বাংলাদেশের বিভিন্ন উপজেলায় অবস্থিত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিত্সাব্যবস্থা লইয়া অভিযোগের অন্ত নাই। প্রথম অভিযোগটা হইল ডাক্তার-নার্স নাই। থাকিলেও পর্যাপ্তসংখ্যক নাই। প্রয়োজনীয় চিকিত্সা-সরঞ্জাম বা যন্ত্রপাতি নাই। থাকিলেও তাহা অপর্যাপ্ত কিংবা যন্ত্রপাতি চালাইবার মতো টেকনিশিয়ান নাই। জনবলের অভাবে হাসপাতালের নূতন মেশিনারিজ অব্যবহূত থাকিতে থাকিতে নষ্ট হইয়া পড়িতেছে—এমন খবরও প্রকাশিত হয় পত্রপত্রিকায়। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যেমন—ইত্তেফাকের খবরে প্রকাশ, দিনাজপুরের খানসামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যাম্বুলেন্স আছে; কিন্তু চালক নাই। এই হাসপাতালের তিনটি অ্যাম্বুলেন্স রহিয়াছে; কিন্তু দেড় বত্সর ধরিয়া অ্যাম্বুলেন্সের চালক না থাকায় সময়মতো চিকিত্সাসেবা নিতে পারিতেছেন না রোগীরা। ইহাতে প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্সের জন্য রোগীর আত্মীয়স্বজনের ছুটাছুটি করিতে হয়। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে রোগী পরিবহন বাবদ খরচ কম। পক্ষান্তরে প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্সে খরচ তুলনামূলকভাবে অধিক। ফলে সরকারি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সের কার্যকারিতা না থাকায় রোগীর স্বজনদের অতিরিক্ত অর্থ ও সময় ব্যয় করিতে হয়। চিকিত্সাসেবা নিতে বিলম্ব হওয়ায় অনেক সময় রোগী পথিমধ্যে মৃত্যুবরণও করিয়া থাকে।
লক্ষ লক্ষ ট্যাক্সের টাকা দিয়া ক্রয় করা সরকারি অ্যাম্বুলেন্স কেন গ্যারেজে বা খোলা আকাশের নিচে পড়িয়া থাকিবে, তাহা একটি বড় প্রশ্ন। এইভাবে অলস পড়িয়া থাকিতে থাকিতে একসময় গাড়ির যন্ত্রাংশ নষ্ট হইয়া যায়। ইহা কি দেখিবার কেহ নাই? নিশ্চয়ই ইহার কর্তৃপক্ষ আছেন; কিন্তু তাহাদের সীমাহীন দায়িত্ব অবহেলার জন্যই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সরকারি হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হইলে কেন যথাসময়ে চালক নিয়োগ দেওয়া হইবে না? চালক ছাড়া কোনো গাড়ি কি এমনিতেই চলিতে পারে! ইহা কি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জানা নাই? খানসামা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা অ্যাম্বুলেন্সের চালকের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিত ও মৌখিকভাবে জানাইয়াছেন; কিন্তু তাহার পরও কেন কাজ হইতেছে না? বিষয়টি কি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জানা নাই? তাহারা কেন বসিয়া আছেন? জনগণের ভালোমন্দ দেখভাল করিবার দায়িত্ব যাহাদের, তাহারা যখন উদাসীন হইয়া পড়েন, তখন বিভিন্ন ব্যবস্থাপনায় একের পর এক সমস্যা দেখা দিতে থাকে। এইখানে স্থানীয় প্রশাসনে শৃঙ্খলাবোধেরও অভাব রহিয়াছে। জনগণের সমস্যাকে কেহ গুরুত্ব দিয়া আমলে লইতেছেন না। বিভিন্ন আবেদন-নিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের টেবিলে রাখা স্তূপীকৃত ফাইলের মধ্যে আটকা পড়িয়া থাকে। এমনও অভিযোগ রহিয়াছে যে, সরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালগুলি যাহাতে অকার্যকর থাকে, এই জন্য একশ্রেণির প্রাইভেট ক্লিনিক-হাসপাতালের মালিক সিন্ডিকেট তৈরি করিয়া নানা অপকর্ম চালায়। তাহারা সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার-নার্স এমনকি কর্মকর্তাদের উেকাচ প্রদানের মাধ্যমে বাগে আনিয়া তাহাদের যন্ত্রপাতি অব্যবহূত অথবা অকেজো বা নষ্ট করিয়া রাখিতে উত্সাহিত বা সাহায্য করে। এই যোগসাজশের কারণেও বত্সরের পর বত্সর সরকারি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি অবহেলায় পড়িয়া থাকে। জনবল নিয়োগে ইচ্ছাকৃতভাবে গড়িমসি করা হয়। আবার কখনো কখনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণেও কালক্ষেপণ হইয়া থাকে।
অ্যাম্বুলেন্স চিকিত্সাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষজ্ঞ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলিতে ইহার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। দূরদূরান্তের এলাকা হইতে রোগী আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে অ্যাম্বুলেন্স-সেবার সুব্যবস্থা থাকা একান্ত দরকার। আবার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলিতে প্রাথমিক চিকিত্সাসেবা দেওয়ার পর উন্নত ও বিশেষায়িত চিকিত্সার জন্য প্রয়োজন জেলা বা বিভাগীয় হাসপাতালে রোগীকে স্থানান্তর করা। এই সময় রোগীদের বহনের জন্য অ্যাম্বুলেন্স একান্ত জরুরি; কিন্তু তাহা সচল না থাকিলে ও সুলভ না হইলে এই সেবা কীভাবে গ্রহণ করা সম্ভব? সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে আজ মানুষের দুর্ভোগ বহুগুণে বাড়িয়া গিয়াছে। এইখানে নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতা তৈরি করাই এখন জরুরি কাজ হইয়া পড়িয়াছে।