জাগরণের ৬৮’তেও চিরতরুণ ইত্তেফাক

দেশের অন্যতম প্রধান জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিক ইত্তেফাক ৬৭ বছর পেরিয়ে ৬৮ বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পত্রিকাটির সব সাংবাদিক, লেখক এবং পত্রিকা প্রকাশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

সংবাদপত্র হলো সবচেয়ে শক্তিশালী ও কার্যকর গণমাধ্যম। গণন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। দেশের জনগণের মতপ্রকাশ ও মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সংবাদপত্রের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। সংবাদপত্র যে সত্য প্রকাশের বাহন, বাস্তবচিত্র তুলে ধরার ক্যানভাস এবং প্রয়োজনের শিল্প সে কথাটি বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে সংবাদপত্র সফল তখনই যখন সেটি জনগণের অধিকার সম্পর্কে সচেতন উদ্দীপনা প্রকাশ করে। জনচিত্তের সরব প্রতিফলন ঘটানোই সংবাদপত্রের কাজ। আর এই সাহসী কাজটি সম্পন্ন করতে অনেক সময় গিয়ে জেল-জুলুম, শোষণ, অত্যাচারের স্বীকার হতে হয়। দেশ ও দশের কল্যাণে, সত্য উদ্ঘাটনে, অধিকার আদায়ে সংবাদপত্র যে বলিষ্ঠ ভূমিকা যুগে যুগে পালন করে এসেছে তারই উত্কৃষ্ট উদাহরণ দৈনিক ইত্তেফাক।

১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকের যাত্রা শুরু হয় এবং ২৫ ডিসেম্বর দৈনিক পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। তবে এর পূর্বে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক প্রকাশিত হতো। দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠা হয় এমন এক সময় যখন ভাষা, সংস্কৃতি, বাঙালির আজন্ম লালিত ঐতিহ্য দানবের করাল গ্রাসে পতিত। এই সময় বাঙালি জাতিসত্তাকে বাঁচাতে এবং তাকে সংগ্রামের পথে এগিয়ে নিতে ইত্তেফাক যে ভূমিকা রেখেছিল তা আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দৈনিক ইত্তেফাকে পশ্চিম পাকিস্তান সরকার কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানিদের ওপর নির্যাতন ও বৈষম্যের সংবাদ নিয়মিত প্রকাশ করা হতো। যা তত্কালীন সময়ে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে বিশাল ভূমিকা রেখেছিল।

১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টকে বিজয়ী করতে সহায়তা করেছিল দৈনিক ইত্তেফাক। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনেও ইত্তেফাক ছিল সামনের কাতারে। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর সম্পাদক মানিক মিয়া এ শাসনব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করে বিভিন্ন কলাম লেখা শুরু করেন, ফলশ্রুতিতে ১৯৫৯ সালে তিনি গ্রেফতার হন এবং পরবর্তীতে ১৯৬২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি পুনরায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মানিক মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬২ সালের ৪ অক্টোবর মানিক মিয়া মুক্তি পান। ১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে পূর্ব পাকিস্তানে দাঙ্গা শুরু হলে ১৬ জানুয়ারি মানিক মিয়া পত্রিকা অফিসে আলোচনাসভা করে ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ শীর্ষক প্রচারণা শুরু করেন এবং সংবাদপত্রের মাধ্যমে সনাতন ধর্মাবলম্ব্বীদের নিরাপত্তা প্রদানের আহ্বান জানান।

১৯৬৬ সালেও ইত্তেফাক বাঙালির মুক্তির দলিল ছয় দফা দাবির পক্ষে অবস্থান নিয়ে কাজ করেছিল। মানিক মিয়াকে পুনরায় গ্রেফতার করে ১৬ জুন সরকার ইত্তেফাক পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেয় ও ‘নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস’ বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে।

১৯৬৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পত্রিকাটি পুনঃপ্রকাশের অনুমতি পায়। এরপর ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও সাহসের সঙ্গে বাঙালির চেতনাকে সমর্থন করেছিল। শত বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও সত্য প্রকাশে আপসহীনভাবে কাজ করে গিয়েছিল।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দৈনিক ইত্তেফাক হয়ে উঠেছিল গণমানুষের মুখপত্র। পত্রিকাটি সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে সমাজের কুসংস্কার, অজ্ঞতা, অন্যায়, শোষণ ইত্যাদি আর্থসামাজিক ও বৈশ্বিক নানা সমস্যার গঠনমূলক আলোচনা, ইতিবাচক সমাধান লেখার মাধ্যমে তুলে নিয়ে আসছে এবং নিরপেক্ষ সংবাদ প্রকাশের উদ্দেশ্যে নিরন্তর কাজ করে আসছে।

বাংলাদেশ সম্ভাবনাময় দেশ। এ দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার উদীয়মান তরুণ প্রজন্ম। তরুণরা সর্বদাই উদ্যমী। দেশের তরুণ সমাজ যদি কর্মঠ হয় এবং কাজের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ পায়, তাহলে দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত। কারণ তরুণরা চাইলেই তাদের পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব। তরুণ প্রজন্মকে কাজে লাগিয়েই সমাজকে বদলে দেওয়া সম্ভব। তাই দৈনিক ইত্তেফাক নতুন প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ ঘটিয়ে দেশ ও জাতির সমৃদ্ধির স্বার্থে যোগ্য ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহযোগিতা করছে। এ দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য বিগত ছয় বছর যাবত্ ‘নতুন প্রজন্মের ভাবনা’ পাতাটি প্রকাশ করছে। এখানে নতুন প্রজন্মের অন্তর্নিহিত প্রতিভা বিকশিত হচ্ছে তাদের লেখনীর ধারায়।

এ পাতায় তরুণ প্রজন্ম আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিকসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করে, মতামত প্রদান করে। যা আসলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেশের উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক প্রয়োজন। দৈনিক ইত্তেফাক যেভাবে তরুণ প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, এভাবে এগিয়ে চললে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ নতুন মেধাবী বিশ্লেষক পাবে। যারা তাদের চিন্তা, গবেষণা, লেখনীর মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। যারা হবে সত্যিকারের মানুষ, সত্যকে উন্মোচিত করতে হবে চির আগ্রহী। এখন সময় এসেছে নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে এগিয়ে যাবার।

এই করোনাকালে কাগজের মাধ্যমে করোনা ভাইরাস ছড়াতে পারে এমন আশঙ্কায় সংবাদপত্রের গ্রাহকদের একটা বিরাট অংশ খবরের কাগজ রাখা বন্ধ করেছে। এ কঠিন সময়েও ইত্তেফাক তরুণদের জন্য বিশেষ পাতাটির প্রকাশ অব্যাহত রাখছে। যার ফলে অনেকেই নিজেদের মতামত, অভিব্যক্তি, ভাবনা ফুটিয়ে তুলতে পারছে। প্রতিনিয়ত জ্ঞানচর্চায় নিজেকে নিয়োজিত রাখছে। এ জ্ঞানের চর্চা অব্যাহত রাখতেই দৈনিক ইত্তেফাকের এ প্রয়াস। যা সত্যিই প্রশংসনীয়।

ইত্তেফাক শব্দের অর্থ সম্প্রীতি-মিল-ঐক্য। কালের আবহে বারবার প্রমাণিত হয়েছে নামকরণ যথার্থই হয়েছিল। দৈনিক ইত্তেফাক জনগণের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে যাত্রার শুরু থেকেই ন্যায় ও সত্য সংবাদ প্রকাশের উদ্দেশ্যে যেভাবে কাজ করে যাচ্ছে আগামী দিনেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে, এটাই আমার বিশ্বাস। আজ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দৈনিক ইত্তেফাকের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।