ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ মানুষের সেবায় নিয়োজিত এক ব্যক্তিত্ব। এই শতাব্দীর শুরুর দিকে দেশে যখন ডেঙ্গু জ্বর একটি আতঙ্কের নাম, তখন জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অসংখ্য রোগীকে সফলভাবে চিকিত্সা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছিলেন তিনি। দেশে করোনার সংক্রমণ শুরুর পর থেকেও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত এই চিকিত্সক সব সময় দেশের মানুষকে সাহস জুগিয়েছেন। চিকিত্সা দিয়েছেন। পরে তিনি নিজেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। কথোপকথনে তিনি জানাচ্ছেন তার করোনাজয়ের গল্প। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন আসিফুর রহমান সাগর।
ইত্তেফাক :আপনি করোনা মহামারির এই সময়ে সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে পুরো দেশের মানুষকেই পথনির্দেশনা দিয়ে চলেছেন। আপনি কীভাবে আক্রান্ত হলেন?
ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ :দেশে করোনা মহামারি শুরুর সময় মার্চ থেকেই রোগী দেখেছি। সব সময় সুরক্ষা নিয়েই হাসপাতালে গিয়েছি। চেম্বারে গিয়েছি। ধারণা ছিল, আমার সুরক্ষাব্যবস্থা ঠিক ছিল। কিন্তু তার পরও কোন ফাঁকে যে আক্রান্ত হয়ে গেলাম বুঝতে পারিনি। সে জন্যই আমরা সবাইকে সচেতন থাকতে বলি। আমরা চিকিত্সকদের রোগীর কাছাকাছি যেতেই হয়। যারা নার্স, তাদের তো সব সময় রোগীকে আগলে রাখতে হয়। আমাদের ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয়। সবাইকে ঘরে থাকার কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু চিকিত্সকদের তো সেটা করলে চলবে না। করোনা ঝুঁকির মধ্যেও আমি রোগী দেখতে ভয় পাই নাই, রোগী দেখেছি।
ইত্তেফাক :এ পরিস্থিতিতে অনেক চিকিত্সকই চেম্বার বন্ধ করে দিয়েছেন।
ডা. আবদুল্লাহ :করোনা ভাইরাস এক অদৃশ্য শক্তি। অনেকে ভয় পাচ্ছিল। ভয় পাওয়াটা অমূলক নয়। আমি আল্লাহর ওপরে ভরসা রেখে গিয়েছি। মিডিয়াতেও জনগণকে আশ্বস্ত করতে, তাদের ভয়ভীতি দূর করতে সাহস দিয়েছি। এ এমন এক রোগ, যার চিকিত্সা পদ্ধতি খুঁজে পাওয়া যায়নি এখনো। এর মাঝেই করোনা রোগীর চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। পুরো পৃথিবীর করোনা সংক্রমণের দিকে যদি খেয়াল করি, তাহলে দেখা যায় বাংলাদেশের অবস্থা খুব ভালো। প্রথম দিকের কিছুটা সময় বাদ দিলে বাংলাদেশের সরকার ও চিকিত্সকেরা করোনা পরিস্থিতি খুব ভালো সামাল দিয়েছেন। শারীরিক অন্য সমস্যা না থাকলে চিকিত্সকেরা বাংলাদেশে ৮০ শতাংশ রোগীকে ভালো করে তুলেছেন। এজন্য দেশের চিকিত্সকদের আমরা কৃতজ্ঞতা জানাতে পারি।
ইত্তেফাক :করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর কেমন লাগছিল? কী ধরনের সুরক্ষা নিলেন? :ডা. আবদুল্লাহ :আমার ডাস্ট এলার্জি রয়েছে। ফলে যখন কোভিড-১৯-এ সংক্রমিত হই, তখন প্রথমে বুঝতে পারি নাই। পরে শরীরে ব্যথা বাড়ছে। ক্লান্তি লাগছিল। জ্বর ছিল। তখন প্রধানমন্ত্রীর অফিসে টেস্ট করাই। পজিটিভ হলে হাসপাতালে ভর্তি হই। কারণ আমার বয়সটা বেশি, সব সময় চিকিত্সকদের নজরে থাকা জরুরি। আক্রান্ত হওয়ার পর একটু খারাপ লাগছিল সত্যি, তবে ভয় পাইনি। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ছিল আর চিকিত্সার যা যা দরকার তা নিয়েছি। দুশ্চিন্তার কারণে ঘুম হয় নাই, কিছু খেতে পারছিলাম না। কিন্তু ভয় পাই নাই।
ইত্তেফাক :মানসিক অবস্থা কেমন ছিল? :ডা. আবদুল্লাহ :আমি খুব ভাগ্যবান, ৮০ শতাংশ করোনা রোগীর মতো কোনো জটিলতা ছাড়াই ভালো হয়ে গেছি। এর সঙ্গে অসংখ্য মানুষ আমার জন্য দোয়া করেছেন। মসজিদে মসজিদে মোনাজাত করেছেন। তাদের দোয়ার বরকতে আল্লাহর রহমতে আমার কোনো জটিলতা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব সময় আমার শারীরিক পরিস্থিতি ও চিকিত্সার খোঁজখবর নিয়েছেন। এত ব্যস্ত মানুষ। সারা দিন দেশের নানা কাজে নিয়োজিত থাকেন। এর ফাঁকে তিনি যে আমার খোঁজ নিয়েছেন, এটাও আমার জন্য অনেক বড়ো পাওয়া। সবার দোয়ায় আমি ভালো হয়ে গেলাম।
ইত্তেফাক :নিজের করোনাজয়ের অভিজ্ঞতা কীভাবে বর্ণনা করবেন?
ডা. আবদুল্লাহ :করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি ও অন্যান্য শিষ্টাচার কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে সবাইকে। মনে রাখতে হবে, আমরা যুদ্ধ করছি অদৃশ্য এক শক্তির বিরুদ্ধে। তাকে নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল করার ওষুধ এখনো আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। আতঙ্কিত যেমন হওয়া যাবে না, তেমনি অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে ভেবে হালকাভাবে নেওয়াও যাবে না। সব সময় সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ও মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে হবে—পরিবারের প্রতিটি সদস্যের। অনেকে ভাবছেন, টিকা বের হলেই এ রোগ নির্মূল হবে, তা কিন্তু নয়। টিকা আসার পরেও আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। এটা সবাইকে বুঝতে হবে।