টাঙ্গাইলে ধর্ষণের অভিযোগে সদর থানায় মামলা করেন এক নারী। মেডিক্যাল রিপোর্টে ধর্ষণের আলামতও মিলেছে। কিন্তু দেড় মাস পর সেই নারী ২৫ হাজার টাকায় আসামির সঙ্গে সমঝোতা করেছেন, দিয়েছেন আদালতে অঙ্গীকারনামাও। সেখানে ঐ নারী বলেছেন, তিনি তার স্বামীর প্ররোচনায় এই মামলা করেন। মামলার আসামি জামিন বা খালাস পেলে তার কোনো আপত্তি থাকবে না। এমন অঙ্গীকারনামা যুক্ত করে হাইকোর্টে জামিন চান ধর্ষণ মামলার আসামি মো. আলী হোসেন।
এদিকে বাদীর ধর্ষণ মামলা দায়ের ও আপসের ঘটনায় উষ্মা প্রকাশ করেছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আপসের বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা পেলে ঐ নারীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য টাঙ্গাইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এছাড়া উচ্চ আদালতে জামিন আবেদনে বাদীর দাখিলকৃত অঙ্গীকারনামার সত্যতা পাওয়া না গেলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণেরও নির্দেশ দিয়েছে আদালত। বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ারের সমন্বয়ে গঠিত অবকাশকালীন ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল সোমবার এই আদেশ দেন। আদালত বলেছে, বিদ্যমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের মামলা আপসের সুযোগ নেই।
গত ১৩ অক্টোবর বিদ্যমান নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধন এনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করে সরকার। টাঙ্গাইলে ধর্ষণের ঘটনাটি ঘটে আইন সংশোধনের পর। ধর্ষণের শিকার নারী যাতে বিচার না পায় সেজন্য নানা কৌশলের আশ্রয় নেয় আসামিপক্ষ, যা হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চের এক রায়ের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। সেখানে হাইকোর্ট বলেছে, আমাদের অভিজ্ঞতা হলো যে, ধর্ষণসংক্রান্ত মামলার আসামিরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেপরোয়া ও দুর্দান্ত প্রকৃতির। এরা ভিকটিম ও তার পরিবারের ওপর চাপ-প্রভাব বিস্তার করে আদালতে সাক্ষ্য প্রদানে ভয়ভীতি, প্রলোভনসহ বিভিন্ন ধরনের কূটকৌশল অবলম্বন করেন। ক্ষেত্রবিশেষে সালিশের নামে সামাজিক বিচার করে ভিকটিম ও তার পরিবারকে মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য এবং আদালতে সাক্ষ্য প্রদানে বিরত থাকার জন্য চাপ প্রদান করে থাকে। এজন্য সাক্ষী সুরক্ষার আইন প্রণয়ন দরকার।
গত ২২ অক্টোবর টাঙ্গাইলের সারুটিয়ায় ভাড়া বাসায় রাত ৮টার দিকে ধর্ষণের শিকার হন ঐ নারী। এ ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) ধারায় আলী হোসেনের বিরুদ্ধে সদর থানায় মামলা করেন তিনি। মামলার এজাহারে বলা হয়, বাসা পরিবর্তনের সময় আমার স্বামীকে ১ হাজার টাকা ধার দেয় আসামি। এই টাকা নেওয়ার জন্য আসামি বিভিন্ন সময়ে বাসায় আসত। স্বামী বাসায় না থাকার সুযোগে সে জোরপূর্বক আমাকে ধর্ষণ করে।
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত চলছে। এমতাবস্থায় গত ৮ ডিসেম্বর আসামির সঙ্গে ২৫ হাজার টাকায় আপস করে অঙ্গীকারনামা দেন বাদী। সেখানে তিনি বলেছেন, আলী হোসেন পাওনা ১ হাজার টাকার জন্য বাসায় আসলে আমার স্বামীর সঙ্গে তার ঝগড়া হয়। যার সূত্র ধরে তার বিরুদ্ধে স্বামীর কথায় বাধ্য হয়ে মিথ্যা মামলা করি। পরে স্থানীয় মাতবর, ব্যক্তিবর্গ এবং আইনজীবীর পরামর্শে মামলাটি আপস-মীমাংসা করি। এই আপসের কারণে আসামিপক্ষ আমাকে ২৫ হাজার টাকা প্রদান করে। আসামির বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নাই। অঙ্গীকারনামামূলে মামলাটি নিষ্পত্তি হলে আমার কোনো আপত্তি থাকবে না।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মনিরুল ইসলাম এবং আসামিপক্ষে মো. মজনু মোল্লা শুনানি করেন। শুনানি শেষে হাইকোর্ট আসামিকে আট সপ্তাহের জামিন দেয়। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টাঙ্গাইল সদর থানার এসআই মো. মুনীরুজ্জামান মুন্সী ইত্তেফাককে বলেন, আপসের বিষয়টি জানি না। মেডিক্যাল রিপোর্টে ধর্ষণের আলামত মিলেছে। শিগিগরই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচতেই হয়তো চাপ প্রয়োগ করে আসামি বাদীর কাছ থেকে এই অঙ্গীকারনামা আদায় করেছেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে যারা আপসরফায় যুক্ত ছিল তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। নইলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।