মহামারি কোভিড-১৯ সংক্রমণের শুরু থেকেই সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন চিকিত্সকরা। সেবা দিতে গিয়ে নিজেরাও হয়েছেন আক্রান্ত, রয়েছেন মৃতের তালিকাতেও। তবে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো মেডিক্যাল কলেজগুলো দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ভবিষ্যত্ ডাক্তারদের স্বাভাবিক জ্ঞানার্জন। কীভাবে কাটছে তাদের সময়, নতুন বছরেই বা কী প্রত্যাশা করছেন। এমন তিন জন মেডিক্যাল পড়ুয়া শিক্ষার্থীর কথা লিখেছেন— মুসাদ্দিকুল ইসলাম তানভীর
আইসিইউ স্মৃতি এখনো নাড়া দেয়
করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাব থেকে শিক্ষার্থীদের দূরে রাখতে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমের বদলে ঘরোয়া শিক্ষাব্যবস্থায় প্রবেশ করেছে দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অনলাইন ক্লাসের অভিজ্ঞতা ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্নরকম। ছুটির শুরুতে ব্যস্ততার একটি অংশ ছিল ত্রাণকার্য পরিচালনা করা। এরই মধ্যে কয়েক দিন সুযোগ হয়েছিল করোনা ইউনিটের আইসিইউ এবং করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে প্রবেশের। সেখানে দেখেছি করোনা আক্রান্তদের অসহায়ত্ব এবং পারিপার্শ্বিক আতঙ্কগ্রস্ততা। সে সময় তাদের সঙ্গ দেওয়া ও কিছু চিকিত্সাজনিত সেবা প্রদান করতে পারাটা এখনো স্মৃতিতে নাড়া দেয়। প্রথম অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছিল এই রোগটি চিকিত্সক এবং রোগীদেরকে দুই মেরুতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কিন্তু মনের ভুল ভাঙতে দেরি হয়নি। রোগীরা সাবধানতা অবলম্বন করেছেন যেন ছোঁয়াচে রোগটি নিজের থেকে অন্যের কাছে ছড়িয়ে না যায়। সর্বোপরি একটি সুস্থ পরিবেশে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে পারাটাই সবার কাম্য।
—আয়াতুল্লাহ সিদ্দিকী
চতুর্থ বর্ষ, ইসলামী ব্যাংক মেডিক্যাল কলেজ, রাজশাহী।
আজীবন মানবসেবা করে যেতে চাই
সেই মার্চ থেকে শুরু হলো অবসর। প্রথমে খুব বিরক্ত হতাম। মেডিক্যাল কলেজের ব্যস্ত জীবন, পড়াশোনা ছেড়ে বসে থাকতে হতো। চারদিকে এত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল, এছাড়া কোনো উপায়ও ছিল না। তারপর ব্যস্ত হয়ে পড়লাম নিজের কিছু শখ পূরণের চেষ্টায়। কাছের মানুষদেরও সময় দিতে পারতাম বলে এক পর্যায়ে এসে ভালো লাগতে শুরু করল অখণ্ড অবসর। অবশ্য তার কিছুদিন পরেই অনলাইনে ক্লাস শুরু হলো, পড়াশোনায় কিছুটা চাপ বাড়ল। এখনো সেভাবেই চলছে। হয়তো চালিয়েই নিতে হবে। কারণ ডাক্তারির মতো মহান পেশায় অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা, সুরক্ষাসামগ্রীর অপ্রতুলতার মধ্যেও এই মহামারির মধ্যে ডাক্তাররাই সর্বোচ্চ সেবা প্রদান করে যাচ্ছেন। তাদের আত্মনিবেদন আমার মতো মেডিক্যাল পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করে। তাইতো শীতে করোনার প্রকপ বাড়ার শঙ্কা মাথায় নিয়েও প্রফ পরীক্ষায় বসতে যাচ্ছি। কিছুটা আক্ষেপ থাকলেও এর মধ্য দিয়ে নতুন বছরে ভালো কিছু দেখব, এমন প্রত্যাশা করি। মানুষের সেবা করাই আমাদের ধর্ম, আজীবন এই কাজ করে যেতে চাই।
—সাদিয়া সুলতানা
দ্বিতীয় বর্ষ, রংপুর মেডিক্যাল কলেজ।
যত দ্রুত সম্ভব ভ্যাকসিন আসুক
প্রতিটি বছরের তুলনায় ২০২০ সাল ছিল আমার মেডিক্যাল জীবনে ভিন্ন একটি বছর। অন্য বছরগুলো যেখানে আইটেম দিয়ে, এক ওয়ার্ড থেকে আরেক ওয়ার্ডে দৌড়াতে দৌড়াতে কেটেছে, ২০২০ সাল কেটেছে ঘরে বসে। এই বছর যতটা না আইটেম, টার্মের চাপ ছিল, তার চেয়ে বেশি চিন্তা ছিল কীভাবে কোভিড-১৯ নামক বৈশ্বিক মহামারিকে প্রতিরোধ করা যায়। আমরাই হয়তো একমাত্র সৌভাগ্যবান ব্যাচ, যারা এপিডেমিওলজি পড়ার সময় বাস্তবিকভাবে এর প্রয়োগে কাজ করেছি। নিজের জায়গা থেকে যতটুকু সম্ভব ছিল, চেষ্টা করেছি। এবছর আমরা আমাদের প্রচণ্ড মেধাবী কিছু চিকিত্সকদের হারিয়েছি। আমি আমার বাবাকেও হারিয়েছি। সবমিলিয়ে ২০২০ সালে আমরা প্রায় সবাই কাছের মানুষদের হারিয়েছি। ২০২১ সালে আমার প্রত্যাশা, যত দ্রুত সম্ভব কোভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন আসুক, আমরা কেউ যেন আর কাছের মানুষদের না হারাই, নির্ভয়ে আবার আমাদের প্রিয় মেডিক্যাল কলেজের ক্যাম্পাসে ফিরে আসতে পারি, এটাই কামনা।
—মো. আহসানুল ইসলাম শাফি
তৃতীয় বর্ষ, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ।