এই ধরিত্রীতে মহামারি একটার পর একটা এসেছে এবং চলেও গেছে। আবার কিছু মহামারির গুরুত্ব হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু ২০২০ সালে এমন মহামারি আসল যা পুরো বিশ্ব এবং এর বাসিন্দাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। বিশ্বের ক্ষমতাবানদেরও ছেড়ে দিচ্ছে না। একদিকে মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে কোনো বাছবিচার ছাড়াই, অন্যদিকে অর্থনীতিকে ধ্বংসের পথে নিয়ে মানুষকে পথে বসিয়ে দিচ্ছে। তবে কেবল যে ক্ষতি করছে তাই নয়, এই করোনাই আবার বিজ্ঞানকে দ্রুত উন্নতি করেছে। অবনতি ঘটিয়েছে গবেষণার। ভাইরাস বিশেষজ্ঞদের ঘরে বসে থাকতে দেয়নি। অর্থাত্ মানুষের স্বাভাবিক জীবন-যাপনকে দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত করে এক মহা আতঙ্ক হয়ে উঠেছে করোনা মহামারি।
উত্পত্তি নিয়ে এখনো সংশয়
বড় উদ্বেগের বিষয়, অজানা এই ভাইরাসের উত্পত্তি এবং এর প্রকৃতি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি বিশেষজ্ঞরা। সরকারি হিসাবে করোনা মহামারি শুরু হয়েছিল গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর। চীনের উহান নগরীর স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ শ্বাসযন্ত্রে সংক্রমণ ঘটায় এমন এক ভাইরাসের ব্যাপারে সতর্কবার্তা জারি করে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজেজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এর ‘ক্লিনিক্যাল ইনফেকশাস ডিজিজ’ নামের এক গবেষণায় দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর হতে এ বছরের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ব্ল্যাড ব্যাংকে নিয়মিত রক্ত দিয়েছেন এমন ৭ হাজার ৩৮৯ জনের মধ্যে ১০৬ জনের রক্তের নমুনায় করোনার অ্যান্টিবডি ছিল। কোনো ব্যক্তির রক্তে অ্যান্টিবডি থাকার মানে তিনি একটি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং সেই ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা চেষ্টা করেছিল।
এক আতঙ্কের নাম করোনা
পৃথিবীতে এর আগেও মহামারি ছিল। কিন্তু এতটা ভয়াবহ ছিল না। ধনী, গরিব, মধ্যবিত্ত কাউকে ছাড় দিচ্ছে না করোনা। পৃথিবীর এমন কোনো স্থান নেই, যেখানে করোনা হানা দেয়নি। অথচ অন্যান্য ভাইরাস বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অঞ্চল ভিত্তিক ছিল।
বিউবনিক প্লেগ এখনো আছে। তিনবার মহামারি হিসাবে দেখা দিয়েছে। প্রথমবার হয় ৫৪১ খ্রিষ্টাব্দে। গুটি বসন্ত মহামারি হিসাবে প্রথম দেখা যায় ১৫২০ সালে। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে স্থানীয় পর্যায়ে মহামারি হিসাবে কলেরা ছড়িয়েছিল। ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারি হিসাবে ছিল ১৮০০-২০০০ সাল পর্যন্ত। তবে ‘স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা’ নামে পরিচিত ইনফ্লুয়েঞ্জার সবচেয়ে প্রাণঘাতী মহামারি দেখা দেয় ১৯১৮ সালে। এতে সারা বিশ্বে ৫ থেকে ১০ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। এইচআইভি/এইডস মহামারি ১৯৮১ সালে প্রথম দেখা দিয়েছিল। এইচআইভি মানবদেহের তরল পদার্থ যেমন রক্ত ও লালা ইত্যাদির মাধ্যমে ছড়ায়। সারা বিশ্বে এই রোগে ৩ কোটির বেশি মানুষ মারা গেছে।
বাদ যাননি তারকারাও
করোনা ভাইরাসে শত শত তারকা আক্রান্ত এবং মারা গেছেন। মারা গেছেন ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি, সাবেক ফরাসি প্রেসিডেন্ট ভ্যালারি গিসকার্ড, ইসওয়াতিনের (সাবেক সোয়াজিল্যান্ড) প্রধানমন্ত্রী অ্যাম্ব্রুস মান্ডভুলো, সোমালিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নূর হাসান হোসেইন, বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র তারকা, শেফসহ অনেকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে করোনা। এছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার স্ত্রী ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বলসেনোরো, ব্রিটেনের প্রিন্স চার্লস থেকে শুরু অনেক রাজনৈতিক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। হলিউড তারকা টম হ্যাঙ্কস ও তার স্ত্রী রিতা উইলসন, পপ শিল্পী ম্যাডোনা, দৌড়বিদ উসাইন বোল্ট, টেনিস তারকা ডিজোকোভিক, বাংলাদেশের ক্রিকেট তারকা মাশরাফি বিন মর্তুজা এবং পাকিস্তানের ক্রিকেটার শহিদ আফ্রিদিও করোনার কবলে পড়েছিলেন।
কমিয়েছে মানুষের বন্ধন
করোনা এতটাই আতঙ্কের যে, করোনার ভাইরাসের হানার প্রথম দিকে নিজের পিতাকে কবর দেয়নি সন্তান। গর্ভধারিণী মাকে রাস্তায় ফেলে রেখেছে প্রিয় সন্তানেরা। কয়েকটি দেশ বাদে প্রায় সব দেশই লকডাউন দিয়ে মানুষের স্বাভাবিক জীবন-যাপন বন্ধ করে দেয়। শারীরিক দূরত্বের নির্দেশনা কমিয়েছে সামাজিক দূরত্বও। মানুষের মধ্যে স্বার্থপরতা বেড়েছে। কারণ নিজের জীবন বাঁচানোই দায়! মুখে মাস্ক সামনাসামনি কথা বললেও পরিচিতজনকে চেনা যায় না। ব্যতিক্রম বাদে ধনীরা আরো বেশি স্বার্থপর হয়েছেন। ধনী দেশগুলো বেশি করে করোনা পরীক্ষার কিট কেনায় গরিব দেশগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে পায়নি। এমনকি টিকা ক্রয় নিয়েও বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। প্রভাবশালী দেশগুলোর সরকার প্রচুর টাকার টিকা কেনায় বিপদে নিম্ন আয়ের দেশগুলো। অথচ নেদারল্যান্ডসের ইউনিভার্সিটি অব মেডিক্যাল সেন্টার ইউট্রেচটের আইসিইউ বিশেষজ্ঞ লেনি ডেরডে জানান, কেবল টিকার দ্বারা এই মহামারির সমাপ্তি ঘটানো সম্ভব নয়। এজন্য চিকিত্সার ওষুধ ও অন্যান্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থাদিও থাকতে হবে।