উপমহাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম ইত্তেফাক

৬৮ বছরে পা দিল তারুণ্যের অহংকার, বাংলাদেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় সংবাদপত্র, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের প্রকৃষ্ট উদাহরণ ‘দৈনিক ইত্তেফাক’। ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর ইত্তেফাক দৈনিক হিসেবে যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দৈনিক ইত্তেফাক হয়ে উঠেছে গণমানুষের মুখপাত্র। দেশবাসীর অকুণ্ঠ সমর্থন, পাঠকদের আস্থা ও সীমাহীন ভালোবাসায় ছিল ইত্তেফাকের সুদীর্ঘ পথচলার শক্তি ও সাহস। ইত্তেফাক মানুষের মুখের ভাষা বলে, মানুষের অধিকারের কথা বলে, সত্যের পথে অবিচল থেকে সংবাদ প্রচার করে। নিরপেক্ষতা তাদের এগিয়ে চলার মূল পাথেয়।  সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে সময়ের দাবি মেটানো। ইত্তেফাক সেই প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সময়ের দাবি মিটিয়ে আসছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য, মুক্তিযুদ্ধের জন্য ইত্তেফাক নিজেকে উত্সর্গ করেছিল। আজকের এই বাংলাদেশের পেছনে ইত্তেফাকের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। তাদের দীর্ঘ পথচলায় অনেক বাধা-বিপত্তি এসেছে, কিন্তু ইত্তেফাক তার নীতি থেকে কখনো সরে আসেনি। মূলত তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সময়কাল থেকে যা শুরু হয়েছে, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে আসার পর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দায়ভার ইত্তেফাক আজও বহন করছে এবং ভবিষ্যতেও বহন করবে।

প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই ইত্তেফাক তার সেই পুরোনো আদর্শই একমাত্র সম্পাদকীয় নীতি হিসেবে ধরে রেখেছে। আর তা হলো, নিরপেক্ষ ও নির্ভীক সাংবাদিকতার ধারা বজায় রাখা, গণমানুষের মনে স্বাধীনতার মূল চেতনা বাঁচিয়ে রাখা, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের সঙ্গে আপস না করা এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের লক্ষ্যে অবিচল থাকা।

ইত্তেফাক এখনো এই নীতি ধরে রেখেছে। ইত্তেফাক কখনো বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বা কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে সংবাদ পরিবেশন করেনি। ইত্তেফাক কখনো রাগ-বিদ্বেষ চরিতার্থ করার জন্য সংবাদ পরিবেশন করে না। বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীকার আন্দোলনের জন্য ইত্তেফাক সব সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ইত্তেফাক মানুষের কাছে সত্য নিয়ে হাজির হয়েছে। ইত্তেফাক আর এই পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন সমার্থক। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার গণতন্ত্রের প্রতি অনমনীয় অবস্থান, ক্ষুরধার লেখনী ইত্তেফাকের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি কখনো অন্যায়ের সাথে আপস করেননি। তার সাংবাদিকতা জীবন ছিল আপসহীন। সামরিক জান্তা ও স্বৈরাচারী শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নির্ভীক সাংবাদিকতার যে উদাহরণ তিনি সৃষ্টি করে গেছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

১৯৬৬ সালের ৬ নভেম্বর আওয়ামী লীগ ছয় দফার প্রেক্ষাপটে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবি করে। অনেক পত্রিকা এটার বিরোধিতা করলেও ইত্তেফাক এটার পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয় এবং প্রচারকের ভূমিকা পালন করে। ১৬ জুন ১৯৬৬ পত্রিকাটির সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন গ্রেফতার হন এবং পরদিন পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রায় ১০ মাস পর ১৯৬৭ সালের ২৯ মার্চ মানিক মিয়া মুক্ত হন। এ সময় পত্রিকা প্রকাশের জন্য তার ওপর চাপ দেওয়া হয়। কিন্তু সম্পাদক পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেন, ‘ইত্তেফাক যদি তার ঐতিহ্য অনুসরণ করে প্রকাশিত হতে না পারে, তবে তিনি সে ইত্তেফাক    প্রকাশে আগ্রহী নন।’ অবশেষে প্রেস মুক্ত হয়। ১০ ফেব্রুয়ারি  ইত্তেফাক  পুনর্জন্ম লাভ করে। ১৯৬৯ সালে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া আকস্মিক মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু ইত্তেফাক প্রকাশ সেই থেকে এখনো অব্যাহত আছে।

এই উপমহাদেশের সংবাদপত্র জগতে ইত্তেফাক এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বস্তুনিষ্ঠ, সত্য সংবাদ প্রচারে তারা শীর্ষে। বাঙালির হূদয়ে বাস করছে ইত্তেফাক। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের উন্নয়নের কথা উঠে আসে ইত্তেফাকে। মৌলবাদী গোষ্ঠী অনেকবার ইত্তেফাককে আটকানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু ইত্তেফাক কখনো তাদের কাছে নতি স্বীকার করেনি। কারণ তারা বাঙালির হূত্স্পদন বোঝে। বাঙালি জন্মগতভাবে অসাম্প্রদায়িক। এদেশে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদের কোনো জায়গা নেই। আর ইত্তেফাক ঠিক এই জিনিসটিই প্রচার করে। তারা বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে গিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করে। তাদের সাংবাদিকেরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও সংবাদ সংগ্রহ করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। ইত্তেফাক মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালন করে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর  হয়ে সদা জাগ্রত থাকে। ইত্তেফাক কখনো নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র হয়ে সংবাদ পরিবেশন করে না। তারা নিরপেক্ষভাবে সংবাদ   পরিবেশন করে।

বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের কাছে সব থেকে জনপ্রিয় পত্রিকার নাম হচ্ছে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখে, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের চেতনা সামনে রেখে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে ইত্তেফাক। আমরা আশা করি ভবিষ্যতেও ইত্তেফাক তার এই নীতি, ধারা বজায় রাখবে এবং কোটি কোটি বাঙালির হূদয়ে সব সময় ভালোবাসার জায়গায় আসীন থাকবে। শুভ হোক ইত্তেফাকের দীর্ঘ পথ পরিক্রম, জয় হোক ৬৮ বছরে পদার্পণের  মঙ্গলক্ষণ।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।