দিনাজপুর শহরের গনেশতলায় যে বাড়িটি এখন খাদেমুল কন্ট্রাক্টরের বাড়ি নামে পরিচিত, সেই বাড়িতে থাকতেন মুক্তিযুদ্ধে শহিদ সাজিরউদ্দীন আহমেদ। তাঁকে জীবন্ত অবস্থায় গাড়ির সঙ্গে বেঁধে গাড়ি চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং চলন্ত গাড়ির সঙ্গে টেনে-হিঁচড়ে, থেঁতলে হত্যা করা হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি চাকরি করতেন ইউনাইটেড ব্যাংকের ডেভেলপমেন্ট অফিসার পদে। সাজিরউদ্দীনের তৃতীয় পুত্র ফারুক আহমেদ (দুখু) মুক্তিযুদ্ধের সময় দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল থেকে দিনাজপুর শহরের পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে এবং অনেকেই নিজ নিজ বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়। বাবা বললেন, পরিস্থিতি ভালো না। সবাই শহর ছেড়ে দিচ্ছে। তোমরাও চলে যাও। মা প্রশ্ন করলেন, তুমি যাবে না? বাবা বললেন, তোমরা যাও, তারপর পরিস্থিতি বুঝে আমিও চলে যাব।’
সাজিরউদ্দীন আহমেদ তাঁর স্ত্রী জোবেদা খাতুনসহ সন্তানদের ইন্ডিয়ায় পাঠিয়ে দেন। তাঁরা সেখানে যাওয়ার দু-তিন দিন পর জানতে পারেন, সাজিরউদ্দীনকে ১৪ এপ্রিল সকাল ৯-১০টার দিকে হত্যা করা হয়েছে।
দিনাজপুর জেলার প্রথিতযশা সাংবাদিক আ হ ম আবদুল বারী ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলা পত্রিকায় দিনাজপুর শহরের গণহত্যা নিয়ে একটি রিপোর্ট করেছিলেন। ঐ রিপোর্টে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, আলবদরের লোকেরা সাজিরউদ্দীনের দুই পা বেঁধে চলন্ত মোটরগাড়ির সঙ্গে বেঁধে দেয় এবং ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে টেনে নিয়ে পুরো শরীর ক্ষত-বিক্ষত করার পর হত্যা করে। সম্প্রতি প্রকাশিত মোজাম্মেল বিশ্বাসের গবেষণাগ্রন্থ ‘গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ’ বইতে লিখেছেন, সাজিরউদ্দীনকে হত্যা করা হয়েছিল পৈশাচিক কায়দায়। এই জেলার আলবদর বাহিনী কতটা নৃশংস ছিল তা এই হত্যাকাণ্ড থেকে প্রমাণিত হয়।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৪ এপ্রিল দিনাজপুর শহর পুনর্দখল করলে বিহারিরা বাঙালিদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খুঁজতে থাকে এবং সাজিরউদ্দীন আহমেদকে পেয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।
আজহারুল আজাদ জুয়েল