আয়েশা আমার এক বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। ঐবার নেত্রকোনা থেকে দুই জন ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী এসেছে, আয়শা-মুনীরা। মানিকজোড়। দুই জনেই সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্রী। পরিচয় ইতিপূর্বে হয়ে গেছে। বিখ্যাত সমাজ বিজ্ঞানী রঙ্গলাল সেন ঐ বিভাগের শিক্ষক হিসাবে সবে যোগ দিয়েছেন। একদিন তিনি বললেন, ‘আয়শাকে চেন। বেশ ভালো মেয়ে।’ তারপর ওর প্রতি আগ্রহ বেড়ে গেল। একসময় এক ক্লাস নিচে পড়া ‘ভালো মেয়েটা’ আমার বন্ধু হয়ে গেল। বড় হলেও আমার নাম ধরে ডাকাটা ছিল স্বাভাবিক। কেননা ও যে আমাদের প্রিয় মোর্তুজা ভাইয়ের (ইঞ্জিনিয়ার, প্রয়াত, আদমজীতে ট্রেড ইউনিয়নের নেতা ছিলেন) স্ত্রী হবেন।
আয়শার মৃত্যুর খবর শুনে রীনা আপাকে টেলিফোন করলাম। কাঁদছিলেন। একসঙ্গে রোকেয়া হলে ছিলেন। আয়শা খানম ভিপি ও রীনা খান জিএস। কত স্মৃতি! তিনি বললেন, ‘একবার আয়শা আপাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এত সুন্দর বক্তৃতা দিতে শিখলেন কীভাবে?’ উত্তরে আয়শা বলেছিল, ১৯৬৫ সালে গুলিস্তান কামানের মোড়ে সবাই মিলে রিকশা উঠিয়ে দেয় পথসভায় বক্তৃতা দিতে।’ ছবিটা চোখের সামনে ভাসাতে চেষ্টা করলাম। সেই শুরু। তারপর আর থামে নি আয়শা। দমবার তো আর পাত্রী নয়! মৃত্যুর কয়েক দিন আগেও মহিলা পরিষদের এক জুম মিটিংয়ে সে বক্তব্য রেখেছে।
আমরা চার জন—সামসুদ্দোহা, নুরুল ইসলাম নাহিদ, আবুল হাসনাত (সদ্য প্রয়াত) ও আমি খুব খ্যাপাতাম আয়শাকে, বিশেষভাবে মোর্তুজা ভাইকে নিয়ে। খুব মজা পেত সে। লাল হয়ে যেত। পাবে না কেন? কাঁচা বয়সের প্রেম। প্রথমে আমরা ডাকতাম, ইউ কে কে। তুমি কে কে! ওটা ছিল ওর নামেরই অংশ, আয়শা ইউ কে কে খানম। এক সময় হাসনাত ভাইয়ের কবিমন ওর নাম দিল ‘বাতাসী’। বাতাসের মতো আসে আর যায়। সামসুদ্দোহা ভাই ওর মৃত্যুর পর আজ ঠিকই লিখেছেন, মোর্তুজা ভাইয়ের সঙ্গে রিকশায় অফিসের একটু দূরে এসে প্রায়ই নামত। আবার ঘড়ি দেখে কখনো-বা উঠে যেত। আমরা হাসতাম। আর খ্যাপাতাম। কয়েক দিন চুপেচাপে রিকশা পর্যন্ত এগিয়েও দিয়েছি সন্ধ্যার পর। হোসেনী দালানের রাস্তা তো বেশ অন্ধকার ছিল।
আয়শার কাছে জগন্নাথ হলের ছাত্র হিসাবে আমরা ঋণী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিস ছিল জগন্নাথ হলের দক্ষিণবাড়িতে। নতুন ভবন হওয়ার পর রেজিস্ট্রার অফিস সেখান থেকে চলে গেল। ওটা তখন জগন্নাথ হলের খুব দরকার। সব রুমে এবং এমনকি ছাত্র সংসদ অফিস ও অডিটরিয়ামের মাটিতে পর্যন্ত নতুন ছাত্রদের এক বছরের বেশি সময় থাকতে হয়। এদিকে রোকেয়া হলেও ছাত্রী সংকুলান হয় না। ভিসি কুখ্যাত ওসমান গণি জগন্নাথ হলকে রেজিস্ট্রার অফিস দিয়ে উত্তরবাড়ি রোকেয়া হলকে এক্সটেশন হিসেবে দিতে চাইলেন। প্রথমে ছাত্রীরা ছিল খুশি।
আমরা প্রতিবাদ করলাম। ভিসির কাছে গেলাম। এখনো কানে বাজে। রাগত স্বরে বললেন, ‘হিন্দু ছাত্রদের এত জায়গা লাগবে কেন? আমরা কি এত টাকা খরচ করে ভারতের জন্য তাদের উচ্চ শিক্ষিত করব।’ চলল আন্দোলন। হল সংসদ তখন ছাত্র ইউনিয়নের। ভিপি সুশান্ত সরকার (প্রখ্যাত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নটর ডেম কলেজ)। আমি তখন ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক। হলের ছাত্রদের মত, আন্দোলনে চরমপন্থা গ্রহণ করা। উত্তেজনায় হল কাঁপছে। রাতে এই বিষয়ে গোপন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ফরহাদ ভাইয়ের সঙ্গে কথা হলো। তিনি বললেন, চরমপন্থা নয়। সংখ্যালঘুদের হল। যদি তেমন কিছু করা হয়, তবে ভয়াবহ নির্যাতন নেমে আসবে। তা সামাল দেওয়া কঠিন হবে।
তাই কৌশলে অগ্রসর হতে হবে। ফরহাদ ভাই বুদ্ধি বাতলে দিলেন। ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি সাইফউদ্দিন মানিক তখন গোপনে মেডিক্যালে থাকেন। রোকেয়া হলের ভিপি ও জিএস যথাক্রমে মালেকা বেগম ও আয়শা খানম। তারা দুই জন, আমি ও সামসুদ্দোহাসহ কথা হল, রোকেয়া হল ছাত্রী সংসদ ভিসিকে বলবে আমরা জগন্নাথ হলের অংশ নেব না। নতুন হল নির্মাণ করতে হবে। আর ছাত্র ইউনিয়ন-ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বসহ ডাকসু এবং সব হল ছাত্র সংসদ ভিসিকে বলবে, মেয়েদের জন্য চাই নতুন হল। জগন্নাথ হল ঐ হলেরই থাকুক।
কথামতো হলের ছাত্রলীগ নেতা সতীর্থ সুনির্মল সিংহ রায়ের (স্বাধীনতার পর দলীয় অন্তর্কলহে নিহত) সঙ্গে কথা বললাম। খুব সখ্য ছিল আমাদের দুই জনের। সে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে রাজি করাল। দুই দলের নেতারাসহ ডাকসু ও হলের নেতৃবৃন্দ গেলেন ভিসির কাছে। জগন্নাথ হল ফিরে পেল রেজিস্ট্রার অফিস আর মেয়েদের আরেকটা হল নির্মাণের ক্ষেত্র প্রস্তুত হলো। ওটাই শামসুন নাহার হল। ঐ সময়ে মালেকা আপা ও আয়শা যেভাবে হলের মেয়েদের সামলিয়ে ডাকসুসহ সব হল সংসদের নেতাদের একত্র করে জগন্নাথ হলের পক্ষে ভূমিকা রেখেছেন, তা কৃতজ্ঞচিত্তে আয়শার প্রয়াণ দিনে স্মরণ করছি।
আজ চোখের সামনে ভেসে উঠছে আয়শা রাস্তার আন্দোলনে মিছিলের সামনে স্লোগান দিচ্ছে, বক্তৃতার মঞ্চে দিচ্ছে বক্তৃতা, জেলায় জেলায় যাচ্ছে ছাত্র ইউনিয়ন সম্মেলনে। ক্লান্তি নেই। আজ অনেক কষ্ট করেও মনে করতে পারলাম না, মুক্তিযুদ্ধের সময় আয়শা আগরতলায় কোথায় শেষদিকে ছিল? বন্ধু ফওজিয়াকে (মহিলা পরিষদের কার্যকরী সভাপতি) টেলিফোন করতেই বলল, ‘প্রথমে তো আমরা সবাই ছিলাম ক্রাফট হোস্টেলে। তারপর কিছুদিন ছিল আমাদের আশ্রয়স্থলের পাশের এক ঘরে রোকেয়া (রোকেয়া হলের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক, এনজিও) সহ।’ তারপর কোথায় তা ফওজিয়ার মনে নেই।
চোখের সামনে ভেসে উঠল, মোর্তুজা ভাই তেজপুরে ট্রেনিং নিতে যাবেন। তারপর জীবন বাজি রেখে গেরিলাযুদ্ধ করতে হানাদারকবলিত দেশে চলে যাবেন। আর দেখা হবে কি না—কে জানে! তাতেও আয়শা বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। হবে কেন? সেও যে মুক্তিযোদ্ধা। আমরা সবাই যে ছিলাম, দেশমাতৃকাকে মুক্ত করার লক্ষ্যে উত্সর্গকৃত।
স্বাধীন বাংলাদেশে মহিলাদের জাতীয় জীবনের সব কর্মকাণ্ডে পুরুষের পাশে টেনে আনতে বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে যেসব মহিলা খালাম্মা সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রপথিকের ভূমিকা পালন করেছেন, তার মধ্যে আয়শা থাকবে সামনের সারিতে। পাকিস্তান আমলে ষাটের দশকের গণজারণের সৃষ্টিতেও সামনের সারিতে যাদের নাম থাকবে, তার মধ্যেও আয়েশা থাকবে চিরউজ্জ্বল হয়ে। দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিতে মহিলারা যত অগ্রসর হবে, ততই আয়শা খানমের শ্রম হবে স্বার্থক।
আয়শা-মোর্তুজা ভাইয়ের আমেরিকা প্রবাসী একমাত্র কন্যা সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ঊর্মি খান মিষ্টিকে আজ সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমাদের নেই। তবে শেষ পর্যন্ত সে মায়ের কছে থাকতে পেরেছে, এতে শোকের মধ্যেও পাচ্ছি স্বস্তি। আয়শাকে শেষবার দেখতে যেতে পারিনি। করোনা রাক্ষুসীর জন্য। মাপ করে দিও বন্ধু আয়শা।
বন্ধু আয়শা তোমাকে জানাই রক্তিম সালাম।
n লেখক :রাজনীতিক