মানিক মিয়ার ইত্তেফাক আমাদের ইত্তেফাক

দৈনিক ইত্তেফাক বাংলা ভাষার জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্র। বাংলায় প্রিন্ট সংস্করণ ছাড়াও বাংলা/ইংরেজি অনলাইন সংস্করণও প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর দৈনিক হিসেবে যাত্রা শুরু করে এবং ২৫ ডিসেম্বর দৈনিকের প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। এর পূর্বে ১৯৪৯ সালের ১৫ আগস্ট সাপ্তাহিক হিসেবে ইত্তেফাক যাত্রা শুরু করে যার সম্পাদক ছিলেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। বর্তমানে পত্রিকাটির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন তাসমিমা হোসেন।

‘ইত্তেফাক’ নামলিপিটা মস্তিষ্কে গেড়ে বসে আছে বোঝার বা বোধ হওয়ার বয়স থেকে। বলা যায়, চোখ খোলার বয়সে পত্রিকা পড়া যখন শুরু করলাম, তখন থেকে ইত্তেফাক-এর অসাধারণ নামলিপিটা দখল করে আছে মন-মনোজগত্।

দুই রঙ—কালো বর্ণমালাকে ঘিরে রেখেছে সাদা বর্ডার, সাদা রেখা। তারপর আরেকটা কালো রেখা ঘিরে রেখেছে সাদা রেখাকে। এই কালোটা নজর এড়িয়ে ঘোষণা করে সাদার অস্তিত্ব। আপাত চোখে সাদা-কালোকে ঘিরে রেখেছে মনে হলেও গভীর চোখে তাকালে বোঝা যাবে সাদাটা দুই কালোর মাঝে ঘেরাও হয়ে আছে। তবু জীবনের কালো অধ্যায়কে ছাপিয়ে সাদার অস্তিত্ব দীপ্যমান। নামলিপির ওপরে, ডান পাশে মুক্তাক্ষরে লেখা আছে প্রতিষ্ঠাতা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার নাম। এ নামটাও শিশুকালের শেকড় সন্ধানী মূলে নানা শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে জালের মতো ঘিরে রেখেছে স্মৃতির জগত্।

ইত্তেফাক-এর বাইরে প্রকাশিত প্রবন্ধ, নিবন্ধে দেখেছি ‘তফাজ্জল’ নামটাকে ‘তোফাজ্জাল’ হিসেবে লেখে অনেকে। তারা হয়তো মনোযোগ দিয়ে পড়ে, তবু বোধ হয় দেখার মতো করে দেখে না। তাই ‘ত’  ‘তো’ হয়ে  যায়। এ বিভ্রম ছোটবেলা থেকে আমাদের শৈশবকে সতর্ক চোখে রাঙিয়েছে। ইত্তেফাক-এর কচি-কাঁচার আসর পড়ার জন্য ব্যাকুল থাকতাম ছেলেবেলায়। ছড়া পড়তাম। ছড়া পাঠাতাম। আগ্রাবাদ মসজিদ কলোনির নবাংকুর কচি-কাঁচার মেলার একজন কর্মী হিসেবে নিয়মিত পাঠক ছিলাম। শিশুসাহিত্য আর কচি-কাঁচার শেকড়টাও তখন থেকে মগজে গেড়ে বসে গেছে। সেই বোধ চারপাশের কালো জগতের কালো বাউন্ডারির ভেতর থেকে আমাদের ভেতরের সাদা আর সুন্দরের উল্লাসটা উজ্জ্বল করে তুলেছে। যেমনটা দেখতে পাই নামলিপির গভীর কালোর মধ্য থেকে জীবনের দীপ্যমান অস্তিত্ব ঘোষণা করে ‘সাদা’। ইত্তেফাক আমাদের মননশীলতার এ ‘সাদা-জগত্’কে আলোকিত করার কাজ করে যাচ্ছে তার জন্মের শুরু থেকে। বিশ্বাস আমার। ব্যক্তির জীবন আর সমাজ সংস্কারের এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে!

ছেলেবেলা থেকে দেখে এসেছি সাধু ভাষায় প্রকাশিত হতো ইত্তেফাক। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, ভাষার উত্কর্ষ বাহনে চড়ে প্রমিতকরণ করা হয়েছে নিউজের অক্ষরস্রোত। তবে শেকড়ের কথা ভুলে যায়নি ইত্তেফাক। ঐতিহ্যের ছাপ বুকে ধরে নিয়ে এখনো সম্পাদকীয়টা সাধু ভাষায় লেখা হয়। সাধুভাষার স্বাদটা নিতে পারি আমরা, ২৩ ডিসেম্বর ২০২০-এর সম্পাদকীয় থেকে। কয়েকটা লাইন তুলে ধরার ইচ্ছা শাসন করা গেল না : ‘বর্তমান সরকারের আমলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ও উন্নতি সাধিত হইয়াছে। তাহার মধ্যে বিদ্যুত্ খাতের উন্নয়নে যে ধারাবাহিক সাফল্য পরিলক্ষিত হইতেছে, তাহা বিরোধীমতের লোকেরাও স্বীকার না করিয়া পারেন না। কেননা এই উন্নয়ন দৃশ্যমান, যাহা আমাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও সামাজিক রূপান্তরের অনুঘটক হিসেবে ভূমিকা পালন করিতেছে।’

এখানে দুটো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, সাধুভাষার শেকড় আঁকড়ে রাখা। দ্বিতীয়ত, ভালো কাজের প্রশংসা। ইত্তেফাক-এর এ বৈশিষ্ট্য ভালো লাগে।

‘নেগেটিভ ইভেন্ট ইজ অ্যা নিউজ’-এ কনসেপ্ট মাথায় রেখে ইত্তেফাক পজিটিভ ঘটনাকেও নিউজ বা বার্তা হিসেবে তুলে ধরে। মনস্তত্ত্বের ভাষায় এটা একধরনের রিওয়ার্ড বা প্রণোদনা। ইতিবাচক প্রণোদনাও ভালো কাজে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারকে উদ্বুদ্ধ করে, ব্যক্তির শুদ্ধি এবং সমাজের অন্ধকার ক্ষত দূর করারও বিরাট অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

ইত্তেফাক অযৌক্তিক প্রশংসা কিংবা তোষামোদি সংবাদ প্রকাশ করে না। যেখানে সমালোচনা করার দরকার সেখানে কঠোর সমালোচনা করে। কোথাও ভুল হলে তা ধরিয়ে দেয়। কোথাও অপচয় এবং দুর্নীতি ঘটলে তার মুখোশও খুলে দেয়। এটাই বড় সংস্কারক কাজ। স্বপ্নের কথা যেভাবে প্রকাশ করে, স্বপ্নময় যাত্রায় ব্যর্থতা কিংবা অনিয়মগুলো প্রকাশেও একই রকমভাবে দুর্নিবার।

আরও কয়েক লাইন তুলে ধরছি : ‘আমাদের স্বপ্ন-২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গঠন। উন্নত দেশ গঠনে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ জ্বালানি চাহিদা মিটাইতে দরকার বিদ্যুত্ খাতের ব্যাপক উন্নয়ন।... ত্রুটিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ বিদ্যুত্ লাইনের কারণে আমাদের দেশে প্রায়শ ঘটিতেছে দুর্ঘটনা। ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ এখনো একটি নিত্যনৈমিত্তিক ও বৃহত্ সমস্যা। কারণ এই ট্রান্সফরমারগুলি মেয়াদোত্তীর্ণ বা ওভার লোডেড। ভৌতিক বিদ্যুত্ বিল এই খাতের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনারই ফসল। এই সকল ভোগান্তি অবশ্যই দূর করিতে হইবে।’

এইভাবে ইত্তেফাক শুদ্ধি অভিযানের কথা বলে। একইভাবে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এইভাবে স্বর্ণোজ্জ্বল দিনের আশার সঞ্চালন ঘটায় দেশের মানুষের মনে। এইভাবে সরকারি দপ্তর ও সরকারকে সজাগ করে তোলে। এইভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ইত্তেফাক-এর বুক চিরে বইয়ে চলা কলমের শান ঝলক দিয়ে উঠতে দেখি। কেবল এ যুগে নয়, জন্ম থেকেই ইত্তেফাক-এর এই আপসহীন সাহসী ভূমিকা প্রশংসনীয়।

ঊনসত্তরের ১১ দফা ও অসহযোগ আন্দোলন দেখার বয়স-বোধ হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতাকে ধারণ করে বলতে পারি, ইত্তেফাক জাতির স্বাধীন সত্তাকে জাগ্রত ও আলোকিত করার জন্য তখন থেকে (শুনেছি শুরু থেকেই) রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পাশে থেকেছে। সত্তরের নির্বাচনের মহান বিজয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নপূরণ ও বাস্তবায়নে অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছে, করে আসছে।

ইত্তেফাক-এর উপসম্পাদকীয় ও মতামত বিভাগ আমার সবচেয়ে প্রিয়। উভয় পাতার কেবল একজন লেখক হিসেবে নয়, পাঠক হিসেবেও সেই ছেলেবেলা থেকে আলোকিত হয়ে এসেছি। এর খেলার খবর, বিশ্ব সংবাদ, বিনোদন পাতার আকর্ষণও টানে পাঠকদের। কেবল নিজের অভিজ্ঞতার আলোকেই বলছি না, চার পাশের বন্ধু এবং সহকর্মীদের আলাপে আড্ডায়ও উঠে আসে এসব বিভাগের প্রশংসা। স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও প্রজন্ম পাতারও আমি এক সময় নিয়মিত লেখক ছিলাম। পাঠক তো বটেই শারীরিক ও মানসিক বিষয়ে মানুষকে সচেতন করে তোলার বিরাট দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে দুটো বিভাগ চালু হয়। আমার মনে হয় ইত্তেফাক-এর এসব বিভাগসহ মহিলাঙ্গনের বিশেষ ফিচারগুলো পড়ে ঋদ্ধ হয়েছেন দেশের বৃহত্তর পাঠক-শ্রেণি। বেশ কয়েক বছর ইত্তেফাক-এর মহিলাঙ্গনে কিশোরীদের পাঠানো চিঠির জবাব দিতাম। সারা বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য কিশোরী তাদের অবিশ্বাস্য সব সমস্যার কথা লিখে পাঠাত। তার বিশ্লেষণ করে জবাব দিতাম। প্রজন্ম পাতায়ও টিনেজ প্রজন্মের মন আলোকিত করা নানা বিষয় নিয়ে লিখতে গিয়ে বুঝেছিলাম প্রত্যেক পাতার দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্পাদকের সমাজ-সচেতন দৃষ্টিভঙ্গির স্বরূপ।

আর মতামত কিংবা উপসম্পাদকীয় বিভাগের একজন লেখক হিসেবে নিজে বেশ পরিচিতি পেয়েছি দেশজুড়ে। এখনো এসব পাতায় লেখায় ডাক পেলে সব কাজ, জরুরি দায়িত্বও পাশে সরিয়ে লিখতে বসে যাই। গভীর টান থেকেই নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার চেষ্টা করি। সমসাময়িক বিষয় নিয়েই সাধারণত লিখতে হয়। মানুষের মনের স্বাস্থ্যে উন্নয়ন, মানসিক রোগ ও মাদকাসক্তি বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য প্রায় দীর্ঘ ২২ বছর ধরে লিখছি এ দুই বিভাগে। প্রাণের মধ্যে ইত্তেফাকের শেকড় সন্ধান করতে গিয়ে চমকে উঠেছি। মানসিক সমস্যা, মাদকাসক্তির ভয়াল থাবা; ধর্ষণ, নিপীড়ন, সহিংসতা, হত্যা বা যে কোনো ক্রাইম সংঘটিত হলে অনিবার্যভাবে ইত্তেফাক-এর বার্তা বিভাগের চিফ আবুল খায়ের কিংবা মতামত পাতা দেখাশোনা করার দায়িত্বপ্রাপ্ত সৌরভ জাহাঙ্গীরের ফোনকল আসবেই। বিশেষ সংখ্যায় লেখার জন্য ডাক পাই সম্পাদক তাসমিমা হোসেনেরও।

ইত্তেফাক-এর সাহিত্য সাময়িকী পাতা সাহিত্যিকদের প্রিয় পাতা। সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ সেই ছেলেবেলা থেকে। আমাদের সেই অনুরাগে শান দিয়ে লেখকসত্তার বুনিয়াদ তৈরি করে দিয়েছে কচি-কাঁচার আসর আর সাহিত্য সমায়িকী বিভাগ। কচি-কাঁচার আসরে প্রকাশিত হয়েছে ছড়া, গল্প এবং শিশু সংগঠন নিয়ে নানা খবর। এক সময় আমি ‘প্রবল কচি-কাঁচার মেলার’ পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। সেই থেকে দাদাভাই আর কচি-কাঁচার আসর এবং মানিক মিয়ার ইত্তেফাক আমার/আমাদের ইত্তেফাক হয়ে যায়।

সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত গল্প-প্রবন্ধ বই আলোচনাসহ খ্যাতিমান লেখকদের নিয়ে নানা নিবন্ধ পাঠ আমার  প্রতি সপ্তাহের মনের খোরাক জোগায়। এই বিভাগেও প্রকাশিত হয়েছে আমার গল্প, প্রবন্ধ, সাক্ষাত্কার, আমার বই নিয়ে আলোচনা। অনিবার্যভাবে ঈদসংখ্যাগুলোতেও। রুচিশীল ঈদসংখ্যা ও বিশেষ সংখ্যা প্রকাশে ইত্তেফাক-এর যত্ন আমাকে মুগ্ধ করে। শুরু থেকেই ইত্তেফাক-এর ঈদসংখ্যার দারুণ ভক্ত আমি, গল্পও লিখেছি কোনো কোনো সংখ্যায়।

সব মিলিয়ে মনে করি, দেশের অসংখ্য পাঠক আর ইত্তেফাক-এর নিয়মিত লেখকদের মতো ইত্তেফাক-এর সঙ্গে মিলেছে প্রাণ। প্রাণের মধ্যে এ টান কখনো ম্লান হবে না। নিশ্চিত। তাই বলব পাঠক কিংবা লেখক হিসেবে ইত্তেফাক আমারও। আমিও যে এর অংশীদার।

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক, মনোশিক্ষাবিদ।