নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের বাজার বেসামাল হয়ে উঠেছে। ভোজ্য তেল, চিনির দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। বিক্রেতারা জানান, সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি ভোগ্যপণ্যের বাজার। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে। চালের দামও আবার বেড়েছে। বাজার মনিটরিং কমিটি থাকলেও কোনো কার্যক্রম নেই। ভোগ্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছে নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষ। শীতকালীন সবজির দাম কমলেও ভরা মৌসুমে কাঁচা মরিচ নিয়ে চলছে কারসাজি। বাজারভেদে বিক্রি হচ্ছে কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা।
জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে বাজার মনিটরিংয়ে একটি টাস্কফোর্স কমিটি রয়েছে। কিন্তু কমিটির কোনো কার্যক্রম মাঠে দেখা যাচ্ছে না। জানতে চাইলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুমনি আক্তার ইত্তেফাককে বলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে আমাদের নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হচ্ছে। তারা অন্যান্য কার্যক্রমের পাশাপাশি বাজার মনিটরিংয়ের বিষয়ও তদারক করেন। কমিটির সদস্য কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের জেলা বাজার মনিটরিং অফিসার মো. সেলিম ইত্তেফাককে বলেন, মূলত রমজান মাসে ও ঈদের সময় বাজার স্থিতিশীল রাখতে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হয়। জেলা প্রশাসক কার্যালয় বিষয়টি তদারক করে থাকেন।
জানতে চাইলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো, হাসানুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, ‘যদি কোনো পণ্যের মূল্য সরকার নির্ধারণ করে দেয়, তার বেশি দামে বিক্রি করা যাবে না। সেই সব পণ্য আমরা অভিযান চালিয়ে তদারক করে থাকি। দোকানে পণ্যের মূল্যতালিকা ও ভাউচার চেক করি। তার বাইরে ব্যবস্থা নিতে পারি না।’ পাইকারি বিক্রেতাদের অভিযোগ, প্রতিটি পণ্য নিয়ে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। দেশের চাহিদার অধিকাংশ ভোগ্যপণ্য আমদানিনির্ভর। যে পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে যায়, তখন সেই পণ্য নিয়ে দেশীয় সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা কারসাজি শুরু করেন। আমদানিকারকেরা জানান, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল থেকে সয়াবিন আর মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে পাম অয়েল আমদানি করা হয়। সেখানে এখন উত্পাদন মৌসুম নয়। আগামী মার্চ ও এপ্রিলে আবার উত্পাদন শুরু হবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এখন সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম বাড়তি। সেই কারণে দেশীয় বাজারে ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে। খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে যেসব সয়াবিন ও পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে, তা ছয়-সাত মাস আগের কেনা। কম দামে কেনা তেল এখন চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতাদের অভিযোগ, খাতুনগঞ্জের সাত-আট জন ডিও ব্যবসায়ী ভোজ্য তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের কাছে ছয়-সাত মাস আগের কেনা প্রচুর ডিও রয়েছে। নিয়ম রয়েছে, ডিও অর্ডারের ১৫ দিনের মধ্যে পণ্য ডেলিভারি নিতে হবে। কিন্তু এই নিয়ম মানা হচ্ছে না। এসব ডিও আবার পাইকারি বাজারে একাধিক হাতবদল হচ্ছে। ফলে দাম বেড়ে যাচ্ছে।
দেখা গেছে, গতকাল পাইকারি বাজারে সয়াবিন প্রতি মণ ৪ হাজার ২০০ টাকা ও পাম অয়েল প্রতি মণ ৩ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বোতলজাত ভোজ্য তেলের দাম প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। খুচরা বাজারে বোতলজাত সয়াবিন ১ লিটার ১২০-১২৫ টাকা, ২ লিটার ২৪০ টাকা, ৫ লিটার ৫৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বহদ্দারহাটের ব্যবসায়ী ওমর ফারুক বলেন, বোতলজাত সয়াবিন তেলের প্রতিদিন মূল্য পরিবর্তন হচ্ছে। রুপচাঁদা সয়াবিন তেলের দাম সবচেয়ে বেশি। এখন পুষ্টি, এস আলম, তীর ব্র্যান্ডের বোতলজাত সয়াবিনের দামও বাড়িয়ে দিয়েছে। চাহিদা অনুপাতে সরবরাহ পাচ্ছি না।’
চালের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকার বেসরকারি খাতে চাল আমদানির ঘোষণা দিয়েছে। আমদানি শুল্ক ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। পাইকারি চাল ব্যবসায়ীরা জানান, বেসরকারিভাবে চাল আমদনির ঘোষণার পর বাজারে চালের দাম নিম্নমুখী দেখা দিয়েছিল। কিন্তু গত দুই দিনে হঠাত্ আবার বস্তাপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেড়ে গেছে। বেসরকারি খাতে চাল আমদানি নিয়ন্ত্রণে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। আমদানিকারকদের আগামী ১০ জানুয়ারির মধ্যে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হবে। পরে সরকার নির্ধারণ করে দেবে কে কী পরিমাণ চাল আমদানি করতে পারবে। ফলে আমদানি নিয়ে সময়ক্ষেপণের কারণে মিল মালিক সিন্ডিকেট চক্র সুযোগ নিচ্ছে বলে পাহাড়তলী বাজারের একাধিক পাইকারি বিক্রেতা অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, আমদানি দ্রুত ও উন্মুক্ত হওয়া উচিত। গতকাল পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) নাজিরশাইল ৩ হাজার ২০০ টাকা, জিরাশাইল ২ হাজার ৯৫০ টাকা, মিনিকেট ২ হাজার ৫০০ টাকা, বাসমতি ২ হাজার ৯৫০ টাকা, পাইজাম ২ হাজার ৩৫০ টাকা, স্বর্ণা ২ হাজার ২০০ টাকা ও মোট চাল ২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে।
এদিকে এবার নতুন করে চিনি সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে। গত ১৫ দিনে কয়েক দফায় চিনির দাম বেড়েছে। পাইকারি বাজারে গতকাল রবিবার আরেক দফা চিনির দাম বেড়েছে বলে পাইকারি বিক্রেতারা জানান। জানা যায়, চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে এস আলম গ্রুপের চিনির আধিপত্য রয়েছে। অন্যান্য কোম্পানির চিনি সীমিত পরিমাণে বিক্রি হয়। বিক্রেতাদের অভিযোগ, খাতুনগঞ্জে মূলত দুটি ব্যবসায়ী গ্রুপ চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। গতকাল দাম বেড়ে প্রতি মণ চিনি ২ হাজার ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।