সড়কে অশ্রুপাত বন্ধ হোক

ভোরে উঠে পত্রিকার পাতা ওলটাতেই সবার আগে চোখে পড়ে সড়ক দুর্ঘটনার বীভত্স ছবিগুলো। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর, এমন একটা দিন খুঁজে পাওয়া যাবে না যে দিনটিতে সড়ক দুর্ঘটনায় কারো মৃত্যু ঘটেনি। সড়ক-মহাসড়কগুলোর রক্তের পিপাসা  যেন কোনোক্রমেই থামানো যাচ্ছে না। মৃত্যুর মিছিলে  বৃদ্ধ থেকে তরুণ কেউই বাদ যাচ্ছেন না। নবজাতক শিশু থেকে গর্ভবতী মায়ের মৃত্যুর অসংখ্যবার কারণ হয়েছে নির্মম এই সড়ক দুর্ঘটনা। মাঝে মাঝে কিছু মৃত্যু আমাদের মানবতাকে নাড়া দিলেও অধিকাংশ দুর্ঘটনাগুলো এখন সবার কাছে নিত্যদিনের সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও অশ্রুসিক্ত চোখে দুর্ঘটনাকবলিত পরিবারগুলো বারবার অনুনয় করে, এমনটা যেন আর কখনো না হয়, কারো সঙ্গে না হয়। কিন্তু সময়টা বড় নিষ্ঠুর, আজ অন্যজনকে সমবেদনা জানাচ্ছি পরদিন কিনা নিজেই সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ছি! মৃত্যু মিছিলের এই লম্বা পথটার জন্য বেহাল সড়কই কেবল দায়ী নয় বরং কম-বেশি আমরা সবাই দায়ী। আমাদের অসচেতনতার ফল আমাদের অবশ্যই ভোগ করতে হবে, তাই নয় কি!

এক শীতের সকালে শীত নিবারণে হাল্কা মিষ্টি সূর্যতাপে বাইরে বসে ছিলাম, তবুও শরীরটা কাঁপছিল। উত্তরাঞ্চলের এই প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করেই এক ভিক্ষুককে লক্ষ্য করলাম সাহায্য চাইতে  এসেছে। লক্ষ্য করলাম হুইলচেয়ারে বসা লোকটি পঙ্গু, একটি পা নেই। জিজ্ঞেস করাতেই অশ্রুসিক্ত চোখে বললেন তার পা হারানোর ঘটনা; সড়ক দুর্ঘটনা তার একটি পা কেড়ে নিয়েছে। শুধু পা-টিই নয়, তিনি হারিয়েছেন তার হাসি-খুশিতে ভরপুর এক সচ্ছল পরিবার। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, ‘বাপ! এমনটা যেন কারো সঙ্গে না ঘটে, যদি সেদিনই মইরা যাইতাম তাইলে আজ এই কষ্ট আর করতে হইতো না।’ এমন ঘটনা  কেবল একটি দুটি  নয়, আমাদের চারপাশে অসংখ্য মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে, তাদের খবর আমরা ক’জনই বা রাখি, ক’জনই বা জানি। শারীরিক শ্রম দিয়ে পরিবারের জন্য দুমুঠো ভাত জোগানদাতা এসব মানুষই কিনা হয়ে যান একসময় পরিবারের বোঝা। আজ তাদের দিন যায় মানুষের কাছে হাত পেতে। এমন জীবন কে চায়! কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনার কারণেই ভাগ্যের এমন নির্মম পরিণতি বরণ করে অগণিত  মানুষ।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সংগঠনের করা ২০১৯ সালের সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গেল বছর শুধু সড়ক দুর্ঘটনাই ঘটেছে ৪ হাজার ৭০২টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫ হাজার ২২৭ জন। আহত ৬ হাজার ৯৫৩ জন। ২০১৮ সালে ৩ হাজার ১০৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪ হাজার ৩৯ জন নিহত ও ৭ হাজার ৪২৫ জন আহত হয়েছিল।

এ বছর জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত প্রায় ৪৯৫ ব্যক্তি নিহত হয়েছে এবং ৯৭৫ জনের মতো আহত হয়েছে; যদিও মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দূরপাল্লার যানবাহন বন্ধ ছিল। নভেম্ব্বর মাসে সারা দেশে ৪১৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৩৯ জন নিহত হয়েছে বলে জানা যায় রোড সেফটি ফাউন্ডেশন নামক একটি সংগঠনের সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে।

বিশেষজ্ঞরা এই সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে ১০টি উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেছেন, যেগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব হলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে সব হাইওয়েতে ডিভাইডার নির্মাণ, অযান্ত্রিক ও নিষিদ্ধ যান চলাচল বন্ধে কঠোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, আইনের কঠোর প্রয়োগ, চালক ও যাত্রীসচেতনতা বৃদ্ধি, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালানো বন্ধ ও মাদক সেবন রোধ করতে হবে। নতুন সড়ক নির্মাণে নিরাপত্তার বিষয়টি অগ্রাধিকার দেওয়া, লাইসেন্স দেওয়ার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা, সার্ভিস লেন নির্মাণ, গাড়ির ফিটনেসের জন্য ভেহিকেল ইন্সপেকশন সেন্টার (ভিআইসি) স্থাপন ও গতি নিয়ন্ত্রণে স্পিড লার্নার সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

একটি দুর্ঘটনা, একটি পরিবারের জন্য সারা জীবনের কান্না। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা সমাধানে কেবল হতাহতের পরিবারকে আর্থিক সাহায্যেই সমাধান হতে পারে না। এতে করে বারবার সেই একই কারণে হাজার হাজার পরিবারের অশ্রু ঝরবে। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে দরকার দল-মত নির্বিশেষে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। যেটির নেতৃত্ব অবশ্যই সরকারকে দিতে হবে। সড়কে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা দূর করতে প্রচলিত আইনের সঠিক প্রয়োগ বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলেই কেবল দেশের সবার জন্য সড়ক হবে নিরাপদ, বন্ধ হবে অশ্রুসিক্ত কান্না।

n লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়