ইতিহাসের সঙ্গী

একটি জাতির জাগরণের ইতিহাস ‘ইত্তেফাক’-এর মতো আর কোনো পত্রিকায় পাওয়া যাবে না আমাদের এ অঞ্চলে। অবরুদ্ধ বাংলাদেশের কেবল ১৯৭১-এর মে মাস থেকে বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত দিনগুলো বাদ দিলে পুরোটা সময় জুড়েই ইত্তেফাক বিশ্বস্ততার সঙ্গে দেশবাসীর স্বপ্ন, সম্ভাবনা, সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরেছে পত্রিকার পাতায় পাতায়।

আমাদের স্মরণ হবে, ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পরই দলের মুখপত্র হিসেবে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক প্রকাশিত হয়। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সামনে রেখে ইয়ার মোহাম্মদ খানকে প্রকাশক ও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে সম্পাদক করে ১৫ আগস্ট  ১৯৪৯ সালে সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে ইত্তেফাকের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর সাপ্তাহিক পত্রিকাটি দৈনিকে রূপান্তরিত হয়।

ইত্তেফাকের সত্যবাদী ভূমিকার জন্য দুবার সরকারের খড়্গ নেমে আসে পত্রিকাটির ওপর। বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা দাবির পক্ষে সোচ্চার ইত্তেফাকের প্রকাশনা সরকার বন্ধ করে দেয় ১৬ জুন ১৯৬৬ সালে। প্রায় তিন বছর বন্ধ থাকার পর ইত্তেফাক পুনঃ প্রকাশের অনুমতি পায়। দ্বিতীয় বার ইত্তেফাক পতিত হয় চরম দুঃসময়ের মুখোমুখি। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ পাকিস্তানিদের বর্বর গণহত্যা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুড়িয়ে দেওয়া হয় ইত্তেফাক কার্যালয়। কিন্তু ভস্ম থেকেও আবার জেগে উঠেছিল ইত্তেফাক।

ইত্তেফাক প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র এক জায়গায় লিখেছেন : ‘মওলানা সাহেব সাপ্তাহিক ইত্তেফাক কাগজ বের করেছিলেন। কয়েক সপ্তাহ বের হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায়। কারণ টাকা কোথায়? মানিক ভাইকে বললেন, কাগজটা তো বন্ধ হয়ে গেছে, যদি পারো তুমিই চালাও। মানিক ভাই বললেন, কী করে চলবে? টাকা কোথায়? তবুও চেষ্টা করে দেখব। আমি মানিক ভাইকে আমার এক বন্ধু কর্মচারীর কথা বললাম, ভদ্রলোক আমাকে আপন ভাইয়ের মতো ভালবাসতেন। কলকাতায় চাকরি করতেন, সোহরাওয়ার্দী সাহেবের ভক্ত ছিলেন। বাংলাদেশের বাসিন্দা নন, তবুও বাংলাদেশকে ও তার জনগণকে তিনি ভালবাসতেন। আমার কথা বললে কিছু সাহায্য করতেও পারেন। মানিক ভাই পরের মামলার তারিখে বললেন যে, কাগজ তিনি চালাবেন। কাগজ বের করলেন। অনেক জায়গা থেকে টাকা জোগাড় করতে হয়েছিল। নিজেরও যা কিছু ছিল এই কাগজের জন্যই ব্যয় করতে লাগলেন। কিছুদিনের মধ্যে কাগজটা খুব জনপ্রিয় হতে লাগল। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা তাঁকে সাহায্য করতে লাগল। এ কাগজ আমাদের জেলে দেওয়া হত না, আমি কোর্টে এসে কাগজ নিয়ে নিতাম এবং পড়তাম। সমস্ত জেলায় জেলায় কর্মীরা কাগজটা চালাতে শুরু করল। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠানের কাগজ হিসাবে জনগণ একে ধরে নিল। মানিক ভাই ইংরেজি লিখতে ভালবাসতেন, বাংলা লিখতে চাইতেন না। সেই মানিক ভাই বাংলায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ কলামিস্টে পরিণত হলেন। চমত্কার লিখতে শুরু করলেন। নিজেই ইত্তেফাকের সম্পাদক ছিলেন। তাঁকে ছাত্রলীগের দুই-তিনজন কর্মী সাহায্য করত। টাকা-পয়সার ব্যাপারে আমার বন্ধুই তাঁকে বেশি সাহায্য করতেন। বিজ্ঞাপন পাওয়া কষ্টকর ছিল, কারণ ব্যবসা-বাণিজ্য কোথায়? আর সরকারি বিজ্ঞাপন তো আওয়ামী লীগের কাগজে দিত না। তবুও মানিক ভাই কাগজটাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন একমাত্র তাঁর নিজের চেষ্টায়।’

ইত্তেফাক ও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সমার্থক হয়ে উঠেছিলেন। বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগের নেতারা মানিক মিয়াকে শ্রদ্ধা করতেন। ‘মোসাফির’ ছদ্মনামে তার লেখা কলামগুলো অত্যন্ত পাঠকপ্রিয় হয়েছিল। তার প্রধান কারণ ছিল তিনি জনগণের মনের কথা সহজভাবে লিখতে পারতেন। বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে, গণ-অভ্যুত্থানে, অসহযোগ আন্দোলনে ইত্তেফাকের ভূমিকা আমাদের সংবাদপত্রের ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

ইত্তেফাক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে। একসময় ইত্তেফাক ছিল এ দেশের সর্বাধিক প্রচারিত সংবাদপত্র। আমার মনে আছে, যেখানে সংবাদপত্রগুলো বিজ্ঞাপনদাতা বা বিজ্ঞাপনী এজেন্সিগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত বিজ্ঞাপন পাওয়ার জন্য, সেখানে ইত্তেফাকে বিজ্ঞাপন ছাপার জন্য উলটো বিজ্ঞাপনদাতাকেই তদবির করতে হতো। ইত্তেফাক কেন সে জায়গা ধরে রাখতে পারিনি, সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। তবে সংবাদ পরিবেশনে ইত্তেফাক তার পেশাদারি দক্ষতা বরাবর অব্যাহত রেখেছে।

ইত্তেফাকের বর্তমান সম্পাদক তাসমিমা হোসেন বাংলাদেশে দৈনিক পত্রিকার প্রথম নারী সম্পাদক। দীর্ঘদিন ধরে তিনি পাক্ষিক অনন্যা দক্ষতার সঙ্গে সম্পাদনা করে চলেছেন। ব্যক্তিত্বময়ী ও বিদগ্ধ এই সম্পাদক ইত্তেফাককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবেন—এই প্রত্যাশা করি।

ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানাই কিংবদন্তি সাংবাদিক মানিক মিয়ার প্রতি, শুভেচ্ছা জানাই বর্তমানে পত্রিকাটির সঙ্গে জড়িত সব সাংবাদিক ও কর্মীকে এবং অগণিত পাঠককে।

 

লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।