যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতুটি উদ্বোধন হয় ১৯৯৮ সালে। তখন যমুনা সেতু ছিল বিশ্বের ১১তম দীর্ঘ সেতু। ঠিক এর পরই পদ্মা নদীতেও সেতু নির্মাণের দাবি ওঠে। কারণ রাজধানী ঢাকা ও দেশের পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার যোগাযোগ ছিল কষ্টসাধ্য। ফলে এই দাবি ছিল যৌক্তিক। এরপর থেকে পদ্মা সেতুর দাবি আরো প্রবল হয়ে ওঠে। তখন ক্ষমতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। ঐ বছরই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় পদ্মা সেতুর।
পরের বছর ১৯৯৯ সালে একটি প্রাক্সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতুর পরিকল্পনা প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এলে সেতুটির সমীক্ষাকাজ শেষ হলেও কোনো অগ্রগতি ছিল না। এক অর্থে প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়ে। বিএনপির বিদায়ের পর ওয়ান-ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসে ক্ষমতায়। তাদের সময়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) এই সেতু নির্মাণের প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়। সেতু নির্মাণে ভূমি অধিগ্রহণের কাজও হয় ঐ সময়। পরবর্তী সময়ে সেতু নির্মাণের মূল চ্যালেঞ্জটি মূলত গ্রহণ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। দায়িত্ব গ্রহণের ১৩ দিনের মাথায় ২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি সেতুর নকশা প্রণয়নে পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন পায়। কিন্তু এর পরও পদ্মা সেতু নিয়ে কম জল ঘোলা হয়নি। বিশ্বব্যাংক থেকে উঠেছিল দুর্নীতির অভিযোগ। অর্থায়ন নিয়ে তৈরি হয়েছিল অনিশ্চয়তা। কিন্তু ২০১৩ সালের শুরুর দিকের কথা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা তখন গোটা বাংলাদেশকে এক নতুন পথ দেখায়। এরকম একটি মেগা প্রকল্প বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করবে এ কথা তখনো দেশের মানুষের কল্পনায়ও আসেনি। তবে সবকিছু উপেক্ষা করে অনড় ছিলেন শেখ হাসিনা। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ পরে মিথ্যা প্রমাণিত হলেও শেষ পর্যন্ত দেশের জনগণের টাকায়ই জনগণের এই প্রকল্প নির্মাণের মহাযজ্ঞ শুরু করেন তিনি।
২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসে। এরপর ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজের উদ্বোধন হয়। প্রমত্তা পদ্মাকে বাগে এনে একে একে নদীর বুকে বসতে থাকে পিলার। সেসব পিলারের ওপর একে একে বসেছে স্প্যান। সর্বশেষ ৪১তম স্প্যানটি বসে যাওয়ার পর কোটি মানুষের সেই স্বপ্নের সেতুটি ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার পেল পূর্ণাঙ্গ কাঠামো। ২২ বছর পর পূর্ণতা পেল স্বপ্ন। সব সমালোচককে উচিত জবাব দিয়ে পদ্মা সেতুর পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো আজ দৃশ্যমান। পদ্মার এপার-ওপারের মধ্যকার সেই সংযোগ দুই পারকে (এপারের মাওয়া আর ওপারের জাজিরা) এনে দিয়েছে মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্বে। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পূর্ণাঙ্গ পদ্মা সেতু এখন আর স্বপ্ন নয়, এক নিরেট বাস্তবতা। মূল অবকাঠামো নির্মাণ শেষে এখন সেতুর বুকে সড়ক ও রেলপথ নির্মাণের কাজ বাকি থাকছে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য পদ্মা সেতু হতে যাচ্ছে ইতিহাসের একটি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ প্রকল্প। দুই স্তরবিশিষ্ট স্টিল ও কংক্রিট নির্মিত ট্রাস ব্রিজটির ওপরের স্তরে থাকবে চার লেনের সড়কপথ এবং নিচের স্তরটিতে থাকবে একটি একক রেলপথ। পদ্মা সেতু নির্মাণকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি জানিয়েছে, পদ্মা সেতু যান চলাচলের উপযোগী হতে ২০২২ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত লেগে যাবে।
তবে আরো আগেই পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পরিকল্পনা ছিল সরকারের। কিন্তু এত বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে অবকাঠামোগত নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করতে হয়েছে। তাতে করে পাঁচ দফায় ব্যয় বেড়ে পদ্মা সেতু নির্মাণের খরচ গিয়ে ঠেকেছে প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকায়। এর মধ্যে বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস মোকাবিলা করতে গিয়েও সময় বেড়েছে।
গর্বের বঙ্গবন্ধু টানেল :অনেক বেশি গর্ব করার মতো আরেক প্রকল্প কর্ণফুলী নদীর নিচের সুড়ঙ্গপথ বঙ্গবন্ধু টানেল। এ ধরনের পথ দেশের ইতিহাসে প্রথম। পানির তলার সুড়ঙ্গপথটি কক্সবাজারের সঙ্গে চট্টগ্রামের দূরত্ব কমাবে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরের পরই এটি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। এই বঙ্গবন্ধু টানেল কক্সবাজারের সঙ্গে চট্টগ্রামের দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার কমিয়ে দেবে। কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের গাড়ি চট্টগ্রাম শহরকে এড়িয়ে সুড়ঙ্গপথ দিয়েই রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে চলাচল করতে পারবে। তাহলে চট্টগ্রাম নগরীর যানজটও কমে যাবে।
২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় টানেল প্রকল্প এলাকার কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে সুইচ টিপে আনুষ্ঠানিকভাবে এ খননকাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের জন্য ২০১৪ সালের ১০ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে বেইজিংয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের এই টানেল হবে দুই টিউব সংবলিত। পশ্চিম প্রান্তে ৭৪০ মিটার এবং পূর্বে ৪ হাজার ৯৫২ মিটার অ্যাপ্রোচ রোড থাকবে। টানেলটি নির্মাণ করছে চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন্স কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি)।
এদিকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব টানেলের ৬১ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। গত ১২ ডিসেম্বর তিনি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ প্রকল্পের দ্বিতীয় টিউবের খননকাজ উদ্বোধন করেন। তিনি আরো বলেন, ‘টানেল নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এই টিউব নির্মাণের কাজ শেষে আগামী ২০২২ সালে টানেলটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা আছে। আশা করছি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমরা প্রকল্পটির শেষ করতে পারব।’