নেপালে কমিউনিস্টদের ঐক্য ব্যর্থ!

নেপালের আকাশে রাজনৈতিক সংকটের মেঘ আরো ঘনীভূত। পূর্ণ মেয়াদ পার করতে পারল না বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলিও। নেপালের ইউনাইটেড কমিনিউস্ট পার্টির অন্তর্দ্বন্দ্ব নবীন গণতান্ত্রিক দেশটাকে বছরখানেক ধরেই রাজনৈতিক অচলাবস্থায় রেখেছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির পরামর্শে রাষ্ট্রপ্রধান বিদ্যা দেবী ভান্ডারী সংসদ ভেঙে দিয়েছেন। এর ফলে দুই কমিনিউস্ট পার্টির দুই বছরের  ‘যৌথ নেতৃত্ব’ ব্যর্থ বলেই প্রতীয়মান হলো।

গত রবিবার নেপালের রাষ্ট্রপ্রধান সংসদ ভেঙে দিলেও বিরোধীদের কেউ কেউ এটাকে অবৈধ দাবি করে সুপ্রিম কোর্টে রিট করেছেন। রিটের শুনানি হবে আগামী শুক্রবার। রিটে যদি সংসদ ভেঙে দেওয়া অবৈধও হয়, তবুও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলিকে সংসদে অভিশংসিত হতে হবে। নেপালের সংসদের ২৭৫ আসনের মধ্যে ১৭৩ আসন জিতে সরকার গঠন করেছিল কে পি শর্মা ওলির দল। কিন্তু গত বছরখানেকেরও বেশি সময় ধরে নিজেদের দলের অন্তর্কোন্দলে বেশির ভাগ সংসদ সদস্যের সমর্থন হারিয়েছেন তিনি। মি. ওলির বিদ্রোহী গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন একসময়ের মাওবাদী পুষ্প কমল দহল প্রচণ্ড। মি. প্রচণ্ড দীর্ঘদিন ধরে দলের মধ্যে প্রধানমন্ত্রিত্বের দাবি করে আসছেন। তিনি পাশে পেয়েছেন মাধব কুমার নেপালকে, যাকে বর্তমানে ‘দহল প্রচণ্ড গ্রুপ’ দলের সভাপতি করেছে। একসময় মি. ওলির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক খুঁটি ছিলেন এই মাধুব কুমার।

নেপালে প্রধানমন্ত্রী বদল খুব একটা আচমকা ঘটনা না। ২০০৮-২০১৮ সাল এই দশ বছরে ১১ জন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে নেপালের সরকার। অভিশংসন এখানে স্বাভাবিক ঘটনা। ২০১৫ সালের ভূমিকম্প, সংবিধান নিয়ে ভারতের সঙ্গে মতবিরোধ ও জ্বালানি অবরোধের বেসামাল সময়ে কংগ্রেসের সুশীল কৈরালাকে সংসদে অভিশংসিত করে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন মি. ওলি। তবে এবার সে অভিসংশনের ভয়েই নিজের ভাগ্য সংসদ সদস্যের কাছে থেকে জনগণের কাছে ছেড়ে দিতে যাচ্ছেন তিনি।

নেপালের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতে দুটি বিষয় স্পষ্ট করে—এক. নেপালের মার্কসবাদী, লেনিনবাদীদের সঙ্গে মাওবাদীদের ঐক্য ব্যর্থ হয়েছে। দুই. ভারত ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য কূটনীতির চাপ সামাল দিতে পারেনি মি. ওলি ও তার দল।

নেপালের গণতান্ত্রিকভাবে প্রথম সরকার গঠন করে নেপালি কংগ্রেস। তখন দিল্লি থেকে শুভেচ্ছা জানাতে উড়ে গিয়েছিলেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু ২০১৫ সালের সংকট সবকিছুকে উলটে দেয়। দৃশ্যপটে নিয়ে আসে চীনকে। দুই কমিউনিস্ট পার্টিকে এক করে দেয় চীনের কমিনিউস্ট পার্টি। ওলির সরকারের সঙ্গে ট্রানজিট ও ট্রান্সপোর্ট চুক্তি করে নেপালের ভারত-নির্ভরতা কমানোরও চেষ্টা করে চীন।  এরপর কালাপানি ও লিপুলেখ নিয়েও পানি কম ঘোলা হলো না।

কিন্তু ভূবেষ্টিত নেপালের পক্ষে ভারতকে এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়। অন্যদিকে কমিনিউস্ট পার্টিতে চীনের প্রভাব লক্ষণীয়। ফলে শর্মা ওলির সরকারকে দুই বৃহত্ প্রতিবেশীর সঙ্গে ভারসাম্য করতে হলো। কিন্তু তিনি ভারসাম্য করতে পারলেন না নিজ দলে। দলের সিদ্ধান্ত না মানা, সরকারে একক কর্তৃত্ব করার অভিযোগে দলের মধ্যে তিনি আস্থা হারিয়েছেন। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি নিয়েও নিজ দেশে সমালোচিত হয়েছেন।

সর্বশেষ ভারতের ‘র’-প্রধান ও সেনাপ্রধানের নেপালের সফরে সে সম্পর্কে কিছুটা অগ্রগতি করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ দুই অতিথির সফর নিয়ে শর্মা ওলি দল ও সরকারকে অন্ধকারে রেখেছেন। গত মাসে চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েই ফেঙ্গি নেপাল সফর করেন। চলমান সংকটেও চীনের কমিনিউস্ট পার্টির এক উপমন্ত্রী কাঠমান্ডু পৌঁছেছেন। ছোট দেশে এত বড় বড় সফরের চাপ সামাল দিতে না পেরে শেষ পর্যন্ত সংসদ ভেঙে দিয়েছেন ওলি, এমন বিশ্লেষণ আছে পর্যবেক্ষকদের।

নতুন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে ২০২১ সালের ৩০ এপ্রিল ও ১০ মে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কমিনিউস্ট পার্টির যে অংশই ক্ষমতায় আসুক, দরকার হবে নেপাল কংগ্রেসের সমর্থন।  এই পরিস্থিতি নেপালের রাজনীতিতে কংগ্রেসকে ফের চালকের আসনে নিয়ে আসল। কাঠমান্ডুকে কংগ্রেসের সফলতা স্বস্তি দেবে দিল্লিকে। কমিনিউস্ট পার্টির ভিন্নমতের অনেকে সম্প্রতি কাঠমান্ডুর রাজপথে হিন্দুরাষ্ট্র ঘোষণা ও রাজতন্ত্রের দাবিতে মিছিল করেছে। অন্যদিকে প্রদেশের সরকাররা কমিনিউস্টদের অন্তর্দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে। করোনা পরিস্থিতি নেপালেও বেসামাল। ভঙ্গুর অর্থনীতি। দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও  জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক সুখকর হয়। এরকম অনেক চ্যালেঞ্জ নিতে হবে নতুন সরকারকে।

তবে কমিনিউনিস্টের ঐক্যের ভাঙন নেপালিদের শুধু রাজনীতির অচলাবস্থার সাক্ষী করেনি। বরং সমাজতন্ত্র গণতন্ত্র সমান্তরালে চলার পথ যে অনেকাংশে রুদ্ধ, তা বিশ্বকে ফের দেখিয়ে দিল। এছাড়া ব্রিটিশ উপনিবেশের বাইরে থেকে যাওয়া দক্ষিণ এশিয়ার নেপাল, ভুটান ও আফগানিস্তানে গণতন্ত্রের যাত্রা যে দুরূহ তা আবার প্রমাণ হলো।

n লেখক : শিক্ষার্থী ,আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, সাউথ এশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়, নয়াদিল্লি