বছরের শেষ দিকে এসে বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। গত ৩ নভেম্বর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। আর প্রথম বার নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন কমলা হ্যারিস। যিনি একই সঙ্গে এশীয় বংশোদ্ভূত এবং কৃষ্ণাঙ্গ।
করোনা মহামারিকালে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনকে বলা হচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বিভক্তিমূলক। এবারের নির্বাচনে গত ১১২ বছরের মধ্যে গড়ে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে। মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন বাইডেন। তিনি ট্রাম্পের চেয়ে ৭০ লাখের বেশি পপুলার ভোট পেয়েছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ৭ কোটিরও বেশি ভোট পেয়ে পরাজিত হয়েছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
করোনার কারণে এবার রেকর্ড ১০ কোটির বেশি আগাম ভোট পড়েছে। যার বেশির ভাগই ছিল ডাকযোগের ভোট। বিভিন্ন রাজ্যে ভোটগ্রহণ ও গণনার সময় ভিন্ন হওয়ার কারণে কে জয়ী হচ্ছেন সেটা জানতে দেরি হয়েছে। কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে লড়াইটা চরম হাড্ডাহাড্ডি হয়েছে। এর মধ্যে পেনসিলভেনিয়া, মিশিগান, জর্জিয়া, অ্যারিজোনা, উইসকনসিন অন্যতম। যেখানে সামান্য ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন বাইডেন। নির্বাচনের চার দিনের মাথায় বাইডেনের জয়ের পূর্বাভাস দেয় মার্কিন গণমাধ্যমগুলো। ভোট গণনার প্রথম দিকে এগিয়ে ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু নির্বাচনে ডাকযোগের ভোট বেশি পড়ায় এবং ভোট গণনা হতে দেরি হওয়ায় পিছিয়ে পড়েন তিনি। পরাজয় যখন প্রায় নিশ্চিত তখন ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তোলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পেনসিলভেনিয়া, জর্জিয়া, মিশিগান, নেভাদা, উইসকনসিন, অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যে জালিয়াতির অভিযোগ তুলে মামলা করে রিপাবলিকান পার্টি ও ট্রাম্পের প্রচারণা টিম। কিন্তু বেশির ভাগ মামলা রাজ্য আদালত ও আপিল আদালত খারিজ করে দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টও একটি মামলা খারিজ করে দিয়েছে। আবারও নির্বাচনের ফল বদলে দিতে একটি মামলা করেছে ট্রাম্প টিম। তবে আইনি লড়াইয়ে ট্রাম্পের সফল হওয়ার সম্ভাবনা তেমন নেই।
আরো পড়ুন: ‘স্পুটনিক ভি’ ভ্যাকসিন নেবেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন
যুক্তরাষ্ট্রে ভোট বেশি পেলেই কোনো প্রার্থী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন না। প্রেসিডেন্ট হতে প্রার্থীকে ২৭০টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট লাগে। শেষ পর্যন্ত বাইডেন পেয়েছেন ৩০৬টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট। আর ট্রাম্প পেয়েছেন ২৩২টি ইলেকটোরাল ভোট। গত ৮ ডিসেম্বর ছিল অঙ্গরাজ্যগুলোর নির্বাচনের ফল সরকারিভাবে প্রত্যয়ন করার শেষ দিন। আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি করে রাজ্যগুলো ঐ দিন ফল প্রত্যয়ন করে। গত ১৪ ডিসেম্বর ইলেকটোরাল কলেজ ভোটরা মিলিত হয়ে ভোট দিয়েছেন। আগামী ৬ জানুয়ারি মার্কিন কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে এই ভোট গণনা হবে এবং সেদিনই জো বাইডেনকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করা হবে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত পরাজয় মেনে নেননি ট্রাম্প। তিনি কখনোই পরাজয় মেনে নেবেন না বলে জানিয়েছেন।
নির্বাচনের আগেই যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক অশ্চিয়তা দেখা দিয়েছিল। সেই উত্তেজনার এখনো অবসান হয়নি। কীভাবে ক্ষমতায় থাকা যায় সেই চেষ্টা করছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এজন্য সামরিক শাসন জারির চিন্তাও রয়েছে তার। সম্প্রতি হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে উপদেষ্টা ও প্রচারণা টিমের সদস্যদের এক বৈঠকে এ বিষয়টি নিয়ে তিনি কথা বলেন। যদিও বৈঠকে ব্যাপক হট্টগোল হয়। বেশির ভাগ উপদেষ্টা এবং কর্মকর্তা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই চিন্তার কঠোর বিরোধিতা করেছেন। তারা ট্রাম্পকে বলেন, এর কোনো সাংবিধানিক হুকুম/কর্তৃত্ব নেই। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হবেন কি না সেটা স্পষ্ট নয়।
প্রেসিডেন্ট সামরিক শাসন জারি নিয়ে আলোচনার কথা অস্বীকার করেছেন। এক টুইট বার্তায় তিনি বলেন, এটি ‘ফেক নিউজ’। তবে প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লাখ লাখ মার্কিনীকে বোঝাতে চাইছেন যে, ভোট জালিয়াতির কারণে তিনি পরাজিত হয়েছেন। তার এই অভিযোগ সমর্থকদের সহিংসতা সৃষ্টিতে ইন্ধন দিতে পারে। আর সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হলে তিনি সামরিক শাসন জারির চিন্তা বাস্তবায়িত করতে পারেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমলের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সাবেক সহকারী মন্ত্রী এলিজাবেথ ন্যুমান বলেন, এখনো রিপাবলিকদের কিছু কট্টর সমর্থক গোষ্ঠী ট্রাম্পকে সমর্থন দিচ্ছেন। যখন তারা দেখবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামরিক শাসন জারির পরিকল্পনা করছেন, তখন তারা সংগঠিত হয়ে সংঘাতমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াতে পারে। যাতে প্রেসিডেন্ট সামরিক শাসন জারির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেন।
আরো পড়ুন: তৃতীয়বারের মতো ফ্রান্সে লকডাউনের সম্ভাবনা
গত ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের পর প্রায় দুই মাস পার হতে চললেও উত্তেজনার অবসান হয়নি। ৬ জানুয়ারি যাতে বাইডেনকে বিজয়ী ঘোষণা না করা হয় সেজন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন ট্রাম্প। রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা যেন ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের বিরোধিতা করেন সেজন্য তিনি বৈঠক করছেন। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব করে কংগ্রেসের অধিবেশন কয়েক ঘণ্টা বিলম্বিত হতে পারে কিন্তু বাইডেনের জয় আটকানো যাবে না। আগামী ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দায়িত্বের শেষ দিন। সংবিধান অনুসারে নতুন প্রেসিডেন্ট ঐদিন দায়িত্ব নেবেন। এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কি করে সেটাই দেখার বিষয়। তাই মার্কিন নির্বাচনের উত্তেজনার রেশ থাকছে নতুন বছরের শুরুতেও।
ইত্তেফাক/এএইচপি