১৯৫৬ সালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে এদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ নির্মিত ও প্রদর্শিত হয়। এই অঞ্চলে চলচ্চিত্র নির্মাণের ইতিহাস পৃথিবীর অন্যান্য দেশের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি ধ্বংসের প্রচেষ্টার প্রতিবাদে এবং উর্দু চলচ্চিত্রের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে এদেশের মানুষকে রক্ষার জন্য বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়।
স্বাধীনতার পরই দেশি চলচ্চিত্রশিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য প্রেক্ষাগৃহে ভারতীয় হিন্দি ও বাংলা ছবি প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়। সেই সময় ভিডিও বা ডিশ অ্যান্টেনারও প্রচলন শুরু হয়নি। বিশেষ সুবিধা নিয়ে এফডিসি-তে নির্মিত অধিকাংশ ছবি ব্যাপক ব্যবসায়িক সফলতা অর্জন করে। চাষী নজরুল ইসলাম, সুভাষ দত্ত, খান আতাউর রহমান, নারায়ণ ঘোষ মিতা, আজিজুর রহমানসহ আরো কিছু পরিচালক মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক, সাহিত্যনির্ভর ও সামাজিক ছবি নির্মাণ করেন। তারপরও চরম নীতিহীন ও মুনাফালোভী কিছু ব্যক্তি দ্রুত ব্যবসায়িক সাফল্য লাভের জন্য ভারতে গিয়ে প্রেক্ষাগৃহে হিন্দি ছবি দেখে এদেশে এসে নকল ছবি বানাতে শুরু করেন। এমনকি এসব ছবিতে হিন্দি গানের সুর অবিকল নকল করে গানও গাওয়া হতে থাকে। স্বাধীনতার আগে নকল ছবি নির্মিত হলেও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তা মহামারির রূপ নেয়।
এ কারণে বিদেশি চলচ্চিত্রে অবাধ প্রদর্শন থেকে সুরক্ষা পাওয়া বাংলাদেশের জমজমাট চলচ্চিত্রশিল্পের ধ্বংস প্রক্রিয়ার সূচনা হয়। তারা নিজেরা নকল ছবি তৈরি করলেও প্রেক্ষাগৃহে হিন্দি ছবি প্রদর্শনে বাধা সৃষ্টি করে। মৌলিক ও দেশীয় সংস্কৃতিনির্ভর ছবি নির্মাণ না করে হিন্দি ছবির হুবহু নকল করে ছবি বানানোর ফলেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিগত শতাব্দীর ৮০-র দশক থেকে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ঘরে ভিডিও প্রযুক্তি চলে যায়। ঘরে বসে কম খরচে উন্নতমানের ছবি দেখার সুযোগ থাকায় তারা আর প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে নিম্নমানের নকল ছবি দেখার আগ্রহ বোধ করেনি। এভাবে শুধু নকল প্রবণতার কারণে বাংলাদেশের জমজমাট চলচ্চিত্রশিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়।
নকল ছবি বানিয়েও ব্যবসা করতে ব্যর্থ পরিচালকরা দর্শকদের আকৃষ্ট করার জন্য ৯০-এর দশকের শেষদিক থেকে চলচ্চিত্রে ‘কাটপিস’ অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করেন। চরম অশ্লীল দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করে সেন্সর-বহির্ভূতভাবে বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হতে থাকে সেগুলো। এর ফলে শ্রমজীবী শ্রেণিও পরিবার নিয়ে ছবি দেখতে অনাগ্রহী হয়। দ্রুত কমতে থাকে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা। এরই ধারাবাহিকতায় চলচ্চিত্র বর্তমানের শোচনীয় অবস্থায় পতিত হয়েছে।
চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য অনুদান প্রথা চালু থাকলেও সরকারি অনুদানে আজ পর্যন্ত কোনো ছবি ব্যবসা সফল হয়নি। বরং অনেকেই চলচ্চিত্র নির্মাণের টাকা আত্মসাত্ করেছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ২০১২ সালে অনুদান নিয়ে এখন পর্যন্ত ছবি নির্মাণ না করায় অনুদান লাভকারী এক ব্যক্তিকে গত মাসে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।
চলচ্চিত্রে উন্নয়নের জন্য গাজীপুরে বিপুল অর্থ বায়ে চলচ্চিত্র পল্লি নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যদি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জায়গাই না থাকে, তাহলে যত ভালো ছবিই নির্মিত হোক, দর্শক সেটা দেখার সুযোগ পাবে না। চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শহরের প্রতিটি থানা এলাকা এবং গ্রামেও যথেষ্ট সংখ্যক প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ। ৬০ থেকে ৯০-এর দশকে প্রেক্ষাগৃহ যথেষ্ট সংখ্যায় থাকার কারণেই বেশিরভাগ চলচ্চিত্র ব্যবসাসফল হয়েছে। এবং বছরে প্রায় ৮০টা করে ছবি নির্মিত হতো, বর্তমানে যার সংখ্যা ১৫ থেকে ২০। অতীতের ১২০০-র পরিবর্তে এখন সারা দেশে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা ২৫০-এর মতো। একটি ছবি ন্যূনতম ৬০০ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেলে যে ব্যবসা হতো, ১০০টিতে মুক্তি পেলে স্বাভাবিকভাবেই সেই ব্যবসা করা সম্ভব না। এ কারণে চলচ্চিত্র নির্মাণে অর্থ বিনিয়োগ এখন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
ভারতের তামিল ও তেলেগু ভাষাভাষী অধ্যুষিত তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানায় জনসংখ্যা মাত্র ৭ থেকে ১০ কোটি। এই দুই রাজ্যে নির্মিত বিভিন্ন চলচ্চিত্র ভারতসহ সারা বিশ্বে বিপুল জনপ্রিয়। ব্যবসাসফল অনেক হিন্দি চলচ্চিত্র তামিল ছবি থেকে পুনঃনির্মিত হয়েছে। খ্যাতিমান নির্মাতা শংকর পরিচালিত ২০১৮ সালে নির্মিত তামিল চলচ্চিত্র ‘রোবট ২,০’ ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল চলচ্চিত্র। একইভাবে ভারতসহ সারা পৃথিবীতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও ব্যবসায়িক সফলতা অর্জন করেছে তেলেগু চলচ্চিত্র ‘বাহুবলী ১ ও ২’। এসব প্রদেশ ছাড়া ভারতের অন্য কোনো রাজ্যের জনগণ তামিল বা তেলেগু ভাষায় কথা বলে না বা বোঝে না। তারপরও নকল প্রবণতা থেকে মুক্ত হয়ে সৃষ্টিশীল ও মানসম্মত ছবি নির্মাণের কারণে এই সফলতা অর্জন সম্ভব হয়েছে। সর্ব-ভারতীয় ভাষা হিন্দিতে নির্মিত কোনো চলচ্চিত্রের পক্ষেও এতোটা গৌরব অর্জন সম্ভব হয়নি। আর এই মৌলিকত্ব ও সৃষ্টিশীলতার অভাবেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ভগ্নদশা!
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উন্নয়নের জন্য মৌলিক ও মানসম্মত ছবি নির্মাণ করতে হবে। নকল ছবি নির্মাণকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আধুনিক প্রযুক্তিতে চলচ্চিত্র নির্মাণের শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা করা উচিত।
সারা দেশে প্রেক্ষাগৃহ থাকলে ও মানসম্মত মৌলিক চলচ্চিত্র নির্মিত হলে চলচ্চিত্রের দর্শকসংখ্যা বাড়বেই। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সদিচ্ছা থাকলে ১৭ কোটির বেশি জনসংখ্যার একটি দেশের চলচ্চিত্রশিল্প ধ্বংস হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ঢাকা