বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনা তথা নদ-নদীর কথা বলতে গেলেই আমার মনের মধ্যে আন্তর্জাতিক নদীর কথা ভেসে ওঠে। কারণ হচ্ছে—এই বিষয়ে আমাদের দেশে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা হচ্ছে বলে মনে করি না এবং যে সমস্ত কথা বলা হয় আমার কাছে অন্তত ভাসা ভাসা মনে হয়। টেলিভিশনের বিভিন্ন টকশোতে বিজ্ঞজন প্রথিতযশা সাংবাদিক বা অধ্যাপকরা কতগুলো গতানুগতিক কথা বলে থাকেন। একটি কথা হচ্ছে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যে পরিমাণ পানি প্রবাহিত হয় ৯৯-৯৩-৯২ ভাগ পানি আসে প্রতিবেশী অর্থাত্ ভারত থেকে। আর যে এলাকার পানি অর্থাত্ যে অববাহিকার পানি আমাদের দেশের সমুদ্রে প্রবেশ করে তারও ৯৩ ভাগ ভারত থেকে। আমাদের দেশে মিয়ানমারের সঙ্গে ছোট একটুকু বর্ডার ছাড়া আর অন্য কোনো দেশের সঙ্গে সরাসরি বর্ডার নেই। উজান থেকে অন্তত দুটি বড় নদী আসে বাংলাদেশে, যার নাম ধরলা এবং নেপাল থেকে অনেকগুলো নদী একত্রিত হয়ে গঙ্গার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এর বাইরে যতগুলো নদী আছে সবই উত্পত্তি স্থল ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বলাবাহুল্য যে, নদীটি বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি পানি জোগান দেয়। এটি চীন থেকে উত্পত্তি হয়ে পরিক্রমা করে আরো দীর্ঘ পরিক্রমা করে ভারত উত্তরপূর্ব ভারত থেকে ভারতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে। শুকনো মৌসুমের পানি বোধ হয় শতকরা ৭০ ভাগই সেই ব্রহ্মপুত্র দিয়ে পানি আসে। সম্প্রতি আমরা ইংরেজি আর বাংলা বিভিন্ন খবরের কাগজে একটা খবর প্রচার হতে দেখেছি, সেটি হচ্ছে চীন তাদের দেশের মধ্যে চারটি বড় বড় ড্যাম এবং জলাধার নির্মাণ করেছে। যিনি সম্পাদনা করবেন তার কাছে বিনীত অনুরোধ সম্প্রতি ডেম আর বাধ যে এক নয় সেটা একটু বুঝতে হবে। বাঁধ শব্দ সম্পূর্ণ পৃথক অবকাঠামোকে নির্দেশ করে। এই ডেমের সঙ্গে অবশ্যই জলাধার থাকবে এবং সেখান থেকে পানি বিদ্যুত্ উত্পত্তি হবে।
অতি সম্প্রতি চীন আর একটি বৃহত্ আকারে ডেম এবং জলাধার নির্মাণের কাজ শুরু করেছে বলে খবরের কাগজ থেকে জেনেছি। চীন থেকে পানি প্রবেশ করে ভারতে ও অরুণাচলে। সেখানে প্রচণ্ড হইচই শুরু হয়েছে। ভারত পালটাপালটি ডেম এবং জলাধার নির্মাণ করার খবর পাওয়া যাচ্ছে। দেশি সাংবাদিকরা তো আমাকে প্রশ্নই করেনি বিদেশি সাংবাদিকরা প্রশ্ন শুরু করেছেন। বিশেষ করে ভারতীয় সাংবাদিকবৃন্দ। আমার সঙ্গে তাদের কথা বলতে খুব মজা লাগে, বহুদিন পর রশিকতা করতে পারছি তাদের সঙ্গে। ভারতের সাংবাদিক বলছেন যে, চীনের ডেম তৈরি হলে অরুনাচল এমনকি আসামও মরুভূমি হয়ে যাবে। আমি এখন জোরে জোরে হেসে বলি যে, তোমাদের দেশের ভেতর থেকে যে ৫৪টি নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, যার অনেকগুলোর উজানেই তোমরা অবকাঠামো নির্মাণ করছ, তখন কি তোমাদের মনে পড়ে যে, তোমাদের অবকাঠামো নির্মাণের কারণে ভাটির দেশ বাংলাদেশ একই ধরনের ঘটনা ঘটবে? উজান ভাটির যে সম্পর্ক আজকে চীন উজানের দেশ হওয়ার কারণে ভারত যেভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে, একইরকম প্রতিক্রিয়া ভাটির দেশ হওয়ার কারণে বাংলাদেশ জানিয়ে থাকে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, চীন ও ভারত যে ড্যাম নির্মাণের কথা হচ্ছে, এটার সঙ্গে আর একটি প্রযুক্তির কিংবা আর একটি প্রক্রিয়ার সংযুক্তি হলেই না বিপদ। সেবা হচ্ছে পানি প্রত্যাহার করা। ঐ জলাধারের পানি নিয়ে যদি অন্যত্র কোথাও সেচ করা হয়, তাহলে মহাবিপদ। চীনে ইতিমধ্যে যে সমস্ত জলাধার নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলো থেকে পানি প্রত্যাহার করার কোনো খবর শুনিনি। এই ড্যাম নির্মাণের ফলে যে জলাধার সৃষ্টি হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ পানি বিদ্যুত্ উত্পাদন হচ্ছে, তাতে ভাটিতে কোনো প্রভাব পড়ার কথা নয়। কথাটা সঠিক হলো না, জলাধারটি ভরাট করার জন্য কি তিন থেকে পাঁচ বছর লাগতে পারে, সেই সময়ে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। এরপর বরং উপকার হবে। কারণ হচ্ছে, শুকনো মৌসুমে ভাটিতে পানির প্রবাহ বেড়ে যাবে আর বর্ষা মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে গিয়ে বন্যার ক্ষেত্রে উপকার হবে। একই কথা ভারত যে ড্যাম তৈরি করবে সেটার জন্য প্রযোজ্য। যদি ড্যাম এবং জলাধার নির্মাণ করে কিন্তু পানি প্রত্যাহার না করে সেচ প্রকল্পের জন্য সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের খুশি হওয়ার কথা। কারণ এতে বন্যার প্রকোপ কমে যাবে এবং শুকনো মৌসুমে পানির প্রভাব বাড়বে। এই পর্যন্ত যারা পড়েছেন তারা বোধহয় অবাক হচ্ছেন যে, এই লেখক কি বলছেন? আমরা দীর্ঘদিন ভারতবিরোধী জিন্দাবাদ করার কারণে পানি ব্যবস্থাপনার মূল প্রিন্সিপল ভুলে গেছি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক টেলিভিশনে এক প্রবন্ধে ভারত এবং চীনের ব্যাপারে প্রচণ্ড উলটাপালটা কথা বললেন। আমি তাকে এসএমএস করে বললাম আসুন একটু কথা বলি, তিনি কথা বলার সময় পাননি। আমরা যখন ৮০-এর দশকে কিংবা ৯০ দশকে গঙ্গা নিয়ে প্রচুর আন্দোলন করেছি, ফারাক্কা দিবস পালন করেছি, তখন যে আলোচনা হয়েছে তা তারা ভুলে গেছেন। আজকে ইত্তেফাকের এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সুযোগে মনে করিয়ে দেই বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে গঙ্গার উজানে ড্যাম এবং জলাধার নির্মাণ করতে হবে। গঙ্গার অববাহিকাতে মধ্যপ্রদেশ কিংবা উত্তর দিকে যদি ড্যাম তৈরি করা হয়, তাহলে দুদেশেরই উপকারে আসবে। ভারতে শীতকালে পানির প্রবাহ বেড়ে যাবে। ভারতের যুক্তি হচ্ছে, যেটুকু পানির প্রবাহ বাড়বে সেটুকু ভারতের নিজের কাজেই লাগবে। যুক্তিটা সঠিক। কারণ একেবারে ভাটির দেশ হিসাবে বাংলাদেশেরও কিছুটা অধিকার আছে। তার পরও বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে, আমরা যদি নেপালে জলাধার নির্মাণ করতে পারি, তাহলে শীতকালে পানির পরিমাণ বাড়বে। নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল, মে মাসে পানির প্রবাহ বাড়বে। এতে ভারতও উপকৃত হবে, বাংলাদেশও উপকৃত হবে, এমনকি নেপালও উপকৃত হবে। কারণ তাদের বিপুল পরিমাণ পানি বিদ্যুত্ উত্পাদন হবে। আমি মনে করি বাংলাদেশ এই সমস্ত অবকাঠামো বানানোর জন্য যে অর্থায়ন প্রয়োজন হবে, সেই অর্থায়নে অংশীদার হওয়া উচিত। আমার জানা মতে, আমাদের সম্মানিত প্রধানমন্ত্রী এর জন্য ১ বিলিয়ন ডলার আলাদা করে রাখছেন। যাতে নেপালে এই জলাধার নির্মাণ করা যায়। নেপালের সবচেয়ে পুব দিকের নদীটি হচ্ছে কুশি, তাই কুশি নদীর কারণে বিহারে প্রচুর বন্যা হয়। পশ্চিমবঙ্গেও বিপদ ডেকে আনে। আমার জানা মতে, নেপাল চাচ্ছে কুশিতে অনেকগুলো ড্যাম তৈরি করা। সবচেয়ে উঁচু ড্যামকে বলা হয় হাইডেম। সেটি ভারত বাংলাদেশ এবং নেপাল যৌথভাবে নির্মাণ করুক। এই কাজটি অত্যন্ত বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
প্রচুর পানি বিদ্যুত্ উত্পাদন হবে। যারা অর্থ লগ্নি করবেন তারা পানি বিদ্যুতের ভাগ পাবেন। বিহার থেকে বন্যার প্রকোপ কমে যাবে। বাংলাদেশে মাঝেমধ্যে গঙ্গায় পানি বাড়ে সেটির ভয় থাকবে না, অর্থাত্ বন্যা ব্যবস্থাপনা হবে আর শুকনো মৌসুমে প্রচুর পানি পাওয়া যাবে। আমাদের দেশে জিকে প্রজেক্ট গঙ্গার পানির ওপর নির্ভরশীল। শুকনো মৌসুমে এখানে পানি পাওয়া যায় না। হয়তো তাই প্রকল্প একত্রে করতে পারলে ফল পাওয়া যাবে, যেটা আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অর্থায়নে রাজি হয়েছেন বলে শুনেছি। নেপালও রাজি আছে। অর্থাত্ এই কাজটি ভারত বাংলাদেশ নেপালকে একসঙ্গে বসে করতে হবে। অর্থাত্ আমি যে কথা বলছি, ড্যাম তৈরি করে, জলাধার তৈরি করে সারা বছর পানি ব্যবস্থাপনা করাটাই হচ্ছে বাংলাদেশের সত্যিকারের অবস্থান এবং এটিকে সঠিক অবস্থান বলে আমরা মনে করি।
উন্নত বিশ্বে বিশেষ করে আমেরিকাতে ড্যামের বিরুদ্ধে কিছু আন্দোলন আছে। তাদের অবশ্য কয়েক হাজার ডেম আছে। যে সমস্ত ডেম ১০০ বছর আগে নির্মিত হয়েছে সেগুলোর অবস্থা এখন ভালো নয়। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই হোক বা যে কারণেই হোক, সেগুলোর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন আছে। সে কারণে আমেরিকা বা সেখানকার কিছু প্রদেশে ড্যামের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। ড্যামের কিছু ক্ষতিকর দিক অবশ্যই আছে। যে ড্যাম নির্মাণ হবে, সেখানে যারা বসবাসকারী তাদেরকে অন্যান্য জায়গায় সরিয়ে নিতে হবে এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হতে পারে। কাজেই যারা জীববৈচিত্র্য প্রেমিক তাদের ড্যামের কথা শুনলেই আঁতকে উঠেন। কিন্তু মানুষের কথা ভাবতে হলেও ড্যামের কোনো বিকল্প নেই। আবারও বলছি, ড্যামের কোনো বিকল্প নেই। কদিন আগে একটি বই পড়ছিলাম। বিষয়বস্তু পানি ব্যবস্থাপনা ও টেকসই উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। বইটিতে টেকসই উন্নয়নের কথা কিছুই খুঁজে পাইনি। টেকসই উন্নয়ন বা সাসটেনবল ডেভেলপমেন্টের কথা থাকলে বইটি বিক্রি হতে পারে, হয়তো সেটাই তার ধারণা ছিল। পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে টেকসই উন্নয়ন করতে গেলে বর্ষার বিপুল পানি ধরে রেখে শুকনো মৌসুমে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কাজেই চীন ড্যাম তৈরি করছে, ভারত অরুণাচলে ড্যাম তৈরি করছে শুনলে ঘাবড়ে যাওয়ার কারণ হয়তো আছে, কিন্তু এর সমাধান হচ্ছে চীন-ভারত-বাংলাদেশ প্রকৃতভাবে কি করছে-- সেটা জানতে হবে। চীনের তিব্বত অঞ্চলে যেখানে ড্যাম তৈরি হচ্ছে, সেখানে সেচের জন্যে জায়গা নেই। অর্থাত্ সেখানে পানি প্রত্যাহারের সম্ভাবনা কম। চীন শক্তিশালী দেশ, ধনী দেশ। তারা হয়তো করলে তিব্বত থেকে অর্থাত্ চীনের তিব্বতের অংশ থেকে জলাধারের পানি টেনে মঙ্গুনিয়াতে ৩ হাজার ও ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে নিয়ে যেতে পারে। প্রকৌশলগতভাবে তা সম্ভব। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে এটা খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। চীন যতক্ষণ পানি প্রত্যাহার না করছে ততক্ষণ ভারত কিংবা বাংলাদেশের কোনো ঘাবড়ে যাওয়ার কারণ নেই, একইভাবে ভারত যদি শুধু জলাধার এবং ড্যাম তৈরি করে এবং যদি পানি প্রত্যাহার না করে তাহলে বাংলাদেশের উল্লসিত হওয়ার কারণ আছে। এই কথাটি কেউ বুঝতে পারছেন বলে মনে হয় না।
আমাদের নীতি নির্ধারকদের কথা বলি। এই নীতি নির্ধারক কারা এদের আমি এখনো খুঁজে পাই না। একমাত্র মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে সমস্ত সিদ্ধান্ত দেন, সেগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা হয়, কিন্তু তাতে তো পরামর্শদাতাদের ওপর নির্ভর করতে হয় এবং এই পরামর্শদাতারা কারিগরি কতটুকু বোঝেন, সে ব্যাপারে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এর জন্য একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে তার নাম যৌথনদী কমিশন। এই কমিশনটি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চলে। সেটা যে আছে তার কোনো সাড়া আমরা পাই না। আগামী জানুয়ারি মাসে ভারত-বাংলাদেশের এই যৌথ প্রতিষ্ঠানটির সভা হবে বলে জেনেছি। যে প্রোগ্রাম খবরের কাগজে দেখেছি তাতে বলা হয়েছে দুদিনের বৈঠক প্রথম দিন গঙ্গার পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিশেষ করে ১৯৯৬-এর চুক্তির বাস্তবায়নের ব্যাপারে আলোচনা হবে। এই চুক্তির তিনটি অংশের তৃতীয় অংশটি হচ্ছে শুকনো মৌসুমে পানি প্রবাহ বৃদ্ধি করার। ২০১১ সালে আমাদের দুই প্রতিবেশী প্রধানমন্ত্রীদ্বয় একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন অত্যন্ত যুগান্তকারী চুক্তি। আমি মনে করি পানি নিয়ে যারা কথা বলেন, তাদেরকে এই চুক্তিটা অবশ্যই পড়তে হবে এবং মর্ম কথাটা অনুধাবন করা উচিত। সেখানে বলা হয়েছে, অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থা করা হবে। অর্থাত্ বর্ষার পানি আর শীতকালের পানির মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। শুকনো মৌসুমে সীমানা থেকে যতটুকু পানি পাওয়া যায়, সেটার বণ্টন করতে যাওয়া একটা বোকামির চিহ্ন। প্রায় ৫০-এর দশক ধরে আলোচনা করেছি, ৭০-এর দশক একটি চুক্তি করেছি, সেই চুক্তিটি ছিল ২৫ বছরের।
এমনকি ভূবেষ্টিত দেশ নেপালকে সমুদ্রে প্রবেশাধিকার দেওয়া সম্ভব হবে যে ব্যাপারটির জন্য নেপাল অত্যন্ত আগ্রহী। প্রকৃতি এবং মত্স্য উত্পাদনের কথা নাই বললাম। সুতরাং এই ধরনের ড্যাম এবং জলাধার নির্মাণ করতে পারলে বহু ধরনের উপকার হবে। কিন্তু একই সঙ্গে নেতিবাচক দিকটিও মনে রাখতে হবে। সেটি হচ্ছে বেশ কিছু মানুষকে স্থানান্তরিত হতে হবে এবং পরিবেশ ও প্রতিবেশের কী ক্ষতি হবে, তা খতিয়ে দেখতে হবে। কিন্তু এটি সম্ভব হলে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল এবং আমরা যদি ভুটানকে জড়াতে পারি, তাহলে এই চারটি দেশের মধ্যে পানি ব্যবস্থাপনাতে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান সম্ভব এবং আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বন্ধুত্ব আরো সুদৃঢ় হতে পারে। তবে এ ব্যাপারে কোনো চিন্তাভাবনা হচ্ছে বলে টেলিভিশন কিংবা সংবাদমাধ্যমে খবর পাইনি। দেশের মধ্যে ভারতবিরোধী যে মনোভাব রয়েছে এটি পরিহার করে উন্নয়নের রাস্তায় হাঁটতে হবে। সীমান্তে যে পরিমাণ পানি, সেই পানি বণ্টনের চিন্তাভাবনা পরিহার করতে হবে। আমার জানা মতে, যৌথ নদী কমিশনের বাইরে খুব একটা এগোতে পারছে বলে মনে হচ্ছে না। আর ২০১১ সালে বিরাট মাইলফলক দাবি করে যে চুক্তি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করেছেন তা নিয়ে অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা, সুশীলসমাজ, এনজিও মহল, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দের মধ্যেও কোনো চিন্তা আছে বলে আমার মনে হয় না।
১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ যে চুক্তি করে সেই চুক্তিটিতে আমি অত্যন্ত বিস্মিত, প্রথমত চুক্তিটি হচ্ছে ৫ বছরের আর চুক্তিটি শুধু সীমান্তে যতটুকু পানি আসে ততটুকু নিয়ে। একই ধারাতে ১৯৮২ এবং ১৯৮৫ তে একই চুক্তি হয়। এরপর ১৯৯৬ তেও আমরা একটি চুক্তি করি। সেখানেও সময়ের সীমাবদ্ধতা আছে। আর বর্ডারে যে পরিমাণ পানি পাওয়া যাবে, তা ভাগ হবে। আনন্দের কথা হচ্ছে ২০১১ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বাধা অতিক্রম করার প্রাথমিক সূত্রপাত করেছেন। তিনি বলেছিলেন অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা হবে। জানুয়ারি মাসের আলোচনাসভা। এই বিষয়টি নিয়েই আলোচনার কথা সংবাদমাধ্যমগুলোতে উঠে এসেছে। এ বিষয়ে যারা চিন্তাভাবনা করছেন, বাংলাদেশের প্রস্তুতি কতটুকু সেটি আমরা বিস্তারিত জানি না। যৌথ নদী কমিশনের দায়িত্ব হচ্ছে—পানি সচিব এটি তদারক করেন। কিন্তু যৌথ নদী কমিশনের সভাপতি হচ্ছে পানিমন্ত্রী, সুতরাং তার নেতৃত্বে এই ব্যাপারে প্রস্তুতির কাজ শুরু হওয়া উচিত। এর চূড়ান্ত সমাধান হচ্ছে নেপালে জলাধার বা ওয়াটার ড্যাম নির্মাণ। নেপাল ও ভারতের সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই। এতে প্রচুর পানি বিদ্যুত্ উত্পাদন হবে। আমাদের দেশের বিদ্যুত্ বিভাগ বিদ্যুত্ কেনাবেচার চেষ্টা করেন কিন্তু তারা পানি বিদ্যুত্ উত্পাদনে আগ্রহী নন। অর্থাত্ এই কাজটিতে বিদ্যুত্ বিভাগ এবং পানি বিভাগের যৌথ সমন্বয় প্রয়োজন। আরেকটি অত্যন্ত জরুরি সমন্বয় প্রয়োজন নৌ পরিবহন বিভাগের সঙ্গে। কারণ এতে করে ভারত থেকে বাংলাদেশ হয়ে উত্তর পূর্ব ভারতে, মানে মধ্য ভারত থেকে বাংলাদেশ হয়ে উত্তরপূর্ব ভারতে নৌ চলাচল সম্ভব হবে।
আমি আশা করব, জানুয়ারিতে যে মিটিং হবে এটি যেন অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সুদূর প্রসারী চিন্তাভাবনার মাধ্যমে অগ্রসর হতে পারি।
লেখক : নদী বিশেষজ্ঞ।