আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা দুনিয়াতে নানা প্রজাতির প্রাণী সৃষ্টি করেছেন মানুষের প্রয়োজনে। জীববৈচিত্র্য না থাকলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হতো না এবং মানুষের জন্য পৃথিবীতে বসবাস কঠিন হয়ে যেত। আমাদের খাদ্যসহ জীবনধারণের অনেক উপকরণ আমরা প্রাণীদের কাছ থেকে পেয়ে থাকি। তাদের কেউ দান করছে নিজের শরীরের মাংস, কেউ দিচ্ছে গায়ের চামড়া, আবার কেউ দিচ্ছে বাঁটের দুধ। প্রত্যেক জীবের অল্প অল্প ভূমিকায় আমাদের পরিবেশটা সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে। এ জন্য আমাদের প্রয়োজনের তাগিদে প্রাণীদের বাঁচিয়ে রাখা আমাদের দায়িত্ব।
চতুষ্পদ প্রাণী থেকে আমরা যেসব উপকারিতা পেয়ে থাকি, তা উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তিনি চুতষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন; তোমাদের জন্যে এতে শীতবস্ত্রের উপকরণসহ আরো অনেক ধরনের উপকার রয়েছে, তাদের কিছু তোমরা আহারও করে থাকো। তোমরা যখন গোধূলিলগ্নে ওদের ঘরে ফিরিয়ে আনো এবং প্রভাতে যখন চারণভূমিতে নিয়ে যাও, তখন এর মাঝে তোমাদের জন্যে নয়নাভিরাম সৌন্দর্য থাকে। এসব প্রাণী তোমাদের বোঝা বহন করে নিয়ে যায় এমন শহর পর্যন্ত, যেখানে তোমরা প্রাণান্তকর চেষ্টা ছাড়া পৌঁছাতে পারতে না। অবশ্যই তোমাদের রব তোমাদের ওপর স্নেহপরায়ণ, পরম দয়ালু। ঘোড়া, খচ্চর, গাধা—তিনি সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা আরোহণ করো, তাতে শোভা বর্ধনের ব্যবস্থাও রয়েছে। তিনি আরো এমন অনেক জন্তু সৃষ্টি করেছেন, যার পরিমাণ ও উপযোগিতা সম্পর্কে তোমরা এখনো অনেক কিছু জানো না।’ (সুরা নাহল, আয়াত ৫-৮)
নবি করিম (স) তার বাণীতে বারবার দয়ার কথা উচ্চারণ করেছেন। আবু দাউদ ও তিরমিজির এক বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (স) বলেন, ‘দয়াশীল লোকদের প্রতি আরহামুর রহেমিন আল্লাহ দয়া করেন। অতএব, তোমরা জমিনে বসবাসকারী সৃষ্টিকুলের প্রতি দয়া করো, আসমানের অধিপতি আল্লাহ তাআলাও তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ বায়হাকি শরিফের অপর এক বর্ণনায় এসেছে, নবি করিম (স) বলেন, ‘গোটা সৃষ্টি আল্লাহর পরিবারভুক্ত। সুতরাং আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের প্রতি দয়া করে।’
জীবজন্তু মানুষের অবলা প্রতিবেশী। তাদের মুখে ভাষা নেই বলে তারা তাদের দুঃখ-কষ্টের কথা মানুষকে বলতে পারে না। তবে মানুষের জ্ঞান ও বিবেক দিয়ে তাদের কষ্টের কথা অনুধাবন করতে হবে। সহিহ্ বুখারির এক বর্ণনায় এসেছে, ‘একবার এক পথিক খুব পিপাসার্ত হয়ে একটি কূপের কাছে পৌঁছে নিচে নেমে পানি পান করেন। এরপর উঠে দেখেন, একটি কুকুর তৃষ্ণাতাড়িত হয়ে হাঁপাচ্ছে আর নিজের পা চাটছে। কুকুরটির তৃষ্ণাজ্বালা অনুভব করে লোকটি পুনরায় কুপের ভেতরে নেমে জুতোয় করে কিছু পানি এনে তাকে পান করালেন। আল্লাহ তার এ কাজটি কবুল করলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন। এ কথা শুনে সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! পশুদের প্রতি দয়া করলেও কি আমাদের পুরস্কার রয়েছে? নবিজি বললেন, হ্যাঁ, প্রত্যেক প্রাণীর উপকার করলেই সওয়াব রয়েছে।’
বুখারি ও মুসলিমের অপর এক বর্ণনায় এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইব্ন উমার (রা) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, ‘এক মহিলা একটি বিড়ালের কারণে জাহান্নামি হয়েছেন। বিড়ালটিকে তিনি আটকে রেখেছিলেন; কোনো খাবার না-দেওয়ার কারণে বিড়ালটি মারা যায়। বিড়ালটিকে মুক্ত করে দিলে হয়তো জমিনের পোকামাকড় খেয়ে সে বেঁচে থাকতে পারত।’
গৃহপালিত চতুষ্পদ প্রাণী আল্লাহ আমাদের উপকারের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তাদের থেকে সেবা নেওয়ার আগে ঠিকমতো দানাপানি খাওয়াতে হবে। আমাদের প্রিয় নবি অবোলা প্রাণীর কষ্ট সহ্য করতে পারতেন না। একদিন তিনি নিরিবিলি পথ দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। হঠাত্ একটি উটের দিকে তার নজর পড়ে যায়। উটটির পিঠে ভারি বোঝা চাপানো ছিল বলে সহজে পথ চলতে পারছিল না। চালক উটটির গতি বাড়ানোর জন্য বারবার চাবুক মারছিল আর উটটি অসহ্য যন্ত্রণায় কেবল ঘাড় নাড়ছিল। দৃশ্যটি দেখে নবিজি দারুণভাবে ব্যথিত হন। চালককে তিনি উটটির প্রতি সদয় হতে বলেন। নবিজি এভাবেই মানুষকে জীবজন্তুর অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেছেন।
হাঁস, মুরগি ও অন্যান্য প্রাণী বহনের সময় কখনো তাদের পা ধরে মাথা নিচের দিকে করে রাখা যাবে না। এটা চরম অমানবিকতা ও নির্দয়পূর্ণ আচরণ। খাদ্যের প্রয়োজনে কোনো হালাল প্রাণীকে জবেহ করতে হলে তাদের সঙ্গে সহজ ও উত্তম ব্যবহার করতে হবে। হজরত উমার (রা) এক ব্যক্তিকে দেখেন যে, জবেহ করার জন্য সে একটি বকরির পা ধরে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি লোকটিকে বললেন, ‘তোমার প্রতি কষ্ট হয়! তুমি যখন ওকে জবাই করতে নিয়ে যাচ্ছ, তবে তার সঙ্গে নম্র আচরণ কেন করছ না?’
লেখক : মুহাদ্দিস, গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসা গোপালগঞ্জ ও খতিব,
উত্তর শাহজাহানপুর আমতলা জামে মসজিদ, ঢাকা