প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের আঘাতে নাকাল বিশ্ববাসী। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। দেশের অন্য সব খাতের তুলনায় শিক্ষা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সব থেকে বেশি। মহামারির প্রথম দুই মাস সব অফিস, আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন বন্ধ থাকার পর ধীরে ধীরে সবই খুলে গেছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছুটি বেড়েছে কয়েক দফা। দেশে ব্যাপক হারে করোনা টিকা প্রয়োগ না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আশা করা যাচ্ছে না। তবে পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে টিকা প্রাপ্তির ওপর। উন্নত দেশগুলোতে টিকা আসার খবর পত্রিকায় এলেও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের ভাগ্যে টিকা কবে জুটবে তা এখনো অনিশ্চিত।
শিক্ষা খাতে এই অচলাবস্থার জেরে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজট বেড়ে চলেছে। শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে মূল্যবান একটি বছর—২০২০ সাল। প্রলম্বিত হচ্ছে শিক্ষাজীবন। ভয়াবহ সংকটে পড়েছে কর্মজীবন শুরুর অপেক্ষায় থাকা লাখো শিক্ষার্থী। জার্নাল অব কেমিকেল এডুকেশনে ‘কোভিড-১৯-এর কালে দূরশিক্ষণের পদক্ষেপ, সফলতা ও ব্যর্থতা’ শীর্ষক সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়, করোনা ভাইরাসের কবলে পড়ে বিশ্বব্যাপী ১.৭ বিলিয়ন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ক্ষতির মুখে পড়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তীকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি আর।
অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে রয়েছে উচ্চ মাধ্যমিক শেষে উচ্চশিক্ষা-জীবন শুরু করতে যাওয়া শিক্ষার্থীরাও। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে অনলাইনে পুরোদমে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে অধিকাংশগুলোতে দায়সারাভাবে কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ রয়েছে। পরিতাপের বিষয় হলো, করোনা মহামারির ৯ মাস পরও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমন্বিত কোনো পরিকল্পনার মধ্যে আসতে পারেনি। পৃথকভাবে কার্যকর কোনো উদ্যোগও নিতে পারেনি। অথচ যে কোনো সংকট মোকাবিলায় এসব বিশ্ববিদ্যালয়েরই নেতৃত্ব দেওয়ার কথা। সে উদ্দেশ নিয়েই রাষ্ট্র প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা খরচ করে। সম্পদ ব্যয় করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পেছনে। দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমন্বয়ক সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনও তাদের ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখতে পারছে না। এতে করে নানামুখী সংকট দানা বেঁধেছে। সংকটের চোরাবালিতে আটকে ক্ষতির শিকার হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর তথ্যমতে, দেশে ৪৬টি সরকারি এবং ১০৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা পড়েছেন বিপাকে। দেশের উচ্চশিক্ষায় মোট শিক্ষার্থী ৪১ লাখের ওপর। এর মধ্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ লাখ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ লাখ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৮ লাখ, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫ লাখ এবং ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে আরো ১ লাখ ছাত্রছাত্রী পড়ছেন। করোনায় বিভিন্ন বর্ষের সেমিস্টার, ইনকোর্স ও বর্ষ ফাইনাল পরীক্ষা পিছিয়ে গেছে।
দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কয়েকটি বিভাগের চূড়ান্ত পরীক্ষা চলাকালেই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীসময়ে পরীক্ষা আর শুরু করা যায়নি। এই লেখা প্রস্তুত করার সময়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কয়েকটি বিভাগে পরীক্ষা প্রহণ চলছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অনলাইনে চূড়ান্ত পরীক্ষা গ্রহণের পথে এগোচ্ছে। তবে বৃহত্ পরিসরে কোনো অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। সরকারি বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো করোনা মহামারির অজুহাত দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় বন্ধ রেখেছে। নামকাওয়াস্তে অনলাইনভিত্তিক যতটুকু ক্লাস চালু আছে তা খুব বেশি কার্যকর নয়। কোনো কোনো বিভাগে শিক্ষকরা ক্লাস নিচ্ছেন মনমর্জি মতো। অনেকক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ডিভাইস না থাকা, ইন্টারনেটের দুর্বল সংযোগসহ নানা অজুহাত সামনে আসছে। ব্যবহারিক পরীক্ষা নিয়ে সংকট ঘনীভূত হয়েছে, হচ্ছে। পদার্থ, রসায়ন ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়গুলোর ব্যবহারিক ক্লাস-পরীক্ষা অনলাইনে অনুষ্ঠান সম্ভব হয়ে উঠছে না। সেক্ষেত্রে বড় বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ভালো বিকল্প হতে পারত চূড়ান্ত বর্ষের শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় পরিসরে এনে সামাজিক দূরত্ব মেনে ক্লাস-পরীক্ষা অনুষ্ঠান। আমরা একটু খেয়াল করলে দেখব, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী নিজ নিজ ক্যাম্পাসের আশপাশে অবস্থান করছে। তারা প্রায় প্রতিদিন সোশ্যাল গ্যাদারিংয়ে অংশ নিচ্ছে, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে। তাদের বৃহত্ অংশটি যেহেতু এখন আর বাড়ি-ঘরবন্দি অবস্থায় নেই, তাই তাদের শিক্ষাজীবনের গতিশীলতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলকে একটু ভিন্নভাবে ভাবা উচিত বলে মনে করি।
করোনার হানায় সেশনজট ঝেঁকে বসেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোতেও। স্নাতক সম্মান চূড়ান্ত পর্বের ২ লাখ ২৬ হাজার শিক্ষার্থীর চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হয়ে মাঝপথে তা আটকে যায়। পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় চাকরি পাওয়ার চেষ্টায় পিছিয়ে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। সেশনজটে আটকে থাকলেও শিক্ষার্থীদের বয়স থেমে নেই। ফলে সময় অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের চাকরি পাওয়ার চেষ্টার সময়ও কমে আসছে। এতে করে বেকারত্বের হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর যে পরিমাণ শিক্ষার্থী কর্মজীবনে যোগদানের উদ্দেশে বের হয় সে তুলনায় কর্মের সুযোগ নিতান্তই কম। ফলে বেকারত্বের বোঝা বাংলাদেশ বেশ আগে থেকেই বহন করে চলেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনীতি যে অদম্য গতিতে এগোচ্ছে, সামনের বছরগুলোতে বেকারত্বের হার বেড়ে গেলে সেই অগ্রগতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সার্বিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্রকাঠামো। আর, বেকারত্বের সামাজিক প্রভাব তো আছেই।
জাতিসংঘের উন্নয়ন সংস্থা ইউনাইটেড নেশনস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম বা ইউএনডিপির সাম্প্রতিক এক মানব উন্নয়ন সূচক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০৩০ সালে বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা হবে ১২ কোটি ৯৮ লাখ, যা মোট জনগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশে দাঁড়াবে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশে মাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী তরুণদের এক-তৃতীয়াংশ পুরোপুরি বেকার। গবেষণা বলছে, শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে সম্পূর্ণ বেকার ৩৩ দশমিক ৩২ শতাংশ। বাকিদের মধ্যে পূর্ণকালীন চাকরিতে রয়েছে ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ ও ১৮ দশমিক ১ শতাংশ পার্টটাইম কাজে বা চাকরিতে নিয়োজিত। প্রতিবেদনটি আরো বলছে, শিক্ষা শেষে এক থেকে দুই বছর পর্যন্ত বেকার থাকে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ তরুণ, দুই বছরের চেয়ে বেশি সময় ধরে বেকার থাকে ১৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত বেকার থাকে ১৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
বেকারত্ব আমাদের জন্য বড় এক সংকট। সঙ্গে যোগ হয়েছে করোনার বৈশ্বিক সংকট। এর প্রভাবে বিশ্বের প্রায় সব দেশই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত। তাই দেশের শিক্ষা খাতে চলমান সংকট মেনে নিয়েই আমাদের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। সর্বাগ্রে দরকার সংকট থেকে উত্তরণের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও এর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন। কেননা একটি জাতির ভবিষ্যত্ নির্ধারণ করে শিক্ষা। শিক্ষাকে অবহেলা করে বা সেখানে হযবরল অবস্থা জারি রেখে আমরা খুব বেশি এগোতে পারব না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যেমন—জ্ঞানী, কারিগরি তথা দক্ষ জাতি গঠনে মুখ্য ভূমিকা রাখে, তেমনি এর সঙ্গে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকা নির্বাহের বিষয়টিও জড়িত। তার মানে শিক্ষা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর প্রভাব হয় ব্যাপক-বিস্তৃত।
করোনাই বিশ্বের শেষ সংকট নয়। বিশ্ব ইতিহাসও সেই সাক্ষ্য দেয়। বিশ্বকে আরো বড় সংকটের সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। করোনা মোকাবিলার অভিজ্ঞতা হতে পারে আমাদের সবার জন্য প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক ইতিবাচক শিক্ষা। কোনো দেশের জন্য বিপুল জনগোষ্ঠী কখনো উপহার কখনোবা অভিশাপ। বাংলাদেশ যাতে তার জনগণকে রাষ্ট্রের জন্য উপহার হিসেবে প্রস্তুত করতে পারে সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। বেকারত্বের বোঝা বাড়ার আগেই নতুন নতুন কর্মের সুযোগ তৈরি করতে হবে। উদ্যোক্তা তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সারা দেশে সুলভ ইন্টারনেট ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে এবং প্রযুক্তি সহজলভ্য করতে হবে। তবেই জাতি হিসেবে আমরা আরো বলিষ্ঠভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারব।
n লেখক :সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়