শক্তিশালী বিরোধী দলের গুরুত্ব ও জটিলতা

ঊনবিংশ শতকে নিধুগুপ্ত বলিয়া গিয়াছিলেন—‘বিনে স্বদেশী ভাষা মিটে কি আশা?’ একইভাবে গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে বলা যায়—‘বিনে শক্তিশালী বিরোধী দল, গণতন্ত্র পায় কি বল?’ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কোনো কোনো পণ্ডিতের মতে, বাইসাইকেলের মতো গণতন্ত্রের দুইটি চাকা—সরকার ও বিরোধী দল। বিরোধী দল কেবল নামকাওয়াস্তে হইলেই চলে না, ‘শক্তিশালী’ বিরোধী দল হইতে হয়। নচেত্ পাংচার হওয়া সাইকেলের মতো দেশ চলে; কিন্তু ইহার সহিতও অনেকে দ্বিমত পোষণ করেন। অনেকের মতে, তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে যদি বিরোধী দলকে অধিক জায়গা দেওয়া হয়, তাহা হইলে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়া উঠিবার সুযোগ পায়। অন্যদিকে, বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত দেশে আমরা শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতি দেখিয়া থাকি; কিন্তু তাহার পরও সেই সকল দেশ কিন্তু ব্যাপক বাক্স্বাধীনতার সুযোগে সন্ত্রাস জঙ্গিবাদ হইতে মুক্ত হইতে পারিতেছে না।

সুতরাং বিষয়টি বেশ জটিল বটে। ইহার সমাধান এক টানে আঁকিবার মতো নহে। আমরা প্রথমে সংসদীয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার যুক্তরাজ্যের দিকে তাকাইতে পারি। ইতিহাস বলে, ব্রিটেনের পার্লামেন্টে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে সংসদ সদস্যরা রাজার বিরোধিতা, উত্তরাধিকারের অধিকার, পররাষ্ট্রনীতি বা স্পর্শকাতর কোনো বিষয় লইয়া বিতর্ক করিলে তাহাদের কারাবাস ছিল নিশ্চিত। অর্থাত্, অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্বে সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বর্গরাজ্য বলিয়া পরিচিত ব্রিটেনেও শক্তিশালী বিরোধী দলের ধারণার উত্থান হয় নাই। বিরোধী দলের ধারণার উদ্ভবের পূর্বে ‘বিরোধী’দের প্রধান ভূমিকা কী হইবে—তাহা সর্বাগ্রে সুস্পষ্ট করা হয়। এইবার আমরা কিছু দৃষ্টান্তের দিকে মনোযোগ দিতে পারি। অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর মতে, শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকিলে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারসাম্যহীনতা ও স্বচ্ছতার সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে প্রশ্ন হইতেছে, পশ্চিমা উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের জন্য যাহা যথোচিত, তাহা কি তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের জন্যও একইভাবে প্রযোজ্য হইতে পারে? উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের সরকারি দল ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক চরিত্রের সহিত কি তৃতীয় বিশ্বের সরকার ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক চরিত্রের যথাযথ তুলনা টানা চলে? ইহার উত্তর খুঁজিয়া দেখিলে বুঝা যাইবে, তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নের পথে চলিতে চলিতে গণতন্ত্রের রূপ বহুলাংশে ভিন্ন হইয়া যায়। মালয়েশিয়ার কথাই ধরা যাউক। দেশটি ১৯৫৫ হইতে পরবর্তী প্রায় ৬১ বত্সর একমাত্র ‘বারিসান ন্যাশনাল’ দল দ্বারা পরিচালিত এবং শাসিত হইয়াছে একটি দুর্বল বিরোধী দলের বা জোটের বিপরীতে। মাহাথির মোহাম্মদও ১৯৮১ হইতে ২০০৩ পর্যন্ত টানা ২৪ বত্সর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন একটি দুর্বল জোটের বিরুদ্ধে। অথচ তাহার শাসনামলেই মালয়েশিয়া শিক্ষা, বিজ্ঞান ও কারিগরি ক্ষেত্রে একটি আধুনিক এবং অর্থনীতিতে একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়। সিঙ্গাপুরের ক্ষেত্রেও ১৯৫৯ সালে লি কুয়াং ইউ-এর নেতৃত্বে পিপলস অ্যাকশন পার্টি ক্ষমতায় আসিয়া টানা ১৯৮৪ পর্যন্ত দেশ শাসন করে পার্লামেন্টে বিরোধীদলীয় কোনো প্রতিনিধি ছাড়াই। লি কুয়াং ইউ তাহার রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় সিঙ্গাপুরকে তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ হইতে লইয়া যান প্রথম বিশ্বের রাষ্ট্রের কাতারে।

সুতরাং ইহা বলার অপেক্ষা রাখে না—গণতন্ত্র, শক্তিশালী বিরোধী দল, বাক্স্বাধীনতা—এইগুলি এমন কোনো ‘জাদুকরি’ শব্দ নহে, যাহারা তাহাদের সংজ্ঞা অনুযায়ী ঠিকঠাক কাজ করিবেই। বহু পূর্বে মহাত্মা গান্ধী বলিয়া গিয়াছিলেন, ‘স্বরাজ, সু-রাজ তো শুধু স্বশাসন বা স্বাধীনতা নহে, ইহা ব্যাপকার্থে উন্নয়নে বাস্তবোচিত পদ্ধতি গ্রহণ করা।’ অর্থাত্ প্রধান লক্ষ্য জনগণের জীবনমানের ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন। অন্যদিকে বাক্স্বাধীনতার সুযোগে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিলে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। আবার ইহার সহিত শক্তিশালী বিরোধী দলও থাকা দরকার। এই ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার উদাহরণ অধিক প্রাসঙ্গিক, নাকি পশ্চিমা গণতন্ত্র বেশি উপযুক্ত—তাহা সম্পূর্ণত নির্ভর করে একটি দেশের ভূরাজনৈতিক ও জাতিগত বৈশিষ্ট্যের উপর।