‘নিউ নরমাল’ কালে সম্ভাব্য পরিবর্তন

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ শুধু যে মানবিক ও আর্থিক বিপর্যয় সৃষ্টি করে চলেছে তা নয়, এর অন্যান্য প্রভাবও কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। যদিও বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের জন্য বিপর্যয় ও আর্থিক ক্ষতির প্রভাব নিয়ে এতটাই আলোচনা হচ্ছে যে অন্যান্য ক্ষেত্রে এর সম্ভাব্য প্রভাব উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে। এই সংকটের কারণে ভবিষ্যতে আমাদের জীবনযাত্রা অনেক ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ পালটে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কিছু কোম্পানি করোনা ভাইরাসের টিকা আবিষ্কার করেছে। তারা দাবি করছে, এই টিকা ৯৩ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর। এই টিকা আবিষ্কারের বিষয়টি এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে যে মনে হতে পারে এটি বাজারে এলে করোনা নামক প্রাণঘাতী ভাইরাস ভয়ে পালনোর পথ পাবে না। কিন্তু আসলে কি তাই? এই টিকা গ্রহণের পরও যে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ হবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই টিকা নিয়ে খুব একটা উল্লসিত হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রচার বিশারদগণ এমনভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন, যেন করোনার টিকা ‘সর্বরোগ সংহারক বটিকাবিশেষ।’ টিকা বাজারে এলে আর কোনো চিন্তা নেই। তাদের এই অতিমাত্রায় আস্থাশীল প্রচারণার পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

কারণ বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কোনো সুযোগ পেলেই তাদের পণ্য দরিদ্র দেশে বাজারজাত করে অর্থ লুটে নেয়। করোনার টিকা নিয়ে অতিমাত্রায় প্রচারণা তেমনই একটি কৌশল হতে পারে। এখন আমাদের এই নতুন উদ্ভাবিত টিকার বিষয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। মানুষের দুর্ভোগ বা সংকটকে পুঁজি করে ফায়দা হাসিল করার সুযোগসন্ধানীদের কোনো অভাব নেই। এরা সুযোগ বুঝে কর্ম সম্পাদন করে। করোনার টিকা সম্পর্কে যতই প্রচারণা চালানো হোক না কেন, এটা প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যেতে পারে যে করোনার সংক্রমণ থেকে বিশ্ববাসী শিগিগরই মুক্তি পাচ্ছে না। বরং ভবিষ্যতে করোনার সংক্রমণ আরো ভয়াবহ আকারে বিস্তার লাভ করতে পারে। যেহেতু খুব শিগিগর করোনার সংক্রমণ থেকে মুক্তি পাওয়া যাচ্ছে না, তাই নতুন স্বাভাবিক বা নিউ নরমাল অবস্থায় কীভাবে চলতে হবে তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। করোনার প্রভাব আরো কয়েক বছর অব্যাহত থাকলে বিশ্বব্যাপী সামাজিক ও আচরণগত সম্ভাব্য পরিবর্তন সম্পর্কে আমাদের এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। নতুন স্বাভাবিক বা নিউ নরমাল সময়ের আচরণ নির্ধারণ করতে হবে।

ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার জিডিপির ২২-২৩ শতাংশে ওঠানামা করছিল। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল ও দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির জন্য ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার অন্তত ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন ছিল। করোনার কারণে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ সংঘাতিকভাবে কমে গেছে। শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচমাল ও ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানি হ্রাস পেয়েছে ব্যাপকভাবে। সরকার করোনার সময়ের জন্য শিল্প খাতে ৪০ হাজার কোটি টাকার মতো ঋণ প্রণোদনা দিয়েছে। এই ঋণ প্রণোদনার প্রায় পুরোটাই তারা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তার পরও বেশির ভাগ কারখানার মালিক তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে কর্মী ছাঁটাই করেছেন। চাকরিচ্যুত কর্মীরা এখন মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। ভবিষ্যতে কারখানার মালিকগণ উত্পাদন ব্যয় কমানোর জন্য প্রযুক্তিনির্ভরতার দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন। প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়লে কারখানায় সাধারণ শ্রমিকের চাকরি হারানোর ভয় আরো বেড়ে যাবে। ভবিষ্যতে অভ্যন্তরীণ ভোগ চাহিদা সাংঘাতিকভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ সাধারণ মানুষের ভোগ সামর্থ্য বাড়ছে না। এই অবস্থায় তারা চাইলেও বেশি পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে পারবে না। অর্থ ব্যয় করার সামর্থ্য কমে গেলে তা দেশের উত্পাদনব্যবস্থায় নিশ্চিতভাবেই প্রভাব ফেলবে। করোনার সময়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ৪২ বিলিয়ন (৪ হাজার ২০০ কোটি) মার্কিন ডলার অতিক্রম করে গেছে। এটা নিয়ে আমরা উল্লাস প্রকাশ করছি। কিন্তু বিনিয়োগবিহীন স্ফীত রিজার্ভ সব সময় ভালো না-ও হতে পারে। রিজার্ভ স্ফীত হওয়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে রেমিট্যান্স প্রবাহের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। প্রবাসী বাংলাদেশিরা কর্মচ্যুত হয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকালে বিদেশে তাদের সঞ্চিত অর্থ একযোগে দেশে নিয়ে এসেছে। এ ছাড়া করোনার কারণে স্থানীয় বেনিফিশিয়ারিদের আর্থিক চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা আগের তুলনায় বেশি অর্থ পাঠিয়েছেন। এ পর্যন্ত সরকারি হিসাব মোতাবেক ৩ লাখের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি স্বদেশে ফিরে এসেছেন। যারা দেশে ফিরে এসেছেন, তাদের পুনরায় বিদেশে কর্মসংস্থান অথবা স্থানীয়ভাবে পুনর্বাসনের জন্য কোনো উদ্যোগ কি আমরা গ্রহণ করেছি? করোনার সময়ে অর্থনৈতিক পুনর্বাসনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাগণ বিশেষ ভূমিকা পালন করবেন বলে সবাই একবাক্যে স্বীকার করছেন। কিন্তু এদের জন্য যে ২০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনামূলক ব্যাংক ঋণ বরাদ্দের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তার অর্ধেকও এখনো বিতরণ করা সম্ভব হয়নি। ব্যাংকগুলো বড় উদ্যোক্তাদের ঋণদানের ক্ষেত্রে যতটা উত্সাহী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে তা নয়। আমরা ‘তেলা মাথায় তেল দিতে’ বেশি আগ্রহী।

ভবিষ্যতে আমাদের সামাজিক আচার-আচরণ ও রীতি-নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন মিটিং-মিছিল করতে অভ্যস্ত। ভবিষ্যতে এটা না-ও থাকতে পারে। সরাসরি কোনো মিটিং-মিছিলের পরিবর্তে অনলাইনে মিটিং-মিছিল হতে পারে। সামাজিক অনুষ্ঠান যেমন বিয়ের অনুষ্ঠান, বউভাত, জন্মদিন ইত্যাদি পালন করার পদ্ধতি ও রীতি পরিবর্তন হতে পারে। সামাজিকভাবে আত্মীয়স্বজনের বাসায় বেড়ানোর কালচারও অনেকটাই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। করোনা যদি অব্যাহতভাবে সংক্রমিত হতে থাকে, তাহলে হ্যান্ডশেক ও কোলাকুলির মতো সামাজিক প্রথাও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

সব খারাপেরই কিছু ভালো দিকও থাকে। করোনার কারণে মানুষের ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু এর কারণে প্রকৃতি ও জীবজগতের উপকার হয়েছে। করোনার কারণে মানুষ আগের মতো নির্বিচারে প্রকৃতি ও জীবযন্তু ধ্বংস করতে পারছে না। এই সুযোগে প্রকৃতি আবারও সজীব হয়ে উঠেছে। বিরলপ্রায় পশু-পাখিও নিরুপদ্রব পরিবেশে তাদের বংশ বিস্তার করতে পারছে। বর্তমানে আমরা যে প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতা প্রত্যক্ষ করছি, ভবষ্যিতে তা আর থাকবে না। পানিতে কুমির, ডাঙায় বাঘ—এই নিয়ে আমাদের প্রকৃতি আবারও নবসাজে সজ্জিত ও পুষ্পিত হয়ে উঠবে। মানুষের কারণে প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই হ্রাস পাবে। বাঙালি আড্ডাপ্রিয় জাতি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই আড্ডায় কিছুটা হলেও ছেদ পড়বে। এত দিন আমরা যেসব আচার-আচরণে অভ্যস্ত ছিলাম, তার অনেকগুলোই পরিবর্তন হয়ে যাবে। তবে এই সম্ভাব্য পরিবর্তন কতটা ইতিবাচক হবে আর কতটা নেতিবাচক হবে,সেটাই এখন দেখার বিষয়।

লেখক :অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক

ইত্তেফাক/টিআর