হাঁটি হাঁটি পা পা করে ৬৮ বছরে এসে পৌঁছাল ‘দৈনিক ইত্তেফাক’। ১৯৫৩ সালে ২৪ ডিসেম্ব্বর ‘সাপ্তাহিক ইত্তেফাক’ পত্রিকার বিলুপ্তি ঘটিয়ে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ নামে প্রকাশিত হয়। শুরুতে এটি টিকাটুলীর প্যারামাউন্ট প্রেস থেকে ছাপা হতো। এটি মূলত রাজনৈতিক দলের পত্রিকা হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও অল্পসময়ের মধ্যে তা গণমানুষের অধিকারের পত্রিকায় রূপ নেয়। যদি বইকে বলা হয় ‘জ্ঞানের ভান্ডার’ তাহলে পত্রিকা হবে সেই জ্ঞানের উত্স। পত্রিকার মাধ্যমে জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ হয়। সমসাময়িক দেশ-বিদেশের সব তথ্য আমরা পত্রিকাতেই পেয়ে যাই। আর সময়কে জয় করে একটি পত্রিকা হয়ে উঠেছে সমাজের প্রতিচ্ছবি। শুধু সমাজ বললে ভুল হবে—তা এখন সমাজ, রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে বিশ্বের প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশের পত্রিকার ইতিহাস থেকে বলা যায়, বাংলা ভাষার পত্রিকার বয়স খুব একটা বেশি না। দৈনিক ইত্তেফাকের পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৪৯ সালে ‘সাপ্তাহিক ইত্তেফাক’-এর যাত্রা শুরু করেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে বিভাজিত হওয়া পাকিস্তানের অংশ ছিল পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের স্বপ্ন, সাধ আর আশার বাণী ছিল এ পত্রিকা। পিছনে থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আতাউর রহমান খান, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াসহ আরো অনেকে।
১৯৫১ সালে মওলানা ভাসানী সক্রিয় রাজনীতি ও পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনে ব্যস্ত থাকায় তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে সম্পাদনার দায়িত্ব দেন। মানিক মিয়া ১৯৫৩ সালে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ নামকরণের মধ্য দিয়ে নতুন রূপে রূপান্তর করেন। মানিক মিয়ার একটা কলাম ছিল ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’, বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বাংলার মানুষের অধিকার, শোষণ, বঞ্চনা স্থান পাওয়ায় শিক্ষিত মহলে বেশ সাড়া জাগায়। স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট জয়ী করার মতো সাহসী ভূমিকা রাখে। ১৯৬১ সালে সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করার জন্যে সামরিক শাসক আইয়ুব খান ‘প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স’ অ্যাক্ট আইন জারি করে, অনেকদিন প্রচারণা বন্ধ থাকে, মানিক মিয়াকে জেলে নেওয়া হয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী ইত্তেফাক অফিস পুড়িয়ে ফেললেও অল্পদিন পর আবার চালু হয়। ১৯৭৫ সালের ১৭ জুন ইত্তেফাক পত্রিকা জাতীয়করণ করা হয়।
বর্তমানের ইত্তেফাক নানান দিকে বিস্তৃত। দেশ-বিদেশ, শিল্প-সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, খেলাধুলা, বিজ্ঞান, মতামত প্রভৃতি বিষয়ের খবরাখবর সুন্দর ও সাবলীলভাবে ছাপা হচ্ছে। তরুণ শিক্ষার্থীরা নতুন নতুন ধারণা পোষণ করছে; প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য নিয়ে উদ্যোক্তা হচ্ছে। পুরোনো ধ্যান-ধারণা ত্যাগ করে সমাজ পরিবর্তনের নতুন রূপ খুঁজে বেড়াচ্ছে। যানজট, সড়ক দুর্ঘটনা, বাল্যবিবাহ, গুম-হত্যা, ধর্ষণ, শিশু ও নারী শিক্ষা, বয়স্কদের সম্মান প্রদর্শন, নৈতিকতা প্রভুৃতি সমাজসচেতনমূলক কর্মকাণ্ডে একদল শিক্ষিত মহল ইত্তেফাকের সহায়তা নিচ্ছে। আর আমরা পাঠক সমাজ সচেতন হচ্ছি। একটা কথা বলা দরকার, বিভিন্ন সংবাদপত্রে অনেক সময় ভুল তথ্যও থাকে আবার দলীয় স্বার্থ বা বিজ্ঞাপন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহূত হয়। এসব ব্যাপারে লেখকসমাজকে একটু সচেতন থাকতে হবে। সংবাদপত্রের তথ্য বা মতামতগুলো অবশ্যই নিরপেক্ষ ও যৌক্তিক হবে। ইতিবাচক চিন্তাধারায় আমাদের দেশকে বদলে দিবে, সমৃদ্ধ করে তুলবে। সর্বোপরি, দৈনিক ইত্তেফাকের ৬৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে অনেক অনেক শুভকামনা রইল।
লেখক : শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।