এই সেদিনের কথা। ২৫ নভেম্বর ২০২০। আমেরিকার উটাহ প্রদেশের দক্ষিণ ভাগ। সেখানকার জনসুরক্ষা দপ্তরের কর্মীর নজরে আসে প্রায় ১২ ফুট লম্বা ধাতব স্তম্ভটি। লাল পাথুরে জমি। তার মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে ধাতুর তৈরি ত্রিকোণ স্তম্ভ। চকচকে, মসৃণ। প্রায় দুই মানুষ সমান উচ্চতা। আমেরিকার এই মরুভূমির মধ্যে কে বসাল এই স্তম্ভ্ভ? সরকারি তরফ থেকে এখনো স্পষ্ট জবাব মেলেনি। তবে তদন্ত শুরু হয়ে গেছে সেখানে। উড়ে এসে জুড়ে বসা স্তম্ভটি নিয়ে তুমুল রহস্য তৈরি হয়েছে ইতিমধ্যে। খবরটি প্রকাশ হতেই ঝাঁপিয়ে পড়েছেন বিজ্ঞানীসহ কৌতূহলীরা। তত্ত্ব ও পালটা তত্ত্বে সরগরম হয়ে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়া। কেউ বলছেন, এটা এলিয়েনদের কাজ। কেউ বলছেন, এটি ইউএফওর অংশ। কেউ কেউ এটিকে কোনো এক শিল্পীর ভাস্কর্য বলেও দাবি করেছেন। এর ওপর দিয়ে বিমান নিয়ে যাওয়ার সময় পাইলট ব্রেট হাচিংস প্রথম এই স্তম্ভ দেখেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার সহকর্মীদের জানান। উটাহ হাইওয়েতে নজরদারির দায়িত্বে থাকা একজন সরকারি কর্মকর্তা জানান, স্তম্ভটি দেখে ভিনগ্রহের বলে মনে হয়নি।
আমেরিকা থেকে এবার ইন্দোনেশিয়ার দিকে চোখ ফেরাচ্ছি। ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা। জোসুয়া হুতাগোলুং। মাথার ওপর এক চিলতে টিনের চালা। সেটাও ফুটো করে দিল উল্কার আকস্মিক পতন! হাতুড়িপেটা জীবন জোসুয়ার। কাজ শেষে বিশ্রামে ছিলেন। প্রকাণ্ড শব্দে বিশ্রাম ভেঙে গেল। চোখ তার ছানাবড়া। টিনের চাল ফুটো করে তার ঘরে উল্কার আকস্মিক পতন। দরজা খুলে চেয়ারে সবে গা এলিয়েছেন। তখনই শুনতে পান বিকট আওয়াজ। বাড়িটা যেন মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। চেয়ার ছেড়ে দেখতে পান, মাথার ওপর টিনের ছাউনি ততক্ষণে চৌচির। সেখান দিয়ে উঁকি দিচ্ছে আকাশের তারা। পাথরের গঠনশৈলী সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর পাঁচটা পার্থিব পাথরের মতো নয়। পাথরটি দেখে জোসুয়া অবাক হলেন। একসময় সাহস করে হাতে তুলে নাড়াচাড়া করতে থাকলেন। তখনো সেটি বেশ গরম ছিল। বয়স মাত্র ৩৩। আর সেই উল্কা বদলে দিল জোসুয়ার জীবনযাত্রা।
উল্কাপাত বা তারা খসে পড়া দেখলে মনোবাসনা পূরণের প্রার্থনা করেন অনেকেই। কেউ কেউ ঈশ্বর-দেবতার নাম জপেন। ইন্দোনেশিয়ার মানুষও এ থেকে বাইরে নয়। কিন্তু জোসুয়া সেসব করার সময় বা সুযোগ কোনোটাই পাননি। তিনি যত্ন করে পাথরটা ঘরে তুলে রাখলেন। মোবাইলে পাথরটির একটি ছবিও তুলে ফেললেন। কী মনে হলো একদিন ফেসবুকে সেই ছবিসহ একটি পোস্ট দিয়ে দিলেন তিনি। ছবিটি ভাইরাল হয়ে গেল ইন্দোনেশিয়ায়। তারপর তা ছড়িয়ে পড়ল সারা দুনিয়ায়। নজরে আসে জ্যোতিষ বিজ্ঞানীদের। মার্কিন বিজ্ঞানী তথা মহাকাশসামগ্রীর সংগ্রাহক জারেড কলিন্স পাথরটি কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেন জোসুয়াকে। রাজি হয়ে যান জোসুয়া। বিজ্ঞানীর দাবি, উল্কাটি প্রায় ৪৫০ কোটি বছরের পুরোনো। ওজন ২ কেজি ১০০ গ্রাম। বিক্রির পর জোসুয়ার পরিচিতজনদের কাছ থেকে পাথরের দামের একটি ধারণা লাভ করা যায়। প্রতি গ্রামের দাম ধরা হয় ৬৪৫ পাউন্ড। সেই হিসাবে জোসুয়ার টিন ফুটো করে দেওয়া উল্কার দাম হতে পারে ১৩ লাখ ৫৪ হাজার ৫০০ পাউন্ড, অর্থাত্ বাংলাদেশের টাকার অঙ্কে তা হতে পারে ১৫ কোটি ৩৫ লাখের মতো। জোসুয়া তাতেই ভীষণ খুশি। জোসুয়ার টিন ফুটো করা পাথরটি এখন আর বিজ্ঞানী কলিন্সের হাতে বন্দি নেই। ব্যাবসায়িক স্বার্থে অন্য আর একজন বিজ্ঞানীর হাত ঘুরে তা অ্যারিজোনা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে। সেখানে উল্কাসংক্রান্ত গবেষণার কাজে লাগবে সেটি। তাত্ক্ষণিকভাবে বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই পতিত উল্কার মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি রহস্যের কোনো অজানা তথ্য।
জোসুয়ার টিনের চাল ভেদ করে যে উল্কা পড়ে গেল, তার ব্যাখ্যা বিজ্ঞানীদের কাছে হয়তো আছে। মহাকাশভিত্তিক প্রকৃতির লীলাভূমির একটি অংশ তা, তাতে কারো সন্দেহ থাকার উপায় নেই। তা পৃথিবীর অংশ নয়, আকাশ ভেঙে জোসুয়ার চাল ফুটো করে তার হাতে এসে পৌঁছেছে এই উল্কা। বিশ্ব সৃষ্টির রহস্যে তা কতটুকু কাজ করবে তা হয়তো আরো কিছুদিন পর বোঝা যাবে। কিন্তু তা যে বাস্তব, এ কথা যেমন জোসুয়া বিশ্বাস করেছেন, তেমনি আমেরিকার বিজ্ঞানীরাও বিশ্বাস করেছেন। আমেরিকার উটাহ প্রদেশের স্তম্ভটিও বাস্তব। কেননা, তা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আজ মরুর বুকে। দুই ক্ষেত্রেই রহস্য আছে। পাথরটি জোসুয়ার চাল ছিদ্র করার আগে কোথায় ছিল, কেন খসে পড়ল তা যেমন প্রশ্ন করা যায়, তেমনি আমেরিকার ঐ মরু অঞ্চলে ১২ ফুট লম্বা স্তম্ভ হঠাত্ করে কে বা কারা নির্মাণ করল তা-ও প্রশ্নের সম্মুখীনই হবে। এসব উত্তর কি জানা আছে বিজ্ঞানীদের? নাকি প্রকৃতির কাছে ধরনা ধরার আবশ্যকতা রয়েছে?
ইতিমধ্যে মহাকাশ বিজ্ঞানের সাফল্যে মানুষ চাঁদে পা ফেলেছে। এখন পৃথিবীর ধনী রাষ্ট্রগুলোর তোড়জোড় চলছে চাঁদে বসবাস গড়ার। চাঁদের মালিকানা নিয়েও চলছে দরকষাকষি আমেরিকা, রাশিয়া আর চীনের মধ্যে। এ কাজে অবশ্য পিছিয়ে নেই পৃথিবীর বড় বেসরকারি কোম্পানিগুলোও। পাশাপাশি চলছে মঙ্গল গ্রহ আবিষ্কার আর অধিকারের আয়োজন। পৃথিবীর মানুষ একটু বেশিই এগিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর বাইরে মহাকাশ জগতের দখল নিতে।
ইতিমধ্যে ইসরাইলের মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্রের প্রাক্তন সিকিউরিটি প্রধান হায়েম এশাদ বলেছেন, বাস্তবে এলিয়েনরা রয়েছে। শুধু তাই নয়, গবেষণার জন্য এলিয়েনদের এক সংগঠনের সঙ্গে মার্কিন সরকারের চুক্তিও রয়েছে। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের গতিবিধি জানার জন্য আমেরিকা গবেষণা চালাতে চায়। সেই উদ্দেশ্যেই এলিয়েনদের সঙ্গে মার্কিন সরকারের এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ‘এরিয়া ৫১’ আমেরিকার একটি রহস্যভরা গবেষণাকেন্দ্রের নাম। এশাদ বলতে চেয়েছেন, এই এরিয়া ৫১-তে মার্কিন সরকারের সঙ্গে এলিয়েনদের গবেষণা চলছে। এশাদের এমন বক্তব্য এবং দাবি মহাকাশ নিয়ে রহস্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা না হয় আরো একটু সময় অপেক্ষায় থাকি প্রকৃতির লীলাভূমিতে বিজ্ঞানীরা কতটুকু সামঞ্জস্য করতে পারেন তা দেখার জন্য।
n লেখক :সেনা কর্মকর্তা