দক্ষতার সহিত দায়িত্ব পালন সহজ নহে

দেশের সকল ধরনের অপরাধ দমনে পুলিশ সদস্যদের আরো আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সহিত দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানাইয়াছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর এই কথার সহিত নিঃসন্দেহে কেহই দ্বিমত পোষণ করিবেন না। ইহা সত্য যে, যখন যেই সরকার ক্ষমতায় আসিয়াছে সেই সরকারই পুলিশকে দক্ষতার সহিত কাজ করিবার কথা বলিয়াছে; কিন্তু সাধারণ জনগণের নিকট পুলিশের নিষ্ঠা ও দক্ষতার পরিচয়চিত্র কতখানি স্পষ্ট? সত্যিকার অর্থে, উন্নয়নশীল বিশ্বে পুলিশ কিংবা সিভিল প্রশাসন কি স্বাধীনভাবে কাজ করিতে পারে? কিছুদিন পূর্বে তৃতীয় বিশ্বের বৃহত্ গণতান্ত্রিক একটি দেশের বিরোধী নেতারা বলিয়াছেন, ক্ষমতাশালীদের তুষ্ট করিয়া যেইভাবে অপরাধীদের রেহাই দেওয়া হইতেছে তাহাতে আদালত ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির উপর হইতে দেশবাসীর ভরসা নষ্ট করিয়া দেওয়া হইতেছে, আইনের শাসন ধ্বংস করা হইতেছে। তাহাদের মতে, ঐ দেশের সংবিধান ও আইনের শাসন রক্ষা করিতেই হইবে, না হইলে দুর্বল অংশের বিপদ আরো বাড়িবে। অপরাধীরা বেপরোয়া হইয়া যাইবে আর ন্যায়বিচার দেওয়ার পরিবর্তে শাসকরাই অপরাধীদের পক্ষে দাঁড়াইবে। প্রকৃতপক্ষে, ইহাই উন্নয়নশীল দেশগুলির বাস্তবতা। কারণ আইনের শাসন যাহারা কার্যকর করিবেন, তাহাদের যদি হাত-পা বাঁধিয়া দেওয়া হয় এবং তাহাদের যদি দক্ষতার সহিত সাঁতার কাটিতে বলা হয়, তাহা কি বাস্তবে সম্ভবপর হইবে? তৃতীয় বিশ্বে রাজনীতিবিদরা এবং কালোটাকার মালিকসহ প্রভাবশালীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজে পদে পদে বাধার সৃষ্টি করিয়া থাকেন। তাহা ছাড়া, উন্নয়শীল বিশ্বে বিচিত্র ধরনের সমস্যা রহিয়াছে। ইহার মধ্যে একটি নিকৃষ্ট সংস্কৃতি হইতেছে দায়িত্ব এড়াইবার প্রবণতা। কোনো বড় ধরনের সমস্যা হইলে পুলিশ হয়তো বলিবে, তাহাদের পূর্বে বলা হয় নাই। আর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হয়তো বলিবে, বিষয়টি তাহাদের জানানো হয় নাই।

আমাদের কেন পুলিশ বাহিনী রহিয়াছে? নাগরিকের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা প্রদান করিবার জন্য। ইংল্যান্ডে যেই সকল সাধারণ নীতির মাধ্যমে আইনের শাসন নিশ্চিত হইয়াছে তাহার অধিকাংশই সেইখানকার নাগরিকদের আদালতে উত্থাপিত বিভিন্ন মামলার রায়ের ফল। ইহা ছাড়া ম্যাগনাকার্টা, পিটিশন অব রাইটস এবং বিল অব রাইটসে ইংরেজ জাতির স্বাভাবিক অধিকারগুলি ঘোষিত ও সংরক্ষিত হইয়াছে। সভ্য জাতি হিসাবে ইংরেজদের ঐতিহ্য, রীতিনীতি, ব্যবহারবিধি এবং তাহাদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির বিকাশের দীর্ঘ ইতিহাস রহিয়াছে। ইহার মধ্য দিয়াই দেশটিতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পাইয়াছে; কিন্তু তাহারাই যখন ঔপনিবেশিক মানসিকতা লইয়া পুলিশকে ব্যবহার করিত, তখন সেইখানে কিছু কালাকানুনও থাকিত। আবার ব্রিটিশ শাসনামলে আরোপিত অনেক নিবর্তনমূলক কালাকানুন পাকিস্তানি শাসকেরাও নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করিত। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান, সকল শ্রেণির মানুষ একটি অভিন্ন আইনের অধীন—যেই আইন কার্যকর হইবে সাধারণ আদালতের মাধ্যমে; জনজীবনের সকল ক্ষেত্রে সেই আইনের প্রয়োগ হইবে সমান।

কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে যাহারা ক্ষমতায় আসীন হন, তাহারা ঔপনিবেশিক মানসিকতা হইতে মুক্ত হইতে পারেন না। ইহাকে তৃতীয় বিশ্বের ঔপনিবেশিক দীনতা বলা যায়; কিন্তু প্রথম বিশ্বের মতো উন্নয়নশীল বিশ্বেও প্রকৃত আইনের শাসন থাকিলে পুলিশও তাহার দক্ষতার ব্যত্যয় ঘটাইতে পারিত না। এই কারণে অ্যারিস্টটল বলিয়াছেন, আইনের শাসন যে কোনো ব্যক্তিশাসনের চাইতে ভালো।

সুতরাং যদি এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা যায় যে, কোনোভাবেই প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ করা হইবে না, তাহা হইলে পুলিশ দক্ষতার সহিত কাজ করিতে পারিবে নিশ্চয়ই। মনে রাখিতে হইবে, ৮০ শতাংশ অপরাধই সংঘটিত হইয়া থাকে ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায়। সুতরাং আইন থাকিবে আইনের জায়গায়, ক্ষমতা থাকিবে ক্ষমতার জায়গায়। তাহা হইলে পুলিশও তাহার নিষ্ঠা ও দক্ষতার সহিত স্বীয় কর্তব্য পালন করিতে পারিবে বটে।