আমাদের যুবসমাজের একটি অংশে বিভ্রান্তি

আমাদের প্রগতিশীল যুবসমাজেরও একটা বড় অংশে বর্তমানে একটা বিভ্রান্তি কাজ করছে বলে আমার ধারণা। এই ধারণা আমার মনে সম্প্রতি জন্মেছে ঢাকার একটি অনলাইন টকশোতে যোগ দেওয়ার পর। এই আলোচনায় যারা যোগ দিয়েছিলেন, তারা সবাই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী তরুণ ও প্রবীণ বুদ্ধিজীবী। এই আলোচনায় এক তরুণ বদ্ধিজীবী বলে ফেললেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার জন্য সরকার যদি মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে এখন কোনো হার্ডলাইনে যায়, তাহলে দেশে সিভিল ওয়ার হবে। মৌলবাদীরা এখন খুবই শক্তিশালী। সুতরাং এই যুদ্ধের ফলাফল কী হবে তা বলা সহজ নয়।’

আমি সমাজের সবচাইতে অগ্রসরমনা শ্রেণির এক যুবকের মুখে এ কথা শুনে বিস্মিত হয়েছি। বিস্মিত হয়েছি আরো এক যুবকের মুখে একই কথা শুনে। তিনি যুবলীগের একজন নেতা। তিনি আমাকে জিগ্যেস করছেন, আমি মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে এখনই হার্ডলাইনে যাওয়ার পক্ষে কি না। আমি বলেছি, শান্তিপ্রিয় মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে নয়, কিন্তু যে হিংস্র মৌলবাদীরা বহুদিন বহু তরুণ বুদ্ধিজীবীর গলা কাটার সহিংতার পর এখন জাতির পিতার ভাস্কর্য উপড়ে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে এখনই যাওয়ার পক্ষপাতী। দেরি করলে তারা আরো শক্তিশালী হবে এবং ঢাকাকে মসজিদের নগরী করার দাবি তুলবে।

ঢাকা এমনিতেই মসজিদের নগরী হয়ে আছে। তার সংখ্যা আরো বাড়ানোর অর্থ, এসব মসজিদের খতিবের পদও এই মৌলবাদীদের দখলে যাবে। এই পদ দখল করে তারা ইসলাম প্রচারের আড়ালে তাদের উগ্র ধর্মীয় রাজনীতির প্রচার চালাবে। সৌদিরা এজন্যই বাংলাদেশ সরকারকে বাংলাদেশে তাদের অর্থসাহায্যে আরো ৫০ হাজারের মতো মসজিদ তৈরির টোপ দিয়েছিল। সরকার সেই টোপ গিলেছে। এর ফলাফলের কথা ভাবেনি। এ ব্যাপারে আমাদের বর্তমান পাকিস্তানের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। একজন মুসলমান হিসেবে আমি মসজিদ, মন্দির, গির্জা—কোনো কিছু গড়ারই বিরোধী নই। কিন্তু এসব ধর্মস্থানের আড়ালে যখন হিংস্র ধর্মীয় রাজনীতি সমাজে প্রভাব বিস্তার করে, তখন তার বিরুদ্ধে অবশ্যই একটি গণতান্ত্রিক সরকারকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ব্যাপারে পাকিস্তান আমাদের শিক্ষা গ্রহণের সবচাইতে উপযুক্ত দেশ।

একটু পেছনের ইতিহাসে যাই। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কখনো চাননি পাকিস্তান একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র হোক। তিনি চেয়েছিলেন পশ্চিমা গণতন্ত্রের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র গঠন, যেখানে ভারতের মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে দেশটি চালাবে। দেশটি হবে মুসলিম রাষ্ট্র, ইসলামিক স্টেট নয়। জিন্নাহ পাকিস্তানের নামের আগে ইসলামি প্রজাতন্ত্র যোগ করারও বিরোধী ছিলেন। জিন্নাহর মৃত্যুর পর যে সংবিধান তৈরি হয়,তাতে ইসলামি প্রজাতন্ত্র যোগ করা হয়।

পাকিস্তান থেকে রাজনৈতিক শাসন উত্খাতের পর সামরিক শাসকেরা ক্ষমতায় থাকার লোভে উগ্র মৌলবাদীদের দিকে আপসে হাত বাড়ান। যে জামায়াত নেতা মাওলানা মওদুদিকে সামরিক জান্তার প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান কাদিয়ানিবিরোধী দাঙ্গা বাধানোর অপরাধে ফাঁসির আদেশ দিয়েছিলেন, সৌদি বাদশাহের চাপে সেই মওদুদিকেই আইয়ুব খান জীবন ভিক্ষা দেন এবং মিত্র বানান। গড়ে ওঠে পাকিস্তানে মক্স অ্যান্ড মিলিটারি অ্যালায়েন্স।

পাকিস্তানে সৌদিরা দুই হাতে টাকা ঢালতে শুরু করে। হাজার হাজার মসজিদ নির্মিত হয়। এই মসজিদগুলোতে ধর্মপ্রচারের বদলে জামায়াতের রাজনীতি প্রচারিত হতো। সৌদি অর্থে নির্মিত কয়েক লাখ মাদ্রাসায় আফগানিস্তানে কমিউনিস্টবিরোধী জিহাদে অংশগ্রহণ করানোর জন্য হাজার হাজার ইসলামি জিহাদি ট্রেনিং দেওয়া হয়। জেনারেল জিয়াউল হক ক্ষমতা দখলের পর পাকিস্তানে ‘গণতান্ত্রিক রাজনীতির শেষ শিখা’ জুলফিকার আলী ভুট্টোকে বিচারের প্রহসনে হত্যা করেন এবং পাকিস্তান একটি শরিয়াহ রাষ্ট্র হবে ঘোষণা দেন। পাকিস্তানে ইসলামি ব্যবস্থায় অপরাধীদের শাস্তিদানের নামে হাত কাটা, শির কাটা এবং ‘জেনার’ (অবৈধ সহবাস) অপরাধে নারীদের পাথর মেরে হত্যার ব্যবস্থা হয়।

জেনারেল জিয়া সৌদি অর্থে রাওয়ালপিন্ডির কাছে একটি নতুন উপনগর তৈরি করেন, এক সৌদি বাদশাহের নামানুসারে উপনগরের নাম দেন ফয়সালাবাদ এবং সেখানে একটি বিশাল মসজিদ তৈরি করে নাম দেন ফসসল মসজিদ। পাকিস্তানের সামাজিক জীবনে যেটুকু আধুনিকতা ছিল, তা দূর হয় এবং ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কার পাকিস্তানের সমাজজীবনে আধিপত্য বিস্তার করে।

নওয়াজ শরিফ ও ইমরান খান দুজনেই ক্ষমতায় এসে উপলব্ধি করেন, পাকিস্তানকে একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করার পথে সবচাইতে বড় বাধা ধর্মান্ধতা এবং সামরিক বাহিনীতেও তার প্রভাব। অনেকে মনে করেন, জেনারেল জিয়াউল হকের বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণের পেছনে মার্কিন সিআইএর হাত ছিল। আফগানিস্তানে তালেবানবিরোধী অভিযানের সময় আমেরিকা উপলব্ধি করে, তালেবানদের যে শক্ত ঘাঁটি গড়ে উঠেছে পাকিস্তানের মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোতে, তাতে এসব মসজিদ-মাদ্রাসা বন্ধ করা না গেলে তালেবানদের পরাজিত করা যাবে না।

তারপর পাকিস্তানে শুরু হয় মসজিদ ও মাদ্রাসা নামে পরিচিত জঙ্গি ঘাঁটিগুলো উচ্ছেদ করা। পাকিস্তানে সরকারি হিসাবমতে ২০ হাজার এবং বেসরকারি হিসাবমতে ৬০ হাজার মাদ্রাসা বন্ধ করা হয়েছে। ৩০ হাজার মসজিদের খতিব পরিবর্তন করা হয়েছে। ৫০০-এর মতো মসজিদে তালা মারা হয়েছে। রাজধানী ইসলামাবাদের উপকণ্ঠে নির্মিত ঐতিহাসিক লাল মসজিদে, যেখানে জঙ্গিরা ঘাঁটি গেড়েছিল, সেই মসজিদে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী জঙ্গিদের মারতে গিয়ে কামান দেগে মসজিদের অংশবিশেষ ভেঙে ফেলেছে। তাতেও পাকিস্তানের সমাজজীবন ও রাষ্ট্রব্যবস্থা ধর্মান্ধদের কবল থেকে এখনো মুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

আমার কথা, বাংলাদেশে উগ্র মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে সরকার যদি সময় থাকতে হার্ডলাইনে না যায়, তাহলে পাকিস্তানের মতো অবস্থার মোকাবিলা করতে হবে। জামায়াতিরা রাজনৈতিক ফ্রন্টে পরাজিত হয়েছে। সামাজিক ফ্রন্টে তাদের আধিপত্য অটুট। এই সমাজকে আধুনিক শিক্ষাবঞ্চিত করে মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত করে ৫০ বছর পেছনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ধর্মান্ধ একটা সামাজিক শক্তি তৈরি হয়েছে, যে সামাজিক শক্তির জোরে বুখাইনগরীর কণ্ঠে এত জোর।

তারা এখনো এতটা শক্তি অর্জন করতে পারেনি, যে বর্তমান অসাম্প্রদায়িক সরকারের মোকাবিলা করতে পারে। শাপলা চত্বরের কনফ্রন্টেশনে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সরকার ধর্মান্ধদের শক্তিকে বড় করে দেখে অযথা ভয় পাচ্ছে অথবা ভোটের রাজনীতির লোভে ভয় পাওয়ার ভান করছে। এই কাল্পনিক ভয়ে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে সরকারের এই ক্রমাগত পশ্চাত্পসরণের নীতি উগ্র মেলবাদীদের আরো উত্সাহ জোগাবে। তাদের আরো শক্তিশালী করে তুলবে। তাদের দমাতে হলে দেশের প্রগতিশীল যুবশক্তি এবং বুদ্ধিজীবীদের ঐক্যবদ্ধ করে সরকারের উচিত রাজনৈতিক ও সামাজিক দুই ফ্রন্টেই উগ্র মৌলবাদের মোকাবিলা করার উদ্যোগ নেওয়া। এ ব্যাপারে দেরি করা হলে, আপসের নীতি গ্রহণ করা হলে সরকার পরে পস্তাবে। দেশে মিশরের মতো মুসলিম ব্রাদারহুডের (মিশরের জামায়াত) ক্ষমতা দখলের ব্যাপার ঘটতে পারে।

আমার উদ্বেগ, দেশের একদল প্রগতিশীল যুবকের চিন্তা-ভাবনা নিয়ে। তারা ভয় পাচ্ছেন এবং সেই ভয়ের কথা প্রকাশ্যে বলছেন। তারা উগ্র মৌলবাদীদের মোকাবিলা করতে ভীত। শুধু ভীত নন, এই ভীতি যুবসমাজের অন্যান্য অংশে ছড়াচ্ছেন। এই ভীতি ভাষা আন্দোলনে, হরফ রক্ষার আন্দোলনে, রবীন্দ্রসাহিত্য রক্ষার আন্দোলনে বা মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের যুবসমাজের মধ্যে দেখা যায়নি। তখনো এসব আন্দোলনের বিরুদ্ধে মৌলবাদীদের অবস্থান কম শক্তিশালী ছিল না। তখনকার সরকারও এদের পেছনে ছিল।

আমি মসজিদ প্রতিষ্ঠার বিরোধী নই। আমার দাবি, এসব মসজিদ হবে আল্লাহর ইবাদতের প্রকৃত স্থান। ওয়াহাবিজম প্রচারের স্থান নয়। মাদ্রাসা শিক্ষাও আধুনিক ও উন্নত করতে হবে। যেসব মাদ্রাসায় জাতীয় পতাকা তোলা হয় না, জাতীয় সংগীত গাওয়া হয় না, ধর্মান্ধতা শিক্ষা দেওয়া হয়, সেগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। পাকিস্তানে ২০ হাজার মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে অনুরূপসংখ্যক মাদ্রাসা বন্ধ করা নয়, তার কারিকুলাম সংস্কার ও আধুনিক করতে হবে। এখনই এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ না করলে সরকার আর সময় পাবে না।

n লন্ডন, ২ জানুয়ারি. শনিবার, ২০২১