বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে দৈনিক ইত্তেফাক

দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার নাম কমবেশি প্রায় সবারই জানা। আর জানবেই না কেন! যে পত্রিকার সঙ্গে দেশের একটা আত্মিক সম্পর্ক আছে, সে দেশের জনগণ সেই পত্রিকা সম্পর্কে জানবে না, তা কী করে হয়! দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চ শ্রেণির ব্যক্তিবর্গ সকলেই কম বেশি ইত্তেফাক পত্রিকা সম্পর্কে জানে ও পড়ে। দৈনিক ইত্তেফাক এমন একটি পত্রিকা, যা তরুণ, মধ্যবয়সি কিংবা বয়োজ্যেষ্ঠ প্রায় সবার কাছেই সমানভাবে জনপ্রিয়। যুগের পর যুগ, দিনের পর দিন পেরিয়ে গেছে তবুও দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার জনপ্রিয়তা একটুখানি কমেনি।

শুরু থেকেই পত্রিকাটি পাঠকদের হূদয়ে নির্ভুল সংবাদ প্রাপ্তির কেন্দ্রস্থল হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। ফলে খুব দিনের ব্যবধানে ১৯৫৩ সালের ২৪শে ডিসেম্বর দৈনিক পত্রিকা হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ২০২০ সালে এসে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার প্রচার, প্রসার, সম্পাদকীয় নীতিসহ ইত্যাদি বিষয়বস্তু বিচার-বিশ্লেষণ করে এ কথা সন্দেহাতীতভাবে বলা যায় প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দৈনিক ইত্তেফাক গণমানুষের মুখপত্র হিসেবে কাজ করছে।

সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো মানুষের অধিকারের কথা প্রচার করা। মানুষের অধিকারের কথা প্রচার করতে গিয়ে বিপদ আসন্ন জেনেও কখনো মিথ্যার কাছে মাথা না নোয়ানো। সর্বদা সত্ ও সত্যের প্রতি অবিচল থাকা। দৈনিক ইত্তেফাক সব সময় এ কাজগুলোই করে এসেছে। প্রতিষ্ঠার ৬৮ বছরে পদার্পণ করেও দৈনিক ইত্তেফাক তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে একটুখানি বিচ্যুত হননি। যুগে যুগে তার অসংখ্য নমুনা আমরা দেখতে পাই।

যদি বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলনের কথা বলতে পারি। তখনো দৈনিক ইত্তেফাক ছিল সদা জাগ্রত, নির্ভীক চিত্তে কাজ করে গেছে দেশের জন্য। ১৯৬৬ সালের ৬ই নভেম্বর যখন ৬ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবি করা হয় তখন দৈনিক মর্নিং নিউজ, দৈনিক পাকিস্তান ও দৈনিক আজাদ ৬ দফার বিরোধিতা করে। কিন্তু দৈনিক ইত্তেফাক ৬ দফার পক্ষে অবস্থান নেন। শুধু তা-ই নয়, অন্যতম প্রচারকের ভূমিকা পালন করে। ফলে ১৯৬৬ সালের ১৭ই জুন ইত্তেফাক পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। গ্রেফতার করা হয় তত্কালীন সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকেও। সে সময়ে তত্কালীন পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে আপস করলে মানিক মিয়া হয়তো ইত্তেফাক প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। গ্রেফতার হওয়ার প্রায় ১০ মাস পর ১৯৬৭ সালের ২৯শে মার্চ মানিক মিয়া মুক্তি পান। মুক্তি লাভের পর তাকে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে দৈনিক ইত্তেফাক প্রকাশ করার জন্য ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সাফ জানিয়ে দেন, ‘ইত্তেফাক যদি তার ঐতিহ্য অনুসরণ করে প্রকাশিত না হতে পারে, তাহলে তিনি সেই পত্রিকা প্রকাশে আগ্রহী নন।’ ইত্তেফাক পত্রিকা এমনই একটি পত্রিকা, যা দেশের সংকটময় মুহূর্তে অকুতোভয় দুঃসাহসী সৈনিকের  কাজ করে গেছে।

বাঙালি জাতির ইতিহাসে ১৯৭১ সাল কখনো ভুলবার নয়। শিশু থেকে কিশোর, কিশোর থেকে তরুণ, তরুণ থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ কমবেশি সবাই ১৯৭১ সালের মহত্ত্ব সম্পর্কে জানে ও বোঝে। তখনো স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়নি, পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক তেমন ভালো নয়, দিন দিন তা প্রকট আকার ধারণ করছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণের পর তা আরো খারাপ আকার ধারণ করে। তখন পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের গোষ্ঠীর সাপে-নেউলে সম্পর্কের স্বরূপ উন্মোচিত হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর দুরভিসন্ধি সাধারণ মানুষ জেনে যায়। দৈনিক ইত্তেফাক সব ঘটনার খবর ফলাও করে প্রচার করতে থাকে। তখন স্বাধীন ও অবাধ সাংবাদিকতা রুখতে তত্কালীন শাসকগোষ্ঠী সামরিক আইন জারি করে। সরকার আপত্তিকর সংবাদ পরিবেশনের দায়ে ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান করে। কিন্তু দৈনিক ইত্তেফাক তার কোনো তোয়াক্কা করেনি। সামরিক আইনের বিধান অগ্রাহ্য করেই সেই সময়কার অসহযোগ আন্দোলনের খবর নিয়মিতভাবে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করেছে। শাসকগোষ্ঠী কোনোভাবেই ইত্তেফাককে নিয়ন্ত্রণে আনতে না পেরে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে দৈনিক ইত্তেফাক ভবন পুড়িয়ে দেয়। তবুও দৈনিক ইত্তেফাক তাদের কাছে মাথা নোয়ায়নি। মানুষের মুক্তির প্রশ্নে, স্বাধীনতার প্রশ্নে দৈনিক ইত্তেফাক ছিল আপসহীন। নিজের অস্তিত্ব বিলীনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রতি নিরবচ্ছিন্নভাবে সব সময় সমর্থন জুগিয়ে গেছে বরাবরই মতোই। তারই পথ ধরে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। সত্যি বলতে, দৈনিক ইত্তেফাককে বাদ দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের কথা চিন্তা করা যায় না। ইত্তেফাকের এই ভূমিকা সংবাদপত্রের ইতিহাসের একটি বিরল দৃষ্টান্ত।

একসময় আমরা পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিলাম, নিজের বলতে কোনো কিছু ছিল না। আজ আর সেই আগের অবস্থা নেই। আজ আমরা পরাধীনতার শিকল থেকে মুক্ত, সম্পূর্ণ স্বাধীন দেশের নাগরিক। কিন্তু এই স্বাধীনতা এমনি এমনি আসেনি। এই স্বাধীনতা অর্জন করতে যারা নির্ভীক চিত্তে অকুতোভয় সৈনিক হিসেবে কাজ করেছে দৈনিক ইত্তেফাক তাদের মধ্যে অন্যতম। দৈনিক ইত্তেফাকের পক্ষে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেকে উত্সর্গ করা খুব সহজ ছিল না, পথটা ছিল খুবই কণ্টকাকীর্ণ। কেবল সত্ সাংবাদিকতা করার কারণে সেই কঠিন পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব হয়েছে। সত্ সাংবাদিকতার সেই মন্ত্র ইত্তেফাক আজও হূদয়ে ধারণ করে চলেছে। পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকাকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল, কিন্তু মানুষের ভালোবাসায় বারবার ধ্বংসস্তূপ থেকে মাথা উঁচু করে উঠে দাঁড়িয়েছে দৈনিক ইত্তেফাক। মুক্তিযুদ্ধের পরে নতুন বাস্তবতায় দৈনিক ইত্তেফাক নতুন আঙ্গিকে প্রকাশিত হচ্ছে। সময়ের দাবি মেটাতে ইত্তেফাকের বিন্যাসে এসেছে অনেক পরিবর্তনও। কিন্তু সত্য, ন্যায়, গণতন্ত্র এবং বাংলাদেশের মানুষের অধিকারের প্রশ্নে ইত্তেফাকের অবস্থান ঠিক আগের মতোই আছে, একটুখানিও বদলায়নি। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার জন্মদিনে নিরন্তর শুভেচ্ছা জানাই।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কেন্দ্রীয় সভাপতি,

বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম