সুপেয় পানির যে প্রকট অভাব অতীতে ছিল, তার সমাধান আমরা করব। এসব কাজে আমাদের সহযোগিতা করা স্থানীয় মানুষের দায়িত্ব।
তিনি আরো বলেন, আমরা ভাণ্ডারিয়া শহরের বটতলা থেকে চরখালী বিসমিল্লাহ চত্বর পর্যন্ত ৮ কিলোমিটার সড়ককে ‘বঙ্গবন্ধু সরণি’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছি। উপজেলা পরিষদের মাসিক উন্নয়ন ও সমন্বয় সভায় গৃহীত ও অনুমোদিত হয়ে জেলা উন্নয়ন ও সমন্বয় কমিটির সভায় তা অনুমোদনের পর এখন এই সিদ্ধান্ত জাতীয় পর্যায়ে চূড়ান্তভাবে গ্রহণ ও অনুমোদনের জন্য জেলা থেকে সংশ্লিষ্ট কমিটিতে প্রেরণ করা হয়েছে।
ইন্দুরকানী উপজেলা জেপি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মুক্তিযোদ্ধাদের এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপজেলা জেপির সদস্য সচিব মো. শাহীন হাওলাদারের উপস্থাপনায় আরো বক্তব্য দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার হোসাইন মুহাম্মদ আল মুজাহিদ, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সহসভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল লতিফ হাওলাদার, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোশাররফ হোসেন প্রমুখ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অতিথিদের জেপির পক্ষ থেকে ক্রেস্ট ও মেডেল উপহার দেওয়া হয়। এ সময় মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারকে বিশেষ উপহার হিসেবে শীতবস্ত্র প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে ইন্দুরকানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির, উপজেলা জেপির সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক ও পাড়েরহাট ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম সরোয়ার বাবুল, ইন্দুরকানী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান সেলিম, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান রুহুল আমীন বাগা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
গতকাল শুক্রবার ইন্দুরকানী সফরকালে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপির সঙ্গে ছিলেন ভাণ্ডারিয়া উপজেলা জেপির যুগ্ম-আহ্বায়ক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাহিবুল হোসেন মাহিম, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মৃধা, ধাওয়া ইউপি চেয়ারম্যান
সিদ্দিকুর রহমান টুলু, টুঙ্গিপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা হাফিজুর রশীদ তারেক, পিরোজপুর জেলা পরিষদের সদস্য রেজাউল হক রেজভী জোমাদ্দার প্রমুখ।
ইন্দুরকানীতে দুস্থ কল্যাণ সংস্থার কম্বল বিতরণ
বিকালে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপির উপস্থিতিতে ইন্দুরকানী উপজেলার পাড়েরহাট রাজলক্ষ্মী স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে শীতার্তদের মাঝে দুস্থ কল্যাণ সংস্থার শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়। পাড়েরহাট ইউনিয়নে এ ত্রাণ কাজে অংশ নেন জেপি নেতা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান গোলাম সরোয়ার বাবুল ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান জেপি নেতা মো. শাহআলম হাওলাদার।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত দুস্থ কল্যাণ সংস্থার উদ্যোগে গতকাল শুক্রবার সকালে ইন্দুরকানী উপজেলার পত্তাশী ইউনিয়নের সুবিধাবঞ্চিত অসচ্ছল পরিবারের মধ্যে পত্তাশী জনকল্যাণ মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে শীতবস্ত্র (কম্বল) বিতরণ করা হয়। এরপর বালিপাড়া ইউনিয়নের শীতার্ত মানুষের মধ্যে বালিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে কম্বল বিতরণ করা হয়। দুপুরে চণ্ডীপুর ইউনিয়নে অসচ্ছল পরিবারের মাঝে স্থানীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে দুস্থ কল্যাণ সংস্থার শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়।
বিতরণকাজ সমন্বয় করেন সংস্থার পক্ষে আতিকুজ্জামান খোকন ও কাজী আতাহার আলী।