পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে আবদুস সামাদ লন্ডন যান। পড়ার কথা ছিল ব্যারিস্টারি। কিন্তু ভর্তি হন ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউটে। আর ফার্স্ট ইয়ারের রেজাল্টে মুগ্ধ প্রিন্সিপাল রবার্ট ডানবার পরের তিন বছরের জন্য তাঁর স্কলারশিপের ব্যবস্থা করে দেন। তাঁর সামনে সুযোগ ছিল সেখানকার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেই ক্যারিয়ার গড়ার। শুরুও করেছিলেন শিক্ষানবীশ চিত্রগ্রাহক হিসেবে। কাজ করেন The Bridge on the River Kwai (1957), Saturday Night and Sunday Morning (1960), The Guns of Navarone (1961) I Yesterday, Today and Tomorrow (1963) ছবিগুলোতে। ১৯৬২ সালে যোগ দেন বিবিসিতে, ক্যামেরাম্যান হিসেবে। কিন্তু এরপরই ফিরে আসেন দেশে। বাবা-মায়ের কথায়।
তবে সিনেমার পোকা মাথা থেকে যায়নি কখনোই। দেশে ফিরে কাজ শুরু করেন চিত্রগ্রাহক হিসেবে। পাশাপাশি পরিকল্পনা করতে থাকেন পরিচালনার। সেজন্য নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানও দাঁড় করান—স্যামরোজ ফিল্মস। ১৯৬৭ সালে কাজী নজরুল ইসলামের ওপর সিনেমা তৈরির কাজ শুরু করেন। চিত্রনাট্য প্রস্তুতও করেছিলেন। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় পাকিস্তানি সামরিক প্রশাসন।
১৯৭০ সালে কাজ শুরু করেন নতুন গল্প নিয়ে। আইল ভাঙার গল্প। জমির মালিকানার সীমা নির্ধারণের জন্য যে পায়ে হাঁটার পথ বা আইল তৈরি করা হয়। হিসেব করে দেখেন, এই আইলের জন্য তখনই সাড়ে নিরানব্বই লাখ একর জমি অনাবাদি থেকে যেত! সেগুলো ভেঙে, একক উদ্যোগ থেকে বেরিয়ে এসে যদি সমবায়ের মাধ্যমে চাষ করা যায়, তাহলে কৃষিজ উত্পাদন অনেকগুণ বাড়ানো সম্ভব। তবে এটাই তাঁর গল্পের একমাত্র বক্তব্য নয়। এই আইল বা বিভাজন রেখার প্রতীকে তিনি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভাজনগুলোকেও তুলে ধরতে চান। বোঝাতে চান এই অনৈক্য কীভাবে সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেল মুক্তিযুদ্ধ। বন্ধ হয়ে গেল আইল ভাঙার গল্প লেখার কাজ।
স্বাধীন বাংলাদেশে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেন আবার। ১৯৭৩-৭৪-এ শেষ করেন আইল ভাঙার গল্পটা। তবে এ যাত্রায় ভূমিব্যবস্থার পরিবর্তনের স্বপ্নের সেই প্রাথমিক গল্পে যোগ হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা। সব মিলিয়ে দৈর্ঘ্য অনেক বড় হয়। এমনিতেই এই উপমহাদেশের গড়পরতা চলচ্চিত্রের দৈর্ঘ্য ইউরোপ-আমেরিকার চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ বেশি। আর আবদুস সামাদের স্বপ্নের গল্পটা হয়ে যায় তারও দ্বিগুণ! আর তাই সেটাকে ভাগ করেন দুই ভাগে। বানান প্রথম সিক্যুয়েল বা পার্বিক চলচ্চিত্র—‘সূর্যগ্রহণ’ ও ‘সূর্য্য সংগ্রাম’। প্রথমটা মুক্তি পায় ১৯৭৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর। দ্বিতীয়টা ১৯৭৯ সালের ২০ এপ্রিল।
দুটো ছবিই বিপুল প্রশংসিত। ঘরে তোলে একগাদা পুরস্কার। দুটোই অংশ নেয় মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে। তখন উত্সবটি এক বছর পরপর হতো। ‘সূর্যগ্রহণ’ অংশ নেয় ১৯৭৭ সালের দশম আসরে। আর ‘সূর্য্য সংগ্রাম’ ১৯৭৯ সালের একাদশে। বাংলাদেশ থেকে প্রাথমিকভাবে পাঁচ চলচ্চিত্রের নাম পাঠানো হয়েছিল— আবদুস সামাদের ‘সূর্য্য সংগ্রাম’, সুভাষ দত্তের ‘ডুমুরের ফুল’, আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘সারেং বৌ’, আজিজুর রহমানের ‘অশিক্ষিত’ ও নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘অলঙ্কার’। শেষ মুহূর্তে যোগ হয় আমজাদ হোসেনের ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’।
সেবার উত্সবে ১১০ দেশ থেকে ৪৬৫টি চলচ্চিত্র জমা পড়ে। জুরি বোর্ড তার থেকে ৩৫টি বাছাই করেন মূল প্রতিযোগিতার জন্য। সেই তালিকায় জায়গা করে নেয় ‘সূর্য্য সংগ্রাম’। সেই প্রথম বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয় কোনো আন্তর্জাতিক উত্সবের মূল প্রতিযোগিতায়।
২২ আগস্ট ‘সূর্য্য সংগ্রাম’ প্রদর্শনের কথা ছিল। কিন্তু কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই সেদিন দেখানো হয় ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’। সে খবর ঢাকায় পৌঁছালে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক। অভিযোগ-পালটা অভিযোগ, বিবৃতি-পালটা বিবৃতি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতিকে স্মারকলিপি পর্যন্ত দেওয়া হয়।
উত্সবে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সভাপতি ছিলেন তত্কালীন তথ্য ও বেতার মন্ত্রী হাবিবুল্লাহ খান। তিনি ১ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকে সাফ বলে দেন, বাংলাদেশের কোনো ছবি প্রতিযোগিতার জন্য মনোনীত হয়নি। ‘সূর্য্য সংগ্রাম’ প্রথমে প্রদর্শনের জন্য মনোনীত হয়েছিল। কিন্তু পরে সিক্যুয়েলের অংশ ও সাদা-কালো বলে উত্সব কমিটিই সে ছবি বদল করে।
পরদিন পালটা সংবাদ সম্মেলনে আবদুস সামাদ প্রমাণসহ হাজির হন। জানান, ‘সূর্য্য সংগ্রাম’ প্রতিযোগিতায় মনোনীত হওয়ার কাগজপত্র উত্সব কমিটি তাঁকে পাঠিয়েছেন। শুধু তাই নয়, সোভিয়েত ‘ফিল্ম আর্ট ম্যাগাজিন’ ছবিটিকে অ্যাপ্রিসিয়েশন সার্টিফিকেটও দিয়েছে। সেটাও সাংবাদিকদের দেখান তিনি। সেখানে উপস্থিত ছিলেন আলমগীর কবির, বাদল রহমানের মতো দেশবরেণ্য পরিচালকরা।
কিন্তু আসল ক্ষতি তো আগেই হয়ে গেছে। প্রতিযোগিতার জন্য মনোনীত হয়েও প্রদর্শিত হতে পারেনি ‘সূর্য্য সংগ্রাম’।