এই মুহূর্তে বিশ্বে করোনায় মোট মৃত্যু ১৭ লাখ ৮১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আক্রান্ত ৮ কোটি ১৬ লাখের বেশি। কোভিড মোকাবিলায় ব্যর্থতার জেরেই আমেরিকায় এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প হেরে গেছেন বলেই অনেকের ধারণা। ইউরোপের অনেক দেশেই দ্বিতীয় বারের মতো লকডাউন চলছে। দিন যতই যাচ্ছে, আমেরিকা-ইউরোপসহ বিশ্বের অনেক শক্তিধর দেশের অর্থনীতির করুণ চিত্র ততই ফুটে উঠছে। পার্শ্ববর্তী দেশ পাকিস্তান, ভারতের অবস্থাও খারাপ। এই কোভিডে ভারতে মোট মৃত্যু ১ লাখ ৪৮ হাজার, আক্রান্ত ১ কোটি ২ লাখ ২৪ হাজারেরও বেশি। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশে মোট মৃত্যু ৭ হাজার ৪০০ জন, আক্রান্ত ৫ লাখ ১০ হাজারের মতো।
সম্প্রতি আমেরিকার ডাটাভিত্তিক জনপ্রিয় মিডিয়া ব্লুমবার্গ করোনা মোকাবিলায় সক্ষমতার ভিত্তিতে বিশ্বের দেশগুলোর ওপর একটি জরিপ চালিয়েছে। জরিপে পাকিস্তান ২৯তম, যুক্তরাজ্য ৩০তম এবং খোদ আমেরিকার অবস্থান ৩৭তম। যেখানে ভারতের অবস্থান ৩৯তম। এছাড়া বাংলাদেশের নিচে রয়েছে জার্মানি, মালয়েশিয়া, রাশিয়া, সুইজারল্যান্ড, মিশর, সুইডেন, ইরান, ইরাক, ইন্দোনেশিয়াসহ ১৮৫টির মতো দেশ। আর বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে থাকা দেশগুলোর মধ্যে ২০তম অবস্থানে উঠে এসেছে। এর থেকেও বড় সংবাদ হচ্ছে, এই জরিপে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় সব দেশের ওপরে অবস্থান করছে। দেশের মানুষ তো বটেই, খোদ বিশ্ববাসীই অবাক হয়েছে কোভিড মোকাবিলায় বাংলাদেশের এত বড় সাফল্য দেখে। এমন নয় যে, ব্লুমবার্গ কেবল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্থান দেখেই এই র্যাংকিং করেছে, বরং প্রতিষ্ঠানটি জরিপ চালিয়েছে অন্তত কোভিডের ১০টি মেট্রিকসের ওপর, যেখানে ছিল কোভিডে মৃত্যুর হার, কোভিড পরীক্ষায় সুবিধাদি, জনবল, স্বাস্থ্য সেবাদানের সক্ষমতা, চলাফেরা নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসব গুরুত্বপূর্ণ মেট্রিকস থেকে বিশ্বের সব দেশের মধ্যে ২০তম অবস্থান ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম হওয়াটা নিঃসন্দেহে অলৌকিক কোনো ঘটনায় হয়নি।
জনসংখ্যা, আয়তন বা আর্থিক সক্ষমতা কিংবা জনবল, কারিগরি সুযোগ-সুবিধা যেদিকেই বলি না কেন, বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে উল্লিখিত ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোর নিচে অবস্থান করছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫৪ লাখের মতো। সেই তুলনায় আমেরিকার ৩৩ কোটি, যা বাংলাদেশের থেকে দ্বিগুণেরও কিছুটা কম। অথচ কোভিড আক্রান্ত বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৪০ গুণ বেশি। ব্রাজিলের জনসংখ্যা ২১ কোটির মতো, যা বাংলাদেশের থেকে সামান্য বেশি অথচ করোনায় আক্রান্ত বিবেচনায় বাংলাদেশ থেকে ১৫ গুণ বেশি। ইউরোপের প্রায় সব দেশেরই বাংলাদেশের থেকে জনসংখ্যা কম অথচ আক্রান্ত ও মৃত্যুতে বাংলাদেশ থেকে বহুগুণ বেশি তাদের। যুক্তরাজ্যে জনসংখ্যা মাত্র ৬ কোটি অথচ কোভিডে আক্রান্ত ২৩ লাখ। জনসংখ্যায় যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের অর্ধেকেরও অনেক কম। অথচ বাংলাদেশ থেকে করোনায় মৃত্যু ১০ গুণেরও বেশি। ফ্রান্সে জনসংখ্যা সাড়ে ৬ কোটি। কোভিডে আক্রান্ত সাড়ে ২৫ লাখ, যা বাংলাদেশ থেকে ৫ গুণ বেশি, আর মৃত্যুতে ৯ গুণ বেশি। অথচ এই দেশগুলোর সক্ষমতা বা আর্থিক ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশ থেকে বহুগুণ বেশি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের জনসংখ্যা ১৩৮ কোটি, যা বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৭ ভাগ বেশি। ভারতে করোনায় মোট আক্রান্ত ১ কোটিরও বেশি, মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের। ভারতের সাথে আমাদের আবহাওয়াগত মিল থেকে শুরু করে সব দিকেই মিল রয়েছে, অথচ ভারতে মৃত্যু বাংলাদেশের থেকে ২৯ গুণ বেশি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কোন জাদুশক্তির বলে বিশ্বের অর্থনৈতিক শক্তিধর ও পরাক্রমশালী দেশগুলোকে পেছনে ফেলে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হলো? কোভিডের এই বিপর্যয়ে বিশ্বের মেগা শক্তিধর দেশগুলো যেখানে অর্থনৈতিকভাবে জিরো থেকে মাইনাস প্রবৃদ্ধিতে চলে যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ বৃদ্ধি রয়েছে। বৈদেশিক রেমিটেন্স এই কোভিড মহামারির সময়ে অতি আশ্চর্যজনকভাবে সর্বোচ্চ এসেছে।
অবশ্যই এমনি এমনি বা কোনো অদৃশ্যশক্তির বলে বাংলাদেশের এই অর্জন সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এই দেশে কোভিডের মতো এত বড় বিপর্যয় সামলানো মোটেও সহজ কাজ ছিল না। অবশ্যই দেশের চিকিত্সা খাত, দেশের প্রশাসন এবং দেশের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত সঠিক ও সময়োপযোগী ছিল।
অনেকেই বলে থাকেন, আবহাওয়াগত সুবিধার কারণে বাংলাদেশ কোভিড মোকাবিলায় এতটা সফল হয়েছে। কিন্তু এই একই আবহাওয়া নিয়ে ভারত বর্তমানে বিশ্বে আক্রান্তের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। অর্থনৈতিকভাবে ভারতের করুণ অবস্থা যাচ্ছে। করুণ অবস্থা যাচ্ছে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেরই।
ভ্যাকসিন সংগ্রহের দিক দিয়েও বাংলাদেশ অনেক দেশকেই চমকে দিতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ গত ৫ নভেম্বর ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করায় ধরে নেওয়া হচ্ছে, জানুয়ারি ২০২১ অথবা ফেব্রুয়ারির শুরুতেই বাংলাদেশে ৩ কোটি অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন চলে আসবে। এই কাজই মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো করতে পারেনি।
দেশের কোভিড নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে জোরালো ভূমিকা ছিল হাসপাতালে চিকিত্সা ব্যবস্থাপনা, টেলিমেডিসিন সেবা, সঠিকভাবে প্রচারণা ও প্রশাসনিক দক্ষতা। আর অবশ্যই সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শিতা। অন্য দেশগুলো কোভিডকে অবহেলা করেছে। কোভিডকে ‘চায়না-ভাইরাস’ বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে। বাংলাদেশ শুরু থেকেই দায়িত্ব নিয়ে কোভিড মোকাবিলা করেছে। দেশের স্বাস্থ্য খাতকে প্রস্তুত করে রেখেছে। দেশের স্বল্প পুঁজি নিয়ে সঠিক পন্থায় করণীয় ঠিক করে যেভাবে এই পৃথিবী কাঁপিয়ে দেওয়া করোনা মোকাবিলা করে যাচ্ছে, এটি কেবল বিরলই নয়; এটি সত্যিই ভবিষ্যত্ বাংলাদেশের জন্য এক বিরাট পাওয়া।
n লেখক :সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়