যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন

গণতান্ত্রিক দেশে স্বৈরতন্ত্রের ছায়া!

ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য গর্ব করে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রসারের অন্যতম বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরও তারা; কিন্তু সেই যুক্তরাষ্ট্রে এবার পর্যুদস্ত গণতন্ত্র! দেশটিতে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকবে কি না—তা নিয়েও অনেকে সন্দিহান। এর কারণ বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের ফল এখনো মেনে নেননি। ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তুলে তিনি এখনো ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করছেন। শেষ চেষ্টা হিসেবে তিনি সামরিক শাসন জারি করতে পারেন—এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এর মাধ্যমে ট্রাম্পের স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতার পরিচয় প্রকাশ পাচ্ছে!

গত ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এবারের নির্বাচনকে মার্কিন ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কারণ গত চার বছরে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিনিদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেছেন। শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা মাথাচাড়া দিয়েছে। বিশ্বে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ধারাও বদলে গেছে। তার সময়ে বিশ্বের স্বৈরশাসকরা আরো শক্তিশালী হয়েছে। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে সবার আগে রাখতে গিয়ে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।   

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ৭ কোটিরও বেশি ভোট পেয়ে পরাজিত হয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। আর প্রথমবার নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন কমলা হ্যারিস। যিনি একই সঙ্গে এশীয় বংশোদ্ভূত এবং কৃষ্ণাঙ্গ।  করোনার কারণে এবার রেকর্ড ১০ কোটির বেশি আগাম ভোট পড়েছে। যার বেশির ভাগই ছিল ডাকযোগের ভোট। বিভিন্ন রাজ্যে ভোটগ্রহণ ও গণনার সময় ভিন্ন হওয়ার কারণে কে জয়ী হচ্ছেন সেটা জানতে ২০০০ সালের পর এবারই দেরি হয়েছে। পেনসিলভেনিয়া, মিশিগান, জর্জিয়া, অ্যারিজোনা, উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে দুই প্রার্থীর মধ্যে। যেখানে সামান্য ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন জো বাইডেন। বাইডেনের এই জয়ের পূর্বাভাস দিতে মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর চার দিন অপেক্ষা করতে হয়।

ভোট গণনার শুরুতে এগিয়ে ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প; কিন্তু ডাকযোগের ভোট গণনা শুরুর পর থেকে পিছিয়ে পড়তে থাকেন তিনি। পরাজয় যখন প্রায় নিশ্চিত তখন ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তোলেন। ডাকযোগের ভোট বাতিল এবং ভোট পুনরায় গণনার জন্য পেনসিলভেনিয়া, জর্জিয়া, মিশিগান, নেভাদা, উইসকনসিন, অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যে মামলাও করে রিপাবলিকান পার্টি ও ট্রাম্পের প্রচারণা টিম; কিন্তু বেশির ভাগ মামলা আদালত খারিজ করে দিয়েছে।

গত ১৪ ডিসেম্বর ইলেকটোরাল কলেজ ভোটাররা মিলিত হয়ে ভোট দিয়েছেন। আগামী ৬ জানুয়ারি মার্কিন কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে জো বাইডেনকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করা হবে; কিন্তু ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি কখনোই পরাজয় মেনে নেবেন না।

নির্বাচনের আগেই যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক অশ্চিয়তা দেখা দিয়েছিল। সেই আশঙ্কা এখনো কাটেনি। ক্ষমতায় থাকতে নানামুখী চেষ্টা চালাচ্ছেন ট্রাম্প। এজন্য সামরিক শাসন জারির চিন্তাও রয়েছে তার। সম্প্রতি হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে উপদেষ্টা ও প্রচারণা টিমের সদস্যদের এক বৈঠকে এ বিষয়টি নিয়ে তিনি কথা বলেন। 

প্রেসিডেন্টের এই পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লাখ লাখ মার্কিনিকে বোঝাতে চাইছেন যে, ভোট জালিয়াতির কারণে তিনি পরাজিত হয়েছেন। তার এই অভিযোগ সমর্থকদের সহিংসতা সৃষ্টিতে ইন্ধন দিতে পারে। আর সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হলে তিনি সামরিক শাসন জারির চিন্তা বাস্তবায়িত করতে পারেন। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সাবেক সহকারী মন্ত্রী এলিজাবেথ ন্যুমান মার্কিনের কথায়ও তেমন সুর মিলেছে। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, এখনো রিপাবলিকদের কিছু কট্টর সমর্থক গোষ্ঠী ট্রাম্পকে সমর্থন দিচ্ছে। যখন তারা দেখবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামরিক শাসন জারির পরিকল্পনা করছেন, তখন তারা সংগঠিত হয়ে সংঘাতমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াতে পারে। যাতে প্রেসিডেন্ট সামরিক শাসন জারির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্রে বেসামরিক সরকারকে হটিয়ে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতায় আসার বা সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করে কোনো প্রেসিডেন্টের ক্ষমতায় থাকার নজির নেই। গত ১৮ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং আর্মি চিফ অব স্টাফ আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন, কোনো প্রকারের ক্যুতে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা তাদের নেই। তাদের মতে, আমেরিকান নির্বাচনের ফল নির্ধারণে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। াগামী ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দায়িত্বের শেষদিন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুসারে ঐদিন নতুন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নেবেন; কিন্তু ট্রাম্প বলছেন, নির্বাচন এখনো শেষ হয়ে যায়নি। তাই মার্কিন নির্বাচনের উত্তেজনার এই রেশ থাকবে নতুন বছরের শুরুতেও। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরকে বলা হয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। যুক্তরাষ্ট্রে সেই সৌন্দর্যের ধারা বজায় থাকবে, নাকি স্বৈরতন্ত্রের ছায়া গ্রাস করবে সেটাই দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব।